• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

আল্লাহর ক্ষমার কোনো সীমা নেই

জার্সি পরে নামাজ আদায় কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
জার্সি পরে নামাজ আদায় কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগে জার্সি শুধ খেলোয়াড়দের পোশাক নয়; বরং এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন পোশাকেরও একটি জনপ্রিয় অংশ। কেউ জার্সি পরেন আরামদায়ক ও টেকসই পোশাক হিসেবে, আবার কেউ তার প্রিয় দল, ক্লাব বা খেলোয়াড়ের প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য জার্সি সংগ্রহ করেন। বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট বা বিভিন্ন ক্লাব প্রতিযোগিতার সময় জার্সির ব্যবহার আরো ব্যাপক হয়ে ওঠে। তবে একজন সচেতন মুসলমানের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—জার্সি পরে নামাজ আদায় করা কি বৈধ? জার্সিতে যদি প্রাণীর ছবি থাকে, তাহলে তার হুকুম কী? অনেক জার্সিতে ব্যবহৃত ক্রসচিহ্ন বা খ্রিষ্টীয় প্রতীক সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী? আর এসব জার্সির ব্যবসা করা কি হালাল, নাকি তা পরিহার করাই উত্তম?

নামাজে পোশাকের নীতিমালা
নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য পোশাকের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক শর্ত রয়েছে—
১. পোশাক পাক-পবিত্র হতে হবে।
২. সতর যথাযথভাবে আবৃত থাকতে হবে।
৩. শরিয়ত নিষিদ্ধ কোনো বিষয় পোশাকে থাকা যাবে না।
৪. পোশাক শালীন ও সম্মানজনক হওয়া উচিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য (পরিচ্ছন্ন ও শালীন পোশাক) গ্রহণ করো।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, নামাজের জন্য পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব এবং ইসলামী আদবের অংশ।

জার্সি পরে নামাজ আদায়ের বিধান
জার্সি নিজে কোনো নিষিদ্ধ পোশাক নয়। তাই সাধারণ জার্সি পরে নামাজ আদায় করলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু অনেক সময় জার্সিতে বাঘ, সিংহ, ঈগল বা অন্য প্রাণীর ছবি বা প্রতীক থাকে। আবার কিছু জার্সিতে মানুষের ছবিও থাকে। যদি পোশাকে এমন প্রাণীর ছবি থাকে যার মুখমণ্ডল ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়, তাহলে তা পরিধান করা মাকরূহ এবং তা পরে নামাজ আদায় করাও মাকরূহ। তবে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে না; নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়। (খোলাসাতুল ফতোয়া, ১/৫৮, আল-মুহিতুল বুরহানি, ২/১৩৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ঘরে ছবি থাকে, সে ঘরে ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২২৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১০৬)
এ কারণে মুসলমানের জন্য ছবি-মুক্ত পোশাক নির্বাচন করা অধিক উত্তম ও সতর্কতাপূর্ণ।

বিশেষ সতর্কতা
বর্তমানে অনেক আন্তর্জাতিক ক্লাব, জাতীয় দল কিংবা ব্র্যান্ডের লোগোতে ক্রসচিহ্ন দেখা যায়। ক্রস মূলত খ্রিষ্টধর্মের একটি সুপরিচিত ধর্মীয় প্রতীক। রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্রসচিহ্নের প্রতি বিশেষ বিরাগ পোষণ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ঘরে কোনো ক্রসচিহ্নযুক্ত বস্তু দেখলে তা অপসারণ করে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৫২)

এ কারণে সুস্পষ্ট ক্রসচিহ্নযুক্ত জার্সি পরিধান করা এবং তা পরে নামাজ আদায় করা অপছন্দনীয়। বিশেষত যদি তা খ্রিষ্টীয় ক্রসচিহ্নযুক্ত প্রতীকসহ হয়, তাহলে তা আরো গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

জার্সি বিক্রি করা কি বৈধ?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্যণীয়। অনেক ফকিহের মতে, ছবিযুক্ত কাপড় বা ক্রসযুক্ত পোশাক বিক্রি করা সরাসরি হারাম না হলেও মাকরূহ। কারণ এর মাধ্যমে এমন বস্তুর প্রচলন ঘটে যা শরয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। ফিকহের বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখ রয়েছে, ‘যে বস্তু নিজে বৈধ কিন্তু কখনো কখনো গুনাহের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, তার বিক্রয় মূলত বৈধ; তবে যদি তা বিশেষভাবে গুনাহের কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিক্রি করা হয়, তাহলে তা নিন্দনীয় ও গুনাহের সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)
সুতরাং ছবিযুক্ত বা ক্রসযুক্ত জার্সি বিক্রি করার মধ্যে সরাসরি হারাম বলা না গেলেও তা নিঃসন্দেহে একটি মাকরূহ ও অনুৎসাহিত ব্যবসার আওতাভুক্ত হতে পারে। (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৬২, মাজমাউল আনহার, ৪/১৮৮)

তাই যদি ব্যবসার অধিকাংশ জার্সি হয়—ছবি-মুক্ত, ক্রস-মুক্ত, অশ্লীল স্লোগানবিহীন, এবং ইসলামবিরোধী প্রতীকবিহীন, তাহলে এ ব্যবসা মূলত হালাল ব্যবসা। অন্যথায় ব্যবসা মাকরূহ ও শরয়ি দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর জন্য করণীয় হলো, শুধু লাভের কথা চিন্তা না করে উপার্জনের হালাল-হারামের প্রতিও সচেতন দৃষ্টি রাখা। তাই যদি সম্ভব হয়—ছবি-মুক্ত জার্সি, সাধারণ স্পোর্টস জার্সি, কাস্টম ডিজাইনের জার্সি, ক্রস ও আপত্তিকর প্রতীকবিহীন পোশাক নিয়ে ব্যবসা করাই অধিক নিরাপদ, উত্তম এবং তাকওয়ার দাবি। এতে ব্যবসাও হবে, আবার সন্দেহজনক বিষয় থেকেও দূরে থাকা যাবে। (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৬১)

জার্সি পরিধান করা অবৈধ নয়। জার্সি পরে নামাজও শুদ্ধ হয়ে যায়, যদি নামাজের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ হয়। তবে প্রাণীর স্পষ্ট ছবি, মানুষের প্রতিকৃতি কিংবা ক্রসচিহ্নযুক্ত জার্সি পরিধান ও তা পরে নামাজ আদায় করা শরিয়াহ পরিপন্থী। একই ভাবে এসব জার্সির ব্যবসা সরাসরি হারাম না হলেও ফোকাহায়ে কেরাম তা মাকরূহ তথা অপছন্দনীয় বলেছেন এবং অনুৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে উত্তম আমল ও হালাল উপার্জন গ্রহণ করার এবং সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

মৃত্যুপথযাত্রী মুমূর্ষ ব্যক্তির জন্য পঠিতব্য দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মৃত্যুপথযাত্রী মুমূর্ষ ব্যক্তির জন্য পঠিতব্য দোয়া
সংগৃহীত ছবি

একজন মুমিন সুস্থতা, দীর্ঘজীবন ও নেক আমলের তাওফিক কামনা করেন। তবে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় এবং দুনিয়ার সব সম্পর্ক, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ব্যস্ততা তার কাছে ম্লান হয়ে যায়। সেই সংকটময় সময়ে একজন ঈমানদার বান্দার সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়ে ওঠে আল্লাহর ক্ষমা, রহমত এবং তাঁর নৈকট্য লাভ। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে পঠিতব্য হৃদয়স্পর্শী এমন দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যেখানে দুনিয়ার প্রতি মোহ নয়; বরং মহান রবের সান্নিধ্য ও আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। তা হলো—

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَالْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الْأَعْلَى

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগফিরলী ওয়ারহামনী ওয়া আলহিক্বনী বির রফিক্কিল আলা।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন এবং আমাকে সর্বোচ্চ বন্ধুর সঙ্গ পাইয়ে দিন।’

হাদিস : উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি রাসুল (সা.)-কে মুমূর্ষু অবস্থায় এই দোয়া পড়তে শুনেছি। তখন তিনি আমার ওপর ভর করে ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৬৭৪)

অন্য হাদিসে আরেকটি দোয়ার কথা এসেছে। তা হলো— 

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।


অর্থ : ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহ মহান। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ও তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তাঁর জন্য সব ক্ষমতা এবং তার জন্য সব প্রশংসা। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই। 


হাদিস : আবু সায়িদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বলে لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহ মহান) তখন মহান রব তার কথা সত্যায়ন করে বলেন, ‘আমি ছাড়া উপাস্য নেই এবং আমিই মহান।’

অতঃপর যখন সে বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ (একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) তখন আল্লাহ বলেন, ‘একমাত্র আমি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।’

যখন সে বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ (একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ও তাঁর কোনো অংশীদার নেই) তখন আল্লাহ বলেন, ‘একমাত্র আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ও আমার কোনো অংশীদার নেই।’

আর সে যখন বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ (তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাঁর জন্য সব ক্ষমতা, তাঁর জন্য সব প্রশংসা) তখন আল্লাহ বলেন, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমার জন্য সব ক্ষমতা ও প্রশংসা।

সে যখন বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই) তখন আল্লাহ বলেন, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় এ দোয়াটি পড়বে অতঃপর মারা যাবে তাকে জাহান্নাম স্পর্শ করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩৪৩০)

মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইসলাম ও আরব সভ্যতার প্রদর্শনী

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইসলাম ও আরব সভ্যতার প্রদর্শনী
সংগৃহীত ছবি

বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সভ্যতার মিলনমেলায় পরিণত হওয়া মেক্সিকো বিশ্বকাপ ঘিরে ইসলাম ও আরব সভ্যতার সৌন্দর্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলি অব মুসলিম ইয়ুথ’। সংস্থাটি ‘অনুপ্রেরণাদায়ক সভ্যতা’ শীর্ষক এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছে, যার মূল লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে আগত দর্শনার্থীদের কাছে ইসলামের মানবিক মূল্যবোধ, আরব সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং মুসলিম সভ্যতার অবদানকে পরিচিত করে তোলা।

প্রদর্শনীটি বিশ্বকাপ উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এতে রয়েছে ১১টি বিশেষায়িত প্যাভিলিয়ন, যেখানে মডেল, বই, প্রকাশনা, তথ্যচিত্র ও স্মারক উপহারের মাধ্যমে ইসলামী ও আরব সভ্যতার ইতিহাস, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মূল্যবোধ তুলে ধরা হয়েছে।

দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে নানা ইন্টারেক্টিভ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। তারা আরববিশ্বের ঐতিহ্যবাহী পোশাক—থোব, শেমাগ ও বিশত পরিধান করে ছবি তুলতে পারবেন। পাশাপাশি মেহেদির নকশা, হিজাব পরিধানের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আরব ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ হলো, দুই পবিত্র মসজিদকে নিবেদিত বিশেষ প্যাভিলিয়ন। এখানে দর্শনার্থীরা মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর মডেল, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র এবং আধুনিক সম্প্রসারণ কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবেন। বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবছর লাখো হাজি ও ওমরাহ পালনকারীর জন্য প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র।

আরব আতিথেয়তার অনন্য ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে প্রদর্শনী প্রাঙ্গণে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ঐতিহ্যবাহী আরবীয় তাঁবু। সেখানে আগত অতিথিদের আপ্যায়ন করা হচ্ছে আরবি কফি, খেজুর ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসামগ্রী দিয়ে। ফলে দর্শনার্থীরা শুধু তথ্যই পাচ্ছেন না, বরং আরব সংস্কৃতির আন্তরিকতা ও অতিথিপরায়ণতার স্বাদও গ্রহণ করছেন। প্রদর্শনীর পরিধি আরো বিস্তৃত করতে মেট্রো টানেলের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে বিশেষ তথ্যকেন্দ্র। সেখানে হাজার হাজার বিনামূল্যে মেট্রো মানচিত্র বিতরণের পাশাপাশি ইসলাম ও আরব সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ প্রকাশনাও সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া মেলার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত সাতটি সাংস্কৃতিক তথ্যকেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবকরা সরাসরি দর্শনার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং ইসলামী সভ্যতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরছেন।

বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামত ও অনুমতি প্রসঙ্গ

মুফতি আবু হানিফ শেখ
বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামত ও অনুমতি প্রসঙ্গ
সংগৃহীত ছবি

বিবাহ মানবজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত। এটি শুধু দু’জন মানুষের মিলন নয়; বরং দুটি পরিবার, দুটি জীবনধারা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি রচনার একটি পবিত্র বন্ধন। তাই ইসলাম বিয়েকে শুধু সামাজিক চুক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি মহান ইবাদত ও দায়িত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। যে সম্পর্কে একজন নারীকে সারাজীবন কাটাতে হবে, সেই সম্পর্কের ব্যাপারে তার মতামত ও সম্মতিকে উপেক্ষা করা ইসলামের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলাম এমন এক যুগে নারীর বিয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, যখন বিশ্বের বহু সমাজে নারীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্যই ছিল না। কেরআন ও হাদিসে বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীন মতামতকে সম্মান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামত ও অনুমতির বিষয়টি শুধু একটি সামাজিক দাবি নয়; বরং এটি ইসলামের প্রদত্ত একটি মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার প্রতিফলনও বটে।

নারীর মতামতের গুরুত্ব 
​ইসলামি শরিয়াহ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে নিজের জীবনের  গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের  ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ক্ষমতাবান মনে করে। তাই প্রাপ্তবয়স্কা কোনো মহিলার অনুমতি বা সম্মতি ছাড়া তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। অভিভাবক জোর করে বিয়ে দিলেও ইসলামি আইন অনুযায়ী তা কার্যকর হয় না। প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ আল্লামা ইবনে নুজাইম (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন :

​قَوْلُهُ وَلَا تُجْبَرُ بِكْرٌ بَالِغَةٌ عَلَى النِّكَاحِ) أَيْ لَا يَنْفُذُ عَقْدُ الْوَلِيِّ عَلَيْهَا بِغَيْرِ رِضَاهَا

অর্থ : ‘কোনো প্রাপ্তবয়স্কা কুমারী মেয়েকে বিবাহের জন্য বাধ্য করা যাবে না। অর্থাৎ, মেয়ের সন্তুষ্টি ও সম্মতি ছাড়া তার ওপর অভিভাবকের (ওলি) করা বিবাহের আকদ বা চুক্তি কার্যকর হবে না।’ (আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১১৮]

​শরিয়তের দৃষ্টিতে নারীর মনস্তত্ত্ব ও সম্মতির ধরন :
​যেহেতু শরিয়া আইন প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের সম্মতিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে, তাই ফিকহের কিতাবগুলোতে এ নিয়ে সবিস্তার আলোচনা করে বিষয়টির সমস্ত সূক্ষ্ম দিক সামনে আনা হয়েছে।

মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে শরিয়ত এক্ষেত্রে নারীদের প্রধানত দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে:

​১. সায়্যেবা (তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারী)
​যেহেতু বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তাদের লজ্জার জড়তা কিছুটা কম থাকে, তাই তাদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বা মৌখিক বক্তব্যকে সম্মতির জন্য জরুরি করা হয়েছে। কারণ তারা মনের কথা কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে। বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থ 'হেদায়া'র লেখক বলেন :

​ولو استأذن الثيب فلا بد من رضاها بالقول لقوله «الثيب تشاور» ولأن النطق لا يعد عيبا منها وقل الحياء بالممارسة فلا مانع من النطق في حقها

অর্থ: ‘যদি কোনো সায়্যেবা (বিবাহিতা) নারীর নিকট অনুমতি চাওয়া হয়, তবে তার স্পষ্ট মৌখিক সম্মতি থাকা আবশ্যক। কেননা আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, 'ছায়্যেবা নারীর ক্ষেত্রে তার পরামর্শ (বা স্পষ্ট মতামত) নিতে হবে।' তাছাড়া (অভিজ্ঞতা থাকার কারণে) মুখ ফুটে কথা বলা তার জন্য দোষের কিছু মনে করা হয় না এবং বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হওয়ার কারণে তার জড়তা ও লজ্জা কমে যায়; ফলে তার ক্ষেত্রে মৌখিক মতামত প্রকাশে কোনো বাধা থাকে না।’ (হেদায়া, ১/১৯২)

​২. কুমারী বা অবিবাহিতা নারী
​কুমারী মেয়েরা স্বভাবগতভাবেই অতি লজ্জাবতী হয়ে থাকে।  সমাজের একটি শালীন ও ভদ্র মেয়ে চাইলেই হুট করে নিজের বিয়ের সম্মতি স্পষ্ট জবানে ব্যক্ত করতে পারে না। শরিয়ত নারীর এই স্বভাবজাত লজ্জাকে সম্মান জানিয়েছে। তাই তার ক্ষেত্রে স্পষ্ট মৌখিক সম্মতির পাশাপাশি সম্মতির ইঙ্গিতবাচক আচরণগুলোকেও অনুমোদনের সমার্থক বিবেচনা করেছে। 'শরহে বেকায়া' গ্রন্থে বলা হয়েছে :

​وَصَمْتُها وضِحْكُها وبكاؤُها بلا صوتٍ إذْنٌ ومعه (أي مع الصوت) رَدٌّ حينَ استئذانِه ، أو بعد بلوغِ الخبرِ بشرطِ تسميةِ الزَّوج

অর্থ : ‘পাত্রের নাম উল্লেখ করে অনুমতি চাওয়ার সময় কিংবা (বিয়ের) সংবাদ পৌঁছানোর পর কুমারী মেয়ের নীরবতা, মৃদু হাসি এবং আওয়াজহীন কান্না সম্মতির লক্ষণ বা অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে। তবে কান্নার সাথে যদি আওয়াজ থাকে (অর্থাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে), অথবা উপহাসমূলক অট্রহাসি দেয়, তবে তা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান বলে গণ্য হবে।’ (শরহে বেকায়া, ৩/১৭)

​ইঙ্গিতবাচক সম্মতির ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত :
​তবে ইঙ্গিতবাচক সম্মতির বিষয়টি যেহেতু সুনিশ্চিত কোন মাধ্যম নয়, বরং সম্মতির আলামত বা পরোক্ষ লক্ষণ, তাই ফিকাহবিদগণ কোনো ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এখানে দুটি শর্ত যুক্ত করেছেন:

প্রথম শর্ত :
এই পরোক্ষ সম্মতি বা নীরবতার বিষয়টি শুধু তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন পাত্রের প্রস্তাবটি মেয়ের ওলি (শরিয়ত নির্দেশিত অভিভাবক) বা তার প্রেরিত দূতের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হবে। কারণ আপনজনদের সামনেই কুমারী মেয়ের লজ্জাশীলতা বেশি কাজ করে। অন্য কারও বেলায় বিষয়টি তেমন নয়। তাই ওলি ছাড়া বাইরের অন্য কেউ অনুমতি চাইলে কুমারী মেয়ের স্পষ্ট মৌখিক বক্তব্যই লাগবে, নীরবতা চলবে না। আল্লামা ইবনে নুজাইম (রহ.) বলেন :

​قَوْلُهُ وَإِنْ اسْتَأْذَنَهَا غَيْرُ الْوَلِيِّ فَلَا بُدَّ مِنْ الْقَوْلِ كَالثَّيِّبِ) أَيْ فَلَا يَكْفِي السُّكُوتُ؛ لِأَنَّهُ لِقِلَّةِ الِالْتِفَاتِ إلَى كَلَامِهِ فَلَمْ يقعْ دَلَالَةً عَلَى الرِّضَا وَلَوْ وَقَعَ فَهُوَ مُحْتَمَلٌ وَالِاكْتِفَاءُ بِمِثْلِهِ لِلْحَاجَةِ وَلَا حَاجَةَ فِي غَيْرِ الْأَوْلِيَاءِ

অর্থ: 'আর যদি ওলি ছাড়া অন্য কেউ তার কাছে অনুমতি চায়, তবে ছায়্যেবা নারীর মতোই স্পষ্ট মৌখিক বক্তব্য আবশ্যক।' অর্থাৎ, এক্ষেত্রে কেবল নীরবতা যথেষ্ট হবে না। কারণ পরপুরুষ বা অনাত্মীয়ের কথার প্রতি মেয়ের মনোযোগ বা সমীহ কম থাকতে পারে; ফলে তার নীরবতা সন্তুষ্টির অকাট্য দলিল বা আলামত হিসেবে গণ্য হবে না। আর যদি আলামত ধরেও নেওয়া হয়, তবুও তাতে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। মূলত (লজ্জার কারণে) বিশেষ প্রয়োজনে কুমারী মেয়ের নীরবতাকে ওলির ক্ষেত্রে অনুমতি ধরা হয়েছে, কিন্তু ওলি ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে সেই প্রয়োজনীয়তা বা ওজর খাটে না।’ (আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১২৩ )

​দ্বিতীয় শর্ত :
কনের এই আচরণগত অভিব্যক্তিগুলো বাস্তবিকই অবস্থার আলোকে সম্মতির ইঙ্গিতবাহী হতে হবে। যদি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে ভিন্ন কোনো অর্থ প্রকাশ পায় (যেমন মেয়েটি ভয়ে বা অন্য কোনো চাপে কাঁদছে বা অট্টহাসি হাসছে বা অন্য কোন কারণে চুপ থাকছে), তবে তা আমলে নিতে হবে। ইমাম ইবনুল হুমাম (রহ.) 'ফাতহুল কদির'-এ বলেন :

​وَالْمُعَوَّلُ عَلَيْهِ اعْتِبَارُ قَرَائِنِ الْأَحْوَالِ فِي الْبُكَاءِ وَالضَّحِكِ، فَإِنْ تَعَارَضَتْ أَوْ أُشْكِلَ اُحْتِيطَ

অর্থ : ‘এক্ষেত্রে মূল কথা হলো, কান্না ও হাসির সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও আলামতসমূহ বিবেচনা করা। যদি আলামতগুলোর মধ্যে পরস্পর বৈপরীত্য দেখা দেয় কিংবা বিষয়টি অস্পষ্ট বা সন্দেহজনক মনে হয়, তবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে (অর্থাৎ স্পষ্ট মৌখিক অনুমতি নিতে হবে)। (ফাতহুল কদির,  ৩/২৬৪)

অতএব, অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের প্রত্যেকের কর্তব্য হলো নারীর এই শরয়ি ও মানবিক অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া এবং বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার মতামতকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা। এতে ইসলামের সৌন্দর্য যেমন ফুটে উঠবে, তেমনি পরিবার ও সমাজে স্থায়ী শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে।