• ই-পেপার

মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইসলাম ও আরব সভ্যতার প্রদর্শনী

হাদিসের বাণী

আল্লাহর ক্ষমার কোনো সীমা নেই

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আল্লাহর ক্ষমার কোনো সীমা নেই
সংগৃহীত ছবি

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, হে বনি আদম, যদি তুমি আমাকে ডাকো ও আমার কাছে ক্ষমার আশা করো, তাহলে আমি তোমার সব অপরাধ ক্ষমা করে দেব। আমি কোনো পরওয়া করব না। হে বনি আদম, তোমার পাপসমূহ যদি আকাশ পরিমাণ হয়ে যায়, আর তুমি যদি আমার নিকটে মাফ চাও, তাহলে আমি তোমাকে মাফ করে দেব। এতে আমি কোনো পরওয়া করব না। হে বনি আদম, তুমি যদি পৃথিবী সমপরিমাণ অপরাধ নিয়ে আমার নিকট উপস্থিত হও, আর যদি তুমি আমার সঙ্গে কাউকে শরিক না করো, তাহলে আমি এক পৃথিবী পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে তোমার নিকট উপস্থিত হব। (তিরমিজি, হাদিস নং : ৩৫৪০, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১২৪০৫)


শিক্ষা ও বিধান
১. মানুষের পাপ যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা তার চেয়েও অনেক বড়।
২. বান্দা যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহকে ডাকে, তখন তিনি তার ডাকে সাড়া দেন এবং রহমত বর্ষণ করেন।
৩. কোনো পাপের কারণেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া বৈধ নয়।
৪. সত্যিকার অনুতাপের সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ গুনাহ মাফ করে দেন।
৫. পাপ যত বেশি হোক, তাওবার দরজা খোলা থাকে। আকাশসম পাপও আন্তরিক ইস্তিগফারের মাধ্যমে ক্ষমা হতে পারে।
৬. আল্লাহ ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। তিনি বান্দার তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনাকে অত্যন্ত পছন্দ করেন।
৭. তাওহিদের মর্যাদা অপরিসীম। তাই শিরকমুক্ত ঈমান আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মূল্যবান আমল।
৮. মুমিনের অন্তরে আশা ও ভয়ের ভারসাম্য থাকা উচিত। পাপের কারণে ভীত থাকবে, তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবে না।

অতএব, এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, একজন বান্দা যত বড় পাপীই হোক না কেন, যদি সে আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাওহিদের ওপর অটল থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও রহমতের দরজা তার জন্য সর্বদা উন্মুক্ত। তাই কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে তাওবা, ইস্তিগফার ও নেক আমলের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।

মৃত্যুপথযাত্রী মুমূর্ষ ব্যক্তির জন্য পঠিতব্য দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মৃত্যুপথযাত্রী মুমূর্ষ ব্যক্তির জন্য পঠিতব্য দোয়া
সংগৃহীত ছবি

একজন মুমিন সুস্থতা, দীর্ঘজীবন ও নেক আমলের তাওফিক কামনা করেন। তবে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় এবং দুনিয়ার সব সম্পর্ক, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ব্যস্ততা তার কাছে ম্লান হয়ে যায়। সেই সংকটময় সময়ে একজন ঈমানদার বান্দার সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়ে ওঠে আল্লাহর ক্ষমা, রহমত এবং তাঁর নৈকট্য লাভ। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে পঠিতব্য হৃদয়স্পর্শী এমন দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যেখানে দুনিয়ার প্রতি মোহ নয়; বরং মহান রবের সান্নিধ্য ও আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। তা হলো—

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَالْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الْأَعْلَى

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগফিরলী ওয়ারহামনী ওয়া আলহিক্বনী বির রফিক্কিল আলা।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন এবং আমাকে সর্বোচ্চ বন্ধুর সঙ্গ পাইয়ে দিন।’

হাদিস : উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি রাসুল (সা.)-কে মুমূর্ষু অবস্থায় এই দোয়া পড়তে শুনেছি। তখন তিনি আমার ওপর ভর করে ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৬৭৪)

অন্য হাদিসে আরেকটি দোয়ার কথা এসেছে। তা হলো— 

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।


অর্থ : ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহ মহান। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ও তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তাঁর জন্য সব ক্ষমতা এবং তার জন্য সব প্রশংসা। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই। 


হাদিস : আবু সায়িদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বলে لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহ মহান) তখন মহান রব তার কথা সত্যায়ন করে বলেন, ‘আমি ছাড়া উপাস্য নেই এবং আমিই মহান।’

অতঃপর যখন সে বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ (একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) তখন আল্লাহ বলেন, ‘একমাত্র আমি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।’

যখন সে বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ (একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ও তাঁর কোনো অংশীদার নেই) তখন আল্লাহ বলেন, ‘একমাত্র আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ও আমার কোনো অংশীদার নেই।’

আর সে যখন বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ (তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাঁর জন্য সব ক্ষমতা, তাঁর জন্য সব প্রশংসা) তখন আল্লাহ বলেন, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমার জন্য সব ক্ষমতা ও প্রশংসা।

সে যখন বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই) তখন আল্লাহ বলেন, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় এ দোয়াটি পড়বে অতঃপর মারা যাবে তাকে জাহান্নাম স্পর্শ করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩৪৩০)

বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামত ও অনুমতি প্রসঙ্গ

মুফতি আবু হানিফ শেখ
বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামত ও অনুমতি প্রসঙ্গ
সংগৃহীত ছবি

বিবাহ মানবজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত। এটি শুধু দু’জন মানুষের মিলন নয়; বরং দুটি পরিবার, দুটি জীবনধারা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি রচনার একটি পবিত্র বন্ধন। তাই ইসলাম বিয়েকে শুধু সামাজিক চুক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি মহান ইবাদত ও দায়িত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। যে সম্পর্কে একজন নারীকে সারাজীবন কাটাতে হবে, সেই সম্পর্কের ব্যাপারে তার মতামত ও সম্মতিকে উপেক্ষা করা ইসলামের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলাম এমন এক যুগে নারীর বিয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, যখন বিশ্বের বহু সমাজে নারীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্যই ছিল না। কেরআন ও হাদিসে বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীন মতামতকে সম্মান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামত ও অনুমতির বিষয়টি শুধু একটি সামাজিক দাবি নয়; বরং এটি ইসলামের প্রদত্ত একটি মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার প্রতিফলনও বটে।

নারীর মতামতের গুরুত্ব 
​ইসলামি শরিয়াহ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে নিজের জীবনের  গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের  ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ক্ষমতাবান মনে করে। তাই প্রাপ্তবয়স্কা কোনো মহিলার অনুমতি বা সম্মতি ছাড়া তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। অভিভাবক জোর করে বিয়ে দিলেও ইসলামি আইন অনুযায়ী তা কার্যকর হয় না। প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ আল্লামা ইবনে নুজাইম (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন :

​قَوْلُهُ وَلَا تُجْبَرُ بِكْرٌ بَالِغَةٌ عَلَى النِّكَاحِ) أَيْ لَا يَنْفُذُ عَقْدُ الْوَلِيِّ عَلَيْهَا بِغَيْرِ رِضَاهَا

অর্থ : ‘কোনো প্রাপ্তবয়স্কা কুমারী মেয়েকে বিবাহের জন্য বাধ্য করা যাবে না। অর্থাৎ, মেয়ের সন্তুষ্টি ও সম্মতি ছাড়া তার ওপর অভিভাবকের (ওলি) করা বিবাহের আকদ বা চুক্তি কার্যকর হবে না।’ (আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১১৮]

​শরিয়তের দৃষ্টিতে নারীর মনস্তত্ত্ব ও সম্মতির ধরন :
​যেহেতু শরিয়া আইন প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের সম্মতিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে, তাই ফিকহের কিতাবগুলোতে এ নিয়ে সবিস্তার আলোচনা করে বিষয়টির সমস্ত সূক্ষ্ম দিক সামনে আনা হয়েছে।

মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে শরিয়ত এক্ষেত্রে নারীদের প্রধানত দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে:

​১. সায়্যেবা (তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারী)
​যেহেতু বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তাদের লজ্জার জড়তা কিছুটা কম থাকে, তাই তাদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বা মৌখিক বক্তব্যকে সম্মতির জন্য জরুরি করা হয়েছে। কারণ তারা মনের কথা কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে। বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থ 'হেদায়া'র লেখক বলেন :

​ولو استأذن الثيب فلا بد من رضاها بالقول لقوله «الثيب تشاور» ولأن النطق لا يعد عيبا منها وقل الحياء بالممارسة فلا مانع من النطق في حقها

অর্থ: ‘যদি কোনো সায়্যেবা (বিবাহিতা) নারীর নিকট অনুমতি চাওয়া হয়, তবে তার স্পষ্ট মৌখিক সম্মতি থাকা আবশ্যক। কেননা আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, 'ছায়্যেবা নারীর ক্ষেত্রে তার পরামর্শ (বা স্পষ্ট মতামত) নিতে হবে।' তাছাড়া (অভিজ্ঞতা থাকার কারণে) মুখ ফুটে কথা বলা তার জন্য দোষের কিছু মনে করা হয় না এবং বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হওয়ার কারণে তার জড়তা ও লজ্জা কমে যায়; ফলে তার ক্ষেত্রে মৌখিক মতামত প্রকাশে কোনো বাধা থাকে না।’ (হেদায়া, ১/১৯২)

​২. কুমারী বা অবিবাহিতা নারী
​কুমারী মেয়েরা স্বভাবগতভাবেই অতি লজ্জাবতী হয়ে থাকে।  সমাজের একটি শালীন ও ভদ্র মেয়ে চাইলেই হুট করে নিজের বিয়ের সম্মতি স্পষ্ট জবানে ব্যক্ত করতে পারে না। শরিয়ত নারীর এই স্বভাবজাত লজ্জাকে সম্মান জানিয়েছে। তাই তার ক্ষেত্রে স্পষ্ট মৌখিক সম্মতির পাশাপাশি সম্মতির ইঙ্গিতবাচক আচরণগুলোকেও অনুমোদনের সমার্থক বিবেচনা করেছে। 'শরহে বেকায়া' গ্রন্থে বলা হয়েছে :

​وَصَمْتُها وضِحْكُها وبكاؤُها بلا صوتٍ إذْنٌ ومعه (أي مع الصوت) رَدٌّ حينَ استئذانِه ، أو بعد بلوغِ الخبرِ بشرطِ تسميةِ الزَّوج

অর্থ : ‘পাত্রের নাম উল্লেখ করে অনুমতি চাওয়ার সময় কিংবা (বিয়ের) সংবাদ পৌঁছানোর পর কুমারী মেয়ের নীরবতা, মৃদু হাসি এবং আওয়াজহীন কান্না সম্মতির লক্ষণ বা অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে। তবে কান্নার সাথে যদি আওয়াজ থাকে (অর্থাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে), অথবা উপহাসমূলক অট্রহাসি দেয়, তবে তা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান বলে গণ্য হবে।’ (শরহে বেকায়া, ৩/১৭)

​ইঙ্গিতবাচক সম্মতির ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত :
​তবে ইঙ্গিতবাচক সম্মতির বিষয়টি যেহেতু সুনিশ্চিত কোন মাধ্যম নয়, বরং সম্মতির আলামত বা পরোক্ষ লক্ষণ, তাই ফিকাহবিদগণ কোনো ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এখানে দুটি শর্ত যুক্ত করেছেন:

প্রথম শর্ত :
এই পরোক্ষ সম্মতি বা নীরবতার বিষয়টি শুধু তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন পাত্রের প্রস্তাবটি মেয়ের ওলি (শরিয়ত নির্দেশিত অভিভাবক) বা তার প্রেরিত দূতের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হবে। কারণ আপনজনদের সামনেই কুমারী মেয়ের লজ্জাশীলতা বেশি কাজ করে। অন্য কারও বেলায় বিষয়টি তেমন নয়। তাই ওলি ছাড়া বাইরের অন্য কেউ অনুমতি চাইলে কুমারী মেয়ের স্পষ্ট মৌখিক বক্তব্যই লাগবে, নীরবতা চলবে না। আল্লামা ইবনে নুজাইম (রহ.) বলেন :

​قَوْلُهُ وَإِنْ اسْتَأْذَنَهَا غَيْرُ الْوَلِيِّ فَلَا بُدَّ مِنْ الْقَوْلِ كَالثَّيِّبِ) أَيْ فَلَا يَكْفِي السُّكُوتُ؛ لِأَنَّهُ لِقِلَّةِ الِالْتِفَاتِ إلَى كَلَامِهِ فَلَمْ يقعْ دَلَالَةً عَلَى الرِّضَا وَلَوْ وَقَعَ فَهُوَ مُحْتَمَلٌ وَالِاكْتِفَاءُ بِمِثْلِهِ لِلْحَاجَةِ وَلَا حَاجَةَ فِي غَيْرِ الْأَوْلِيَاءِ

অর্থ: 'আর যদি ওলি ছাড়া অন্য কেউ তার কাছে অনুমতি চায়, তবে ছায়্যেবা নারীর মতোই স্পষ্ট মৌখিক বক্তব্য আবশ্যক।' অর্থাৎ, এক্ষেত্রে কেবল নীরবতা যথেষ্ট হবে না। কারণ পরপুরুষ বা অনাত্মীয়ের কথার প্রতি মেয়ের মনোযোগ বা সমীহ কম থাকতে পারে; ফলে তার নীরবতা সন্তুষ্টির অকাট্য দলিল বা আলামত হিসেবে গণ্য হবে না। আর যদি আলামত ধরেও নেওয়া হয়, তবুও তাতে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। মূলত (লজ্জার কারণে) বিশেষ প্রয়োজনে কুমারী মেয়ের নীরবতাকে ওলির ক্ষেত্রে অনুমতি ধরা হয়েছে, কিন্তু ওলি ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে সেই প্রয়োজনীয়তা বা ওজর খাটে না।’ (আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১২৩ )

​দ্বিতীয় শর্ত :
কনের এই আচরণগত অভিব্যক্তিগুলো বাস্তবিকই অবস্থার আলোকে সম্মতির ইঙ্গিতবাহী হতে হবে। যদি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে ভিন্ন কোনো অর্থ প্রকাশ পায় (যেমন মেয়েটি ভয়ে বা অন্য কোনো চাপে কাঁদছে বা অট্টহাসি হাসছে বা অন্য কোন কারণে চুপ থাকছে), তবে তা আমলে নিতে হবে। ইমাম ইবনুল হুমাম (রহ.) 'ফাতহুল কদির'-এ বলেন :

​وَالْمُعَوَّلُ عَلَيْهِ اعْتِبَارُ قَرَائِنِ الْأَحْوَالِ فِي الْبُكَاءِ وَالضَّحِكِ، فَإِنْ تَعَارَضَتْ أَوْ أُشْكِلَ اُحْتِيطَ

অর্থ : ‘এক্ষেত্রে মূল কথা হলো, কান্না ও হাসির সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও আলামতসমূহ বিবেচনা করা। যদি আলামতগুলোর মধ্যে পরস্পর বৈপরীত্য দেখা দেয় কিংবা বিষয়টি অস্পষ্ট বা সন্দেহজনক মনে হয়, তবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে (অর্থাৎ স্পষ্ট মৌখিক অনুমতি নিতে হবে)। (ফাতহুল কদির,  ৩/২৬৪)

অতএব, অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের প্রত্যেকের কর্তব্য হলো নারীর এই শরয়ি ও মানবিক অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া এবং বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার মতামতকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা। এতে ইসলামের সৌন্দর্য যেমন ফুটে উঠবে, তেমনি পরিবার ও সমাজে স্থায়ী শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে। 
 

মরুর বুকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল ইসলাম

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
মরুর বুকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল ইসলাম
সংগৃহীত ছবি

সভ্যতার ইতিহাসে কিছু দৃশ্য আছে, যা শুধু ইতিহাস নয়, মানুষের বিবেককেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। পৃথিবীর নানা প্রাচীন সমাজে নারীর অবস্থান ছিল এমনই এক প্রশ্ন। কোথাও তিনি উত্তরাধিকারবঞ্চিত, কোথাও সামাজিক মর্যাদাহীন, কোথাও বা শুধু পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ইচ্ছার সম্প্রসারিত ছায়া। মানবসভ্যতা যখন নিজের শক্তি ও সাম্রাজ্যের অহংকারে মগ্ন, তখনো নারীকে মানুষ হিসেবে তার পূর্ণ মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে সে ছিল বিস্ময়করভাবে কৃপণ। এই বাস্তবতার ভেতরেই ইসলামের আবির্ভাব হয়। ইসলাম প্রথমেই কোনো রাজনৈতিক স্লোগান দেয়নি, কোনো সামাজিক আন্দোলনের ভাষাও ব্যবহার করেনি।

সে মানুষের পরিচয় নতুন করে নির্ধারণ করেছে। বলেছে, মানুষ তার লিঙ্গের কারণে মর্যাদাবান নয়; মর্যাদাবান তার মানবত্বের কারণে। এই একটি ধারণা আরবের মরুভূমিতে যেমন নতুন ছিল, তেমনি মানবসভ্যতার বৃহত্তর ইতিহাসেও ছিল অসাধারণ। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদাবান করেছি।’ (সুরা : ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭০)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে মর্যাদার ভিত্তি নারী কিংবা পুরুষ হওয়া নয়; মানুষ হওয়া। ইসলামের নারী-দর্শনের শিকড় তাই কোনো বিশেষ সুবিধা বা দয়ার দর্শনে নয়, বরং মানবমর্যাদার দর্শনে প্রোথিত। কোরআনের আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী... আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৫)

এই আয়াত ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের আধ্যাত্মিক মর্যাদার এক অনন্য ঘোষণা। মানুষের মূল্যায়ন এখানে লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়, ঈমান, চরিত্র ও আমলের ভিত্তিতে।

ইসলাম নারীকে করুণা করেনি; তাকে সম্মান করেছে। এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পার্থক্য আছে। করুণা আসে শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি থেকে, সম্মান আসে যথামর্যাদার স্বীকৃতি থেকে।
ভাবলে বিস্ময় জাগে, যে সমাজে কন্যাসন্তানের জন্ম অনেকের কাছে অপমানের কারণ ছিল, সেই সমাজেই কোরআন মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, ‘জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা : তাকভির, আয়াত : ৮-৯)

ইতিহাসে অনেক আইন এসেছে, অনেক শাস্তি এসেছে; কিন্তু মানুষের মানসিকতা বদলে দেওয়ার জন্য কখনো কখনো একটি প্রশ্নই যথেষ্ট হয়। ইসলামের সেই প্রশ্ন আরবের বুকে কন্যাশিশুর জন্য নতুন ভোরের সূচনা করেছিল। কন্যার প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু একটি সামাজিক সংস্কার ছিল না; এটি ছিল মূল্যবোধের পুনর্নির্মাণ। যে শিশুর জন্ম একসময় লজ্জার কারণ বলে বিবেচিত হতো, ইসলাম তাকে জান্নাতের পথের সহযাত্রীতে পরিণত করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) কন্যাসন্তানের যথাযথ লালন-পালনকে পরকালের মুক্তির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইতিহাসের ভাষায় এটি ছিল এক নীরব, কিন্তু গভীর বিপ্লব।

মানুষের জীবনে প্রথম আশ্রয় হলো মায়ের কোল। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষায় ‘মা’ শব্দটির সঙ্গে এক ধরনের কোমলতা জড়িয়ে আছে। ইসলাম এই কোমলতাকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখেনি; একে সামাজিক দর্শনের অংশে পরিণত করেছে। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমার সদ্ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (বুখারি ও মুসলিম)

এই হাদিসের ভেতরে শুধু আবেগ নয়, একটি সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি লুকিয়ে আছে। যে জাতি মাকে সম্মান করতে শেখে, সে জাতি তার ভবিষ্যেক সম্মান করতে শেখে। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না; তিনি একটি প্রজন্ম নির্মাণ করেন। ইতিহাসের অনেক মহান মানুষের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তাঁদের চরিত্রের প্রথম ভিত্তি নির্মিত হয়েছে মায়ের স্নেহ, ত্যাগ ও শিক্ষার মাধ্যমে। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও ইসলামের অবস্থান ছিল যুগান্তকারী। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক সমাজ ছিল, যেখানে শিক্ষা ছিল একটি বিশেষ শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার। ইসলাম সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিল। কোরআনের প্রথম আহবানই ছিল—‘পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১)

এই আহবান কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের উদ্দেশে ছিল না; ছিল সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশে। তাই ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, নারীরা শুধু জ্ঞানের গ্রহীতা ছিলেন না; তাঁরা জ্ঞানের ধারক ও বাহকও ছিলেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, গবেষণা ছিল, শিক্ষা ছিল, অবদান ছিল। জ্ঞানের জগৎ কোনো লিঙ্গের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে ইসলাম কখনো কল্পনা করেনি। ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানের অঙ্গনে নারীর উপস্থিতি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল না; বরং ছিল স্বাভাবিক বাস্তবতা। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের দিকে তাকালে দেখা যায়, জ্ঞানচর্চার অঙ্গন নারী-পুরুষ উভয়ের পদচারণে সমৃদ্ধ ছিল। এখানেই ইসলামের সৌন্দর্য। সে নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী বানাতে চায়নি, আবার পুরুষের অধীনস্থ ছায়াও বানায়নি। সে নারীকে সমাজের সহযাত্রী হিসেবে দেখেছে। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের সহযোগী।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৭১)

এই একটি আয়াত ইসলামী সমাজদর্শনের গভীরতম সত্যগুলোর একটি ধারণ করে। এখানে সম্পর্কের ভাষা আধিপত্যের নয়, সহযোগিতার; প্রতিযোগিতার নয়, অংশীদারির। পারিবারিক জীবন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিও একই রকম মানবিক। কোরআন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে এই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম; আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (জামে তিরমিজি)

আবার বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি নারীদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করার এবং তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম)

এই বক্তব্যগুলোকে শুধু পারিবারিক নীতিকথা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো আসলে একটি সভ্যতার নৈতিক মানদণ্ড। কারণ যে সমাজ দুর্বলকে সম্মান করতে পারে না, সে সমাজ প্রকৃত অর্থে সভ্য হতে পারে না।

আজকের পৃথিবীতে নারী অধিকার নিয়ে অসংখ্য আলোচনা হয়। আইন বদলায়, স্লোগান বদলায়, তত্ত্ব বদলায়। কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রয়োজন খুব বেশি বদলায় না। মানুষ সম্মান চায়, নিরাপত্তা চায়, ভালোবাসা চায়, স্বীকৃতি চায়। অতএব ১৪ শ বছরেরও বেশি সময় আগে মরুর বুকে আবির্ভূত সেই সভ্যতাই আমাদের ভিত্তি, যা নারীকে তার যথাযথ মূল্যায়ন করেছে।