জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বর্তমান এয়ার কন্ডিশনিং প্রযুক্তিতে অনেক বিদ্যুৎ খরচ হয়, এতে ব্যবহৃত রাসায়নিক রেফ্রিজারেন্টও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হিমায়ন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। সৌদি আরবের কিং আব্দুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকরা এক ধরনের লবণ, পানি ও সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে হিমায়নের উপায় আবিষ্কার করেছেন। রোদের তাপেই এটি কাজ করে, কোনো ধরনের বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। তাই এ প্রযুক্তির নামকরণ করা হয়েছে ‘নো ইলেকট্রিসিটি সাসটেইনেবল কুলিং অন ডিমান্ড’, সংক্ষেপে নেসকড (NESCOD)।
কিভাবে কাজ করে
অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এক ধরনের খনিজ লবণ। এটি পানিতে দ্রবীভূত হওয়ার সময় চারপাশের উত্তাপ শোষণ করে নেয়। এতে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট দ্রবণ দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এ ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়াকে বলা হয় এন্ডোথার্মিক প্রক্রিয়া। এটি মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যে ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপামাত্রা কমিয়ে ৩.৬ ডিগ্রিতে নামাতে পারে। এ জন্য কোনো শক্তি ব্যয় হয় না। ঠাণ্ডা করার প্রক্রিয়া শেষে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট দ্রবণের পানি রোদের তাপে শুকিয়ে ফেলা হয়। এতে ফিরে পাওয়া যায় শুষ্ক লবণ, যা আবারও পানিতে গুলিয়ে হিমায়ন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যায়। এই কাজ সম্পন্ন করে বিশেষ ধরনের ত্রিমাত্রিক সোলার রিজেনারেটর। এখানেই শেষ নয়, বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়া পানিটুকুও এই সিস্টেম নষ্ট হতে দেয় না। জলীয় বাষ্পকে আবারও খাঁটি পানিতে রূপান্তর করা হয়। ফিরে পাওয়া পানি অত্যন্ত বিশুদ্ধ, এতে অনাকাঙ্ক্ষিত পদার্থের পরিমাণ ১ পিপিএমেরও (পার্টস পার মিলিয়ন) কম।
পরিবেশ দূষণ নেই
এখানে হিমায়ন এবং রিচার্জ প্রক্রিয়া একই সঙ্গে করার প্রয়োজন নেই। দিনে পানি ও লবণ আলাদা করে রেখে রাতে সেগুলো হিমায়নে ব্যবহার করা যায়। বিদ্যুত্হীন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা তীব্র গরমের এলাকায় এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাসযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে বলে গবেষকরা আশাবাদী। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বারবার ব্যবহার করার পরেও এই সিস্টেমের কার্যক্ষমতা কমে না। তীব্র সূর্যালোকেরও প্রয়োজন নেই, সকাল-দুপুরের স্বাভাবিক রোদেও এক বর্গমিটার জায়গায় প্রতি ঘণ্টায় ২.২ কেজি দ্রবণ বাষ্পীভূত করা যায়। এতে ছোট একটি ঘরের তাপমাত্রা থাকবে ৫ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। ছাদজুড়ে সোলার জেনারেটর বসালে পুরো বাড়িতে শীতল পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব। নেসকোড-এর প্রধান উপকরণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, যা অত্যন্ত সস্তা এবং সহজলভ্য। সরাসরি কোনো বিদ্যুৎ ব্যবহার না করায় এই সিস্টেমে শীতলীকরণের খরচ নামমাত্র। এর ত্রিমাত্রিক সোলার রিজেনারেটর এমনভাবে তৈরি যে খুব ছোট জায়গার মধ্যেও কর্মক্ষম থাকে। এতে কোনো ক্ষতিকর গ্যাস বা অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়াতে হয় না বলে এটি গরম অঞ্চলের পরিবেশদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে। এই প্রযুক্তি প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাক-সবজি, ফলমূল এবং জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাবে। যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই বা নিয়মিত লোডশেডিং হয়, সেখানে কোনো ঝামেলা ছাড়াই একটানা শীতলতা দেবে এই নেসকোড।
ব্যবহারে আইনি বাধা
অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সহজলভ্য হলেও এটি ব্যবহারে নানাবিধ আন্তর্জাতিক বিধি-নিষেধ আছে। পুরো বাসা বা অফিস হিমায়নে যে পরিমাণ লবণ প্রয়োজন, সেটি নিরাপদে ব্যবহার করা সহজ নয়। তাই আপাতত অফ-গ্রিড কোল্ড স্টোরেজের মতো কাজে এ প্রযুক্তি প্রয়োগ নিয়ে কাজ চলছে। শিগগির এ প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসার ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।




