• ই-পেপার

আল্লাহর রহমত লাভের বিশেষ দোয়া

হাদিসের বাণী

মহানবী (সা.) এর সাদাসিধে জীবন-যাপন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মহানবী (সা.) এর সাদাসিধে জীবন-যাপন
সংগৃহীত ছবি

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)- থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মহানবী (সা.) একটি চাটাইয়ের উপর ঘুমিয়েছিলেন। তারপর যখন উঠলেন, তখন দেখা গেল তার শরীরে চাটাইয়ের দাগ পড়ে আছে। আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার জন্য একটি নরম বিছানার ব্যবস্থা করে দিই? জবাবে মহানবী (সা.) বললেন, দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? দুনিয়াতে আমি তো সেই সাওয়ারি-মুসাফিরের মতো, যে ক্লান্ত হয়ে একটু গাছের ছায়ার নিচে বিশ্রাম নেয়, তারপর গাছ ছেড়ে আবার চলে যায়। (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩৭৭)

হাদিসের শিক্ষা
১. দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আখিরাত চিরস্থায়ী। তাইতো মহানবী (সা.) দুনিয়াকে একটি গাছের ছায়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন একজন পথিক কিছুক্ষণ ছায়ায় বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে, তেমনি মানুষের দুনিয়ার জীবনও খুবই অল্প সময়ের। প্রকৃত আবাস হলো আখিরাত।

২. দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মগ্ন হওয়া উচিত নয়। মহানবী (সা.) চাইলে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সাধারণ জীবন বেছে নিয়েছিলেন। এজন্য দুনিয়ার প্রয়োজনীয় জিনিস গ্রহণ করা বৈধ, তবে ভোগ-বিলাসকে জীবনের লক্ষ্য বানানো উচিত নয়।

৩. সরল ও সাদাসিধে জীবন উত্তম। মহানবী (সা.)-এর শরীরে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গিয়েছিল, তবুও তিনি আরাম-আয়েশের প্রতি আগ্রহ দেখাননি। এটি তাঁর দুনিয়াবিমুখতা ও বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৪. একজন মুমিন নিজেকে মুসাফির মনে করবে। মহানবী (সা.)-এর ভাষায়, মুমিন এই পৃথিবীতে একজন যাত্রী। তাই তার চিন্তা হবে— আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাব এবং সফরের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছি?

৫. আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। যাত্রী যেমন গন্তব্যের জন্য রসদ সংগ্রহ করে, তেমনি একজন মুমিনেরও নেক আমল, তাকওয়া ও ইবাদতের মাধ্যমে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করা উচিত।

৬. মৃত্যু ও আখিরাতকে স্মরণ রাখা উচিত। গাছের ছায়া ছেড়ে যেমন পথিক চলে যায়, তেমনি একদিন মানুষকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই মৃত্যু ও হিসাব-নিকাশের দিনের কথা স্মরণ করে জীবন পরিচালনা করা উচিত।

ভূমিকম্প সম্পর্কে ইসলামের সতর্কবার্তা

মুফতি ওমর বিন নাছির
ভূমিকম্প সম্পর্কে ইসলামের সতর্কবার্তা
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীতে মানুষের জীবন নানা নিয়ামত ও পরীক্ষার সমন্বয়ে গঠিত। কখনো প্রকৃতি তার সৌন্দর্য দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করে, আবার কখনো তার ভয়ংকর রূপ মানুষের হৃদয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমিকম্প—এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম ভয়াবহ। মুহূর্তের মধ্যে এটি সুদৃঢ় অট্টালিকাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, জনপদকে পরিণত করতে পারে ধ্বংসস্তূপে এবং মানুষের মনে সৃষ্টি করতে পারে অসহায়ত্বের গভীর অনুভূতি।

আধুনিক বিজ্ঞান ভূমিকম্পের ভৌত কারণ হিসেবে ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও ভূত্বকের চাপকে চিহ্নিত করে। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিতে প্রতিটি ঘটনার পেছনে আল্লাহ তাআলার হিকমত ও নির্দেশনা রয়েছে। কোরআন ও হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, পৃথিবীর বিভিন্ন বিপর্যয় মানুষের জন্য শিক্ষা, সতর্কবার্তা, পরীক্ষা এবং কখনো কখনো অবাধ্যতার পরিণতির স্মারক। তাই ভূমিকম্পকে শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আত্মসমালোচনা, তাওবা ও আল্লাহমুখী হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা উচিত।

ভূমিকম্প সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
পবিত্র কোরআনে বহু স্থানে ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানুষের গাফেলতিকে সতর্ক করে বলেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা কি এতই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার আজাব রাতারাতি তাদের কাছে এসে পড়বে না, যখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে?’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৭)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল; তবে আল্লাহ অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের পাপ ও অবাধ্যতা অনেক সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। তবে আল্লাহর রহমত এত ব্যাপক যে তিনি অসংখ্য অপরাধ ক্ষমা করে দেন।

কোরআনে ভূমিকম্পের পরিভাষা
কোরআনে ভূমিকম্প বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘জিলজাল’ এবং ‘দাক্কা’। জিলজাল অর্থ প্রচণ্ড কম্পন বা বারবার কেঁপে ওঠা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন পৃথিবী তার ভয়ংকর কম্পনে প্রকম্পিত হবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ১)

অন্যদিকে দাক্কা অর্থ প্রচণ্ড আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কখনো নয়! যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হবে।’ (সুরা : ফাজর, আয়াত : ২১)

ভূমিকম্প : কিয়ামতের একটি নিদর্শন
কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামত যত ঘনিয়ে আসবে, ভূমিকম্পের সংখ্যা তত বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। নিশ্চয়ই কিয়ামতের ভূকম্পন এক ভয়াবহ বিষয়।’ (সুরা : হাজ্জ, আয়াত : ১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৩৬)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ঘন ঘন ভূমিকম্প কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার অন্যতম আলামত।

পাপাচার ও ভূমিকম্প : হাদিসের সতর্কবার্তা
রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে যখন গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র এবং মদপানের প্রসার ঘটবে, তখন তাদের ওপর ভূমিধস, বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণ হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২২১২)
অন্য এক হাদিসে বিভিন্ন সামাজিক অনাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—আমানতের খিয়ানত, অবৈধ সম্পদ অর্জন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, অযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। (তিরমিজি, হাদিস : ১৪৪৭, অর্থগত বর্ণনা)

তবে মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট কোনো ভূমিকম্প কোনো পাপের কারণে ঘটেছে—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহই এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত। কিন্তু এসব ঘটনা মানুষের জন্য সতর্কবার্তা ও আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

ইতিহাসে ভূমিকম্পের মাধ্যমে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, অতীতের বহু অবাধ্য জাতি আল্লাহর শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষত সামূদ জাতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তাদেরকে ভূকম্পন আঘাত করল, ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৭৮)

ভূমিকম্পের সময় একজন মুমিনের করণীয়
ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে একজন মুমিনের প্রথম কাজ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
১. তাওবা ও ইস্তিগফার করা

বেশি বেশি পড়া—

أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি।’

২. দোয়া ও জিকির করা
আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা, রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।

৩. সালাত আদায় করা
বিপদের সময় নফল সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা।

৪. আত্মসমালোচনা করা
নিজের গুনাহ, অবহেলা ও দায়িত্ব সম্পর্কে চিন্তা করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা।

৫. অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ভূমিকম্প পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বৈজ্ঞানিকভাবে এর কারণ ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়া হলেও একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছুই সংঘটিত হয় না। তাই প্রতিবার পৃথিবী কেঁপে উঠলে আমাদের মনে রাখা উচিত—একদিন এমন এক মহাভূমিকম্প আসবে, যা হবে কিয়ামতের সূচনা। সেদিন কোনো শক্তি, সম্পদ বা ক্ষমতা মানুষকে রক্ষা করতে পারবে না; রক্ষা করবে শুধুমাত্র ঈমান ও নেক আমল। তাই ভূমিকম্পকে শুধু আতঙ্কের কারণ হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর স্মরণে ফিরে যাওয়ার একটি জাগরণী বার্তা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করুন, তাওবার জীবন দান করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ নসিব করুন। আমিন।

সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন লাভে যেসব আমল করবেন

মুফতি ওমর বিন নাছির
সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন লাভে যেসব আমল করবেন
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো শান্তি, স্বস্তি ও কল্যাণময় জীবন। ধন-সম্পদ, সম্মান, ক্ষমতা কিংবা ভোগ-বিলাসের প্রাচুর্য থাকলেও যদি অন্তরে প্রশান্তি না থাকে, তাহলে প্রকৃত সুখ অর্জিত হয় না। আবার অনেক মানুষ সীমিত সামর্থ্য নিয়েও আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অন্তরের প্রশান্তির কারণে সুখী জীবন অতিবাহিত করেন। ইসলাম মানুষের এই দুনিয়াবী সুখ ও আখিরাতের সফলতার জন্য এমন কিছু আমলের শিক্ষা দিয়েছে, যা শুধু ইবাদতই নয়; বরং জীবনকে আলোকিত করার বাস্তব নির্দেশনাও বটে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে—পুরুষ হোক বা নারী—আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র ও সুখময় জীবন দান করব।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)
সুতরাং প্রকৃত সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের উৎস হলো আল্লাহর আনুগত্য এবং নেক আমল। নিম্নে এমন ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আমল তুলে ধরা হলো, যা একজন মুমিনের জীবনকে বরকতময় ও সফল করে তুলতে পারে।

১. নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করুন
তাহাজ্জুদ হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। রাতের নির্জনতায় যখন মানুষ ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাভেজা দোয়া করা বান্দার মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় কর; এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৭৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, ‘কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৪৫, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৫৮)
তাহাজ্জুদ মানুষের দোয়া কবুলের অন্যতম সময় এবং অন্তরের প্রশান্তি লাভের এক অনন্য উপায়।

২. প্রতিদিন সালাতুদ-দুহা (চাশতের সালাত) আদায় করুন
চাশতের সালাত হলো সকালবেলার একটি বিশেষ নফল সালাত, যা শারীরিক সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি এবং রিজিকের বরকতের মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেক অস্থিসন্ধির জন্য প্রতিদিন সদকা করা আবশ্যক... আর দুহার (চাশতের) দুই রাকাত সালাত এসবের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭২০)
যারা নিয়মিত চাশতের সালাত আদায় করেন, তারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও হেফাজতের অন্তর্ভুক্ত হন।

৩. বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন
ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফের উপায় নয়; বরং এটি দুশ্চিন্তা দূর করে, রিজিক বৃদ্ধি করে এবং জীবনে বরকত নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সাহায্য করবেন।’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ১০-১২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা দূর করবেন, প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫১৮)
প্রতিদিন অন্তত ১০০ বার ‘أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ’ পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

৪. প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করুন
আয়াতুল কুরসি কোরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াতগুলোর একটি। এটি আল্লাহর মহিমা, ক্ষমতা ও একত্ববাদের এক মহান ঘোষণা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১০০)
এ আমল মানুষের ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে।

৫. নিয়মিত সদাকাহ করুন
সদাকাহ শুধু দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটায় না; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। সদাকাহ মানুষের বিপদ-আপদ দূর করে এবং সম্পদে বরকত আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ হলো একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ উৎপন্ন হয় এবং প্রত্যেক শীষে একশত দানা থাকে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদাকাহ গুনাহকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬১৬)
অল্প হলেও নিয়মিত সদাকাহ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

৬. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করুন
নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা ঈমানের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এটি রহমত, বরকত ও দোয়া কবুলের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনরা! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ কর।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত নাযিল করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪০৮)

প্রতিদিন বেশি বেশি ‘اللهم صل على محمد وعلى آل محمد’ পাঠ করা মুমিনের জন্য অশেষ কল্যাণের উৎস।

সুতরাং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন শুধু ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক প্রাচুর্যের নাম নয়; বরং এটি অন্তরের প্রশান্তি, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের সফলতার সমন্বিত রূপ। তাহাজ্জুদ, চাশতের সালাত, ইস্তিগফার, আয়াতুল কুরসি, সদাকাহ এবং দরুদ শরিফ—এই ছয়টি আমল একজন মুমিনের জীবনকে আলোকিত করতে পারে। এগুলো এমন আমল, যা খুব কঠিন নয়; কিন্তু নিয়মিত পালন করলে জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এসব আমল আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়মিত পালন করার তাওফিক দান করুন, আমাদের দুনিয়ার সকল বৈধ প্রয়োজন পূরণ করুন এবং আখিরাতে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

তাহাজ্জুদের নামাজ যেভাবে সৌভাগ্য বয়ে আনে

মাইমুনা আক্তার
তাহাজ্জুদের নামাজ যেভাবে সৌভাগ্য বয়ে আনে
সংগৃহীত ছবি

রাতের শেষ ভাগে যখন মানুষেরা গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে, তখন কিছু সৌভাগ্যবান বান্দা নিজেদের বিছানা ছেড়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হয়। তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, কান্নাভেজা কণ্ঠে রবের কাছে ক্ষমা, রহমত ও হেদায়েত প্রার্থনা করে।

রাতের শেষ অংশের ইবাদতকে মহান আল্লাহ বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। এটি নেককারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঈমানদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমার নিদর্শনাবলিতে শুধু তারাই বিশ্বাস করে, যাদেরকে এর দ্বারা উপদেশ দেওয়া হলে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আর তাদের প্রতিপালকের প্রশংসা সহকারে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে আর তারা অহংকার করে না। তারা তাদের (দেহের) পার্শ্বগুলো বিছানা থেকে আলাদা করে (জাহান্নামের) ভীতি ও (জান্নাতের) আশা নিয়ে তাদের প্রতিপালককে ডাকে, আর আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে।’ (সুরা : সিজদা, আয়াত : ১৫-১৬)

অন্য আয়াতে আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের গুণাবলি আলোচনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা রাতে খুব কমই শয়ন করত। আর তারা রাতের শেষ প্রহরে ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত  : ১৭-১৮)

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, শেষ রাতে ইবাদত ও ইস্তিগফার করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ গুণ। এই গুণে গুণান্বিত হতে পারা অত্যন্ত সৌভাগ্যের, যা মহান আল্লাহর দরবারে মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

এ ব্যাপারে অবগত করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ো, ওটা তোমার জন্য নফল, শিগগিরই তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত স্থানে উন্নীত করবেন।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯)
আমাদের প্রিয় নবী (সা.) তাঁর উম্মতদের শেষ রাতের আমলের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মহামহিম আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছে এমন যে আমার নিকট চাইবে। আমি তাকে তা দেব। কে আছে এমন যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।’ (বুখারি, হাদিস : ১১৪৫)

সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনের জীবনে তাহাজ্জুদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তাঁরা রাতের শেষ অংশকে নিজেদের আত্মশুদ্ধি, তাওবা, জিকির ও দোয়ার জন্য নির্ধারিত রাখতেন। কারণ তাঁরা জানতেন, এ সময়ের একটি সিজদা ও একটি অশ্রুবিন্দু মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

সুতরাং শেষ রাতের ইবাদত শুধু একটি নফল আমল নয়; এটি আল্লাহর নৈকট্য, মর্যাদা বৃদ্ধি, গুনাহ মাফ, দোয়া কবুল এবং হৃদয়ের প্রশান্তি অর্জনের এক মহামূল্যবান সুযোগ। যারা ঘুমের মায়া ত্যাগ করে শেষ রাতে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ায়, তারা সত্যিই সৌভাগ্যবান। কারণ তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমত, ক্ষমা ও নৈকট্যের সুসংবাদ। মহান আল্লাহ সবাইকে এই সৌভাগ্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।