• ই-পেপার

সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন লাভে যেসব আমল করবেন

ভূমিকম্প সম্পর্কে ইসলামের সতর্কবার্তা

মুফতি ওমর বিন নাছির
ভূমিকম্প সম্পর্কে ইসলামের সতর্কবার্তা
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীতে মানুষের জীবন নানা নিয়ামত ও পরীক্ষার সমন্বয়ে গঠিত। কখনো প্রকৃতি তার সৌন্দর্য দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করে, আবার কখনো তার ভয়ংকর রূপ মানুষের হৃদয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমিকম্প—এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম ভয়াবহ। মুহূর্তের মধ্যে এটি সুদৃঢ় অট্টালিকাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, জনপদকে পরিণত করতে পারে ধ্বংসস্তূপে এবং মানুষের মনে সৃষ্টি করতে পারে অসহায়ত্বের গভীর অনুভূতি।

আধুনিক বিজ্ঞান ভূমিকম্পের ভৌত কারণ হিসেবে ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও ভূত্বকের চাপকে চিহ্নিত করে। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিতে প্রতিটি ঘটনার পেছনে আল্লাহ তাআলার হিকমত ও নির্দেশনা রয়েছে। কোরআন ও হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, পৃথিবীর বিভিন্ন বিপর্যয় মানুষের জন্য শিক্ষা, সতর্কবার্তা, পরীক্ষা এবং কখনো কখনো অবাধ্যতার পরিণতির স্মারক। তাই ভূমিকম্পকে শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আত্মসমালোচনা, তাওবা ও আল্লাহমুখী হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা উচিত।

ভূমিকম্প সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
পবিত্র কোরআনে বহু স্থানে ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানুষের গাফেলতিকে সতর্ক করে বলেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা কি এতই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার আজাব রাতারাতি তাদের কাছে এসে পড়বে না, যখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে?’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৭)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল; তবে আল্লাহ অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের পাপ ও অবাধ্যতা অনেক সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। তবে আল্লাহর রহমত এত ব্যাপক যে তিনি অসংখ্য অপরাধ ক্ষমা করে দেন।

কোরআনে ভূমিকম্পের পরিভাষা
কোরআনে ভূমিকম্প বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘জিলজাল’ এবং ‘দাক্কা’। জিলজাল অর্থ প্রচণ্ড কম্পন বা বারবার কেঁপে ওঠা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন পৃথিবী তার ভয়ংকর কম্পনে প্রকম্পিত হবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ১)

অন্যদিকে দাক্কা অর্থ প্রচণ্ড আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কখনো নয়! যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হবে।’ (সুরা : ফাজর, আয়াত : ২১)

ভূমিকম্প: কিয়ামতের একটি নিদর্শন
কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামত যত ঘনিয়ে আসবে, ভূমিকম্পের সংখ্যা তত বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের ভূকম্পন এক ভয়াবহ বিষয়।’ (সুরা : হাজ্জ, আয়াত : ১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৩৬)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ঘন ঘন ভূমিকম্প কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার অন্যতম আলামত।

পাপাচার ও ভূমিকম্প: হাদিসের সতর্কবার্তা
রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে যখন গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র এবং মদপানের প্রসার ঘটবে, তখন তাদের ওপর ভূমিধস, বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণ হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২২১২)
অন্য এক হাদিসে বিভিন্ন সামাজিক অনাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—আমানতের খিয়ানত, অবৈধ সম্পদ অর্জন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, অযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। (তিরমিজি, হাদিস : ১৪৪৭, অর্থগত বর্ণনা)

তবে মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট কোনো ভূমিকম্প কোন পাপের কারণে ঘটেছে—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহই এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত। কিন্তু এসব ঘটনা মানুষের জন্য সতর্কবার্তা ও আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

ইতিহাসে ভূমিকম্পের মাধ্যমে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, অতীতের বহু অবাধ্য জাতি আল্লাহর শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষত সামূদ জাতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তাদেরকে ভূকম্পন আঘাত করল, ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৭৮)

ভূমিকম্পের সময় একজন মুমিনের করণীয়
ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে একজন মুমিনের প্রথম কাজ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
১. তাওবা ও ইস্তিগফার করা

বেশি বেশি পড়া—

أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি।’

২. দোয়া ও জিকির করা
আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা, রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।

৩. সালাত আদায় করা
বিপদের সময় নফল সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা।

৪. আত্মসমালোচনা করা
নিজের গুনাহ, অবহেলা ও দায়িত্ব সম্পর্কে চিন্তা করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা।

৫. অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ভূমিকম্প পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বৈজ্ঞানিকভাবে এর কারণ ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়া হলেও একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছুই সংঘটিত হয় না। তাই প্রতিবার পৃথিবী কেঁপে উঠলে আমাদের মনে রাখা উচিত—একদিন এমন এক মহাভূমিকম্প আসবে, যা হবে কিয়ামতের সূচনা। সেদিন কোনো শক্তি, সম্পদ বা ক্ষমতা মানুষকে রক্ষা করতে পারবে না; রক্ষা করবে শুধুমাত্র ঈমান ও নেক আমল। তাই ভূমিকম্পকে শুধু আতঙ্কের কারণ হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর স্মরণে ফিরে যাওয়ার একটি জাগরণী বার্তা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করুন, তাওবার জীবন দান করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ নসিব করুন। আমিন।

তাহাজ্জুদের নামাজ যেভাবে সৌভাগ্য বয়ে আনে

মাইমুনা আক্তার
তাহাজ্জুদের নামাজ যেভাবে সৌভাগ্য বয়ে আনে
সংগৃহীত ছবি

রাতের শেষ ভাগে যখন মানুষেরা গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে, তখন কিছু সৌভাগ্যবান বান্দা নিজেদের বিছানা ছেড়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হয়। তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, কান্নাভেজা কণ্ঠে রবের কাছে ক্ষমা, রহমত ও হেদায়েত প্রার্থনা করে।

রাতের শেষ অংশের ইবাদতকে মহান আল্লাহ বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। এটি নেককারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঈমানদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমার নিদর্শনাবলিতে শুধু তারাই বিশ্বাস করে, যাদেরকে এর দ্বারা উপদেশ দেওয়া হলে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আর তাদের প্রতিপালকের প্রশংসা সহকারে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে আর তারা অহংকার করে না। তারা তাদের (দেহের) পার্শ্বগুলো বিছানা থেকে আলাদা করে (জাহান্নামের) ভীতি ও (জান্নাতের) আশা নিয়ে তাদের প্রতিপালককে ডাকে, আর আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে।’ (সুরা : সিজদা, আয়াত : ১৫-১৬)

অন্য আয়াতে আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের গুণাবলি আলোচনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা রাতে খুব কমই শয়ন করত। আর তারা রাতের শেষ প্রহরে ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত  : ১৭-১৮)

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, শেষ রাতে ইবাদত ও ইস্তিগফার করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ গুণ। এই গুণে গুণান্বিত হতে পারা অত্যন্ত সৌভাগ্যের, যা মহান আল্লাহর দরবারে মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

এ ব্যাপারে অবগত করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ো, ওটা তোমার জন্য নফল, শিগগিরই তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত স্থানে উন্নীত করবেন।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯)
আমাদের প্রিয় নবী (সা.) তাঁর উম্মতদের শেষ রাতের আমলের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মহামহিম আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছে এমন যে আমার নিকট চাইবে। আমি তাকে তা দেব। কে আছে এমন যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।’ (বুখারি, হাদিস : ১১৪৫)

সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনের জীবনে তাহাজ্জুদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তাঁরা রাতের শেষ অংশকে নিজেদের আত্মশুদ্ধি, তাওবা, জিকির ও দোয়ার জন্য নির্ধারিত রাখতেন। কারণ তাঁরা জানতেন, এ সময়ের একটি সিজদা ও একটি অশ্রুবিন্দু মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

সুতরাং শেষ রাতের ইবাদত শুধু একটি নফল আমল নয়; এটি আল্লাহর নৈকট্য, মর্যাদা বৃদ্ধি, গুনাহ মাফ, দোয়া কবুল এবং হৃদয়ের প্রশান্তি অর্জনের এক মহামূল্যবান সুযোগ। যারা ঘুমের মায়া ত্যাগ করে শেষ রাতে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ায়, তারা সত্যিই সৌভাগ্যবান। কারণ তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমত, ক্ষমা ও নৈকট্যের সুসংবাদ। মহান আল্লাহ সবাইকে এই সৌভাগ্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

কৃষকের কাজ আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কৃষকের কাজ আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন
সংগৃহীত ছবি

কৃষিকাজ অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেশা। এটি আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনের একটি এবং মানুষের অন্তরে ঈমান সুদৃঢ় করার একটি মাধ্যম। এটি মহান আল্লাহর একত্ববাদের সুস্পষ্ট প্রমাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, তোমরা যে বীজ বপন করো? তোমরাই কি তা উৎপন্ন করো, নাকি আমরাই উৎপন্নকারী?’ (সুরা : আল-ওয়াকিয়া, আয়াত : ৬৩-৬৪)

কৃষিজগতের বিভিন্ন বৈচিত্র্য আল্লাহর কুদরতের এক মহান নিদর্শন। কোনোটি শস্য, কোনোটি ফল, কোনোটি ফুল, কোনোটি ঘাস, কোনোটি ফলমূল, কোনোটি শাক-সবজি, কোনোটি লতানো, কোনোটি আবার মাচাবিহীন—সবই আল্লাহর সৃষ্টির বিস্ময়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব মানুষ যেন তার খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি দেয়।

আমিই প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করেছি, অতঃপর আমি জমিনকে যথাযথভাবে বিদীর্ণ করেছি। তারপর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙুর, শাক-সবজি, জলপাই, খেজুর, ঘন বৃক্ষরাজির উদ্যান, ফলমূল ও ঘাস—তোমাদের ও তোমাদের পশুদের ভোগের জন্য।’ (সুরা : আবাসা, আয়াত : ২৪-৩২)

কৃষকের কাজ আল্লাহর কুদরতের প্রমাণ : কৃষক মাটিতে একটি বীজ বপন করে, আল্লাহর দেওয়া পানি দিয়ে তা সেচ দেয়, আল্লাহর তৈরি জমি প্রস্তুত করে এবং আল্লাহর দেওয়া যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। এরপর সে অপেক্ষা করে—এই বীজ থেকে কী বের হয়।

কিন্তু কে সেই বীজকে বিদীর্ণ করে অঙ্কুর বের করেন? কে মাটিকে ভেদ করে ফসল বের করেন? আল্লাহ ছাড়া আর কে?
ফসল দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্বের জীবন্ত উদাহরণ : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত হলো এমন—যেমন আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, ফলে তার দ্বারা জমিনের উদ্ভিদ মানুষের ও পশুর খাদ্যের সঙ্গে মিশে যায়। অবশেষে যখন জমিন তার সৌন্দর্য ধারণ করে এবং সুশোভিত হয়, আর তার অধিবাসীরা মনে করে যে তারা এর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান, তখন আমার আদেশ রাত বা দিনে এসে পড়ে। অতঃপর আমি তাকে এমনভাবে কেটে ফেলি যেন গতকাল এখানে কিছুই ছিল না। এভাবেই আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করি।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ২৪)

এই উদাহরণের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে বুঝিয়েছেন—মানুষও প্রথমে দুর্বল অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, এরপর যৌবনে শক্তিশালী হয় এবং মনে করে সে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবে, সবকিছু করতে পারবে। তারপর বার্ধক্য আসে, শক্তি কমে যায়, অবশেষে তার জীবনও সেই ফসলের মতো হয়ে যায়, যা প্রথমে সবুজ ছিল, পরে শুকিয়ে কেটে ফেলা হয়। ফসল, উত্তম কথা ও দান : কথার সঙ্গে ফসলের এবং আল্লাহর পথে ব্যয়ের সঙ্গে ফসলের গভীর মিল রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা উত্তম ও মন্দ কথার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কিভাবে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন? উত্তম বাক্য হলো উত্তম বৃক্ষের মতো, যার মূল সুদৃঢ় এবং যার শাখা আকাশে। সে তার রবের অনুমতিতে সর্বদা ফল দান করে। আর মন্দ বাক্যের দৃষ্টান্ত হলো মন্দ বৃক্ষের মতো, যা জমিনের ওপর থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে, যার কোনো স্থায়িত্ব নেই।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ২৪-২৬)

অতএব, উত্তম কথা ও সৎকর্মের সঙ্গে ফসলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

কৃষিকাজ ও আল্লাহর ইবাদতের সম্পর্ক
১. উদ্ভিদ আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে :
আল্লাহ বলেন, ‘সাত আসমান, জমিন এবং এতে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। এমন কোনো বস্তু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ করে না; কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ বুঝতে পারো না।’ (সুরা : আল-ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৪৪)

২. উদ্ভিদ আল্লাহর সামনে সিজদা করে : আল্লাহ বলেন, ‘আর তৃণলতা ও বৃক্ষ উভয়েই সিজদা করে।’ (সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ৬)

৩. ফসলের মধ্যে জাকাত আছে : আল্লাহ বলেন, ‘আর ফসল কাটার দিন তার হক (জাকাত) প্রদান করো।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ১৪১)

কৃষিকাজ ও হজের সম্পর্ক : হজের সময় মক্কার পবিত্র এলাকার উদ্ভিদ ও গাছপালা নষ্ট করা নিষিদ্ধ। রাসুুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মক্কাকে হারাম (পবিত্র) করেছেন। আমার আগে বা আমার পরে কারো জন্য এটি বৈধ নয়। আমার জন্যও দিনের কিছু সময়ের জন্য বৈধ করা হয়েছিল। এর ঘাস কাটা যাবে না, গাছ কাটা যাবে না, শিকার তাড়ানো যাবে না...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৩৩)

কৃষিকাজ একটি নৈতিক শিক্ষালয়
কৃষি মানুষকে বহু উত্তম চরিত্র শিক্ষা দেয়। যেমন-

১. আমানতদারি : কৃষকের হাতে মানুষের জীবনধারণের একটি বড় আমানত রয়েছে। এই আমানত সঠিকভাবে রক্ষা করা জরুরি। ইউসুফ (আ.) মিসরের রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন— ‘তোমরা সাত বছর ধারাবাহিকভাবে চাষ করবে। অতঃপর যা কাটবে তা শীষের মধ্যে রেখে দেবে, সামান্য যা খাবে তা ছাড়া। এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর, যা তোমাদের সঞ্চিত সব খেয়ে ফেলবে...।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪৭-৪৯)

তাঁদের এই পরামর্শ অনুসরণের কারণে আল্লাহর ইচ্ছায় তারা দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

২. বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা : ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে বের হওয়ার পর আল্লাহ তাঁর জন্য ইয়াকতিনগাছ উৎপন্ন করেছিলেন, যা তাঁর দুর্বলতা দূর করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি তাকে তীরে নিক্ষেপ করলাম, তখন সে ছিল অসুস্থ। আর আমি তার ওপর একটি ইয়াকতিনগাছ উৎপন্ন করলাম।’ (সুরা : আস-সাফফাত, আয়াত : ১৪৫-১৪৬)

এভাবেই মরিয়ম (আ.)-এর জন্য খেজুরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল— ‘আর তুমি খেজুরগাছের কাণ্ড তোমার দিকে নাড়াও, তা তোমার ওপর পাকা তাজা খেজুর ফেলবে।’ (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ২৫)

৩. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা : কৃষক প্রতিদিন নিজের চোখের সামনে আল্লাহর নিয়ামত দেখতে পায়। তাই তার উচিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। দুই বাগানের মালিকের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়—সে আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করেছিল। তার মুমিন বন্ধু তাকে বলেছিল—‘তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে তখন কেন বললে না—মাশাআল্লাহ, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো শক্তি নেই?’ (সুরা : আল-কাহফ, আয়াত : ৩৯)
কিন্তু সে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ফলে তার বাগান ধ্বংস হয়ে যায়।

উপসংহার
কৃষকদের জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে যে মহান আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবিদের উদাহরণ দিয়েছেন ফসলের মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সঙ্গীরা কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়ালু। তুমি তাদের দেখবে তারা রুকু ও সিজদায় অবনত, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে। তাওরাত ও ইনজিলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো এমন একটি চারাগাছের মতো, যা প্রথমে কুঁড়ি বের করে, পরে তাকে শক্তিশালী করে, তারপর তা মোটা ও দৃঢ় হয় এবং নিজের কাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে যায়—যা কৃষকদের আনন্দ দেয়।’ (সুরা : আল-ফাতহ, আয়াত : ২৯)

অতএব, কৃষিকাজ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়; বরং এটি আল্লাহর নিদর্শন, ইবাদতের একটি ক্ষেত্র এবং মানবতার সেবার এক মহান পথ।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৩ জুন ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৩ জুন ২০২৬

আজ মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩, ৭ মহররম, ১৪৪৮।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০৪ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪০ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫৩ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৯ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৭ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৯ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১২ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।