বর্তমান যুগে জার্সি শুধ খেলোয়াড়দের পোশাক নয়; বরং এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন পোশাকেরও একটি জনপ্রিয় অংশ। কেউ জার্সি পরেন আরামদায়ক ও টেকসই পোশাক হিসেবে, আবার কেউ তার প্রিয় দল, ক্লাব বা খেলোয়াড়ের প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য জার্সি সংগ্রহ করেন। বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট বা বিভিন্ন ক্লাব প্রতিযোগিতার সময় জার্সির ব্যবহার আরো ব্যাপক হয়ে ওঠে। তবে একজন সচেতন মুসলমানের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—জার্সি পরে নামাজ আদায় করা কি বৈধ? জার্সিতে যদি প্রাণীর ছবি থাকে, তাহলে তার হুকুম কী? অনেক জার্সিতে ব্যবহৃত ক্রসচিহ্ন বা খ্রিষ্টীয় প্রতীক সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী? আর এসব জার্সির ব্যবসা করা কি হালাল, নাকি তা পরিহার করাই উত্তম?
নামাজে পোশাকের নীতিমালা
নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য পোশাকের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক শর্ত রয়েছে—
১. পোশাক পাক-পবিত্র হতে হবে।
২. সতর যথাযথভাবে আবৃত থাকতে হবে।
৩. শরিয়ত নিষিদ্ধ কোনো বিষয় পোশাকে থাকা যাবে না।
৪. পোশাক শালীন ও সম্মানজনক হওয়া উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য (পরিচ্ছন্ন ও শালীন পোশাক) গ্রহণ করো।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, নামাজের জন্য পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব এবং ইসলামী আদবের অংশ।
জার্সি পরে নামাজ আদায়ের বিধান
জার্সি নিজে কোনো নিষিদ্ধ পোশাক নয়। তাই সাধারণ জার্সি পরে নামাজ আদায় করলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু অনেক সময় জার্সিতে বাঘ, সিংহ, ঈগল বা অন্য প্রাণীর ছবি বা প্রতীক থাকে। আবার কিছু জার্সিতে মানুষের ছবিও থাকে। যদি পোশাকে এমন প্রাণীর ছবি থাকে যার মুখমণ্ডল ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়, তাহলে তা পরিধান করা মাকরূহ এবং তা পরে নামাজ আদায় করাও মাকরূহ। তবে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে না; নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়। (খোলাসাতুল ফতোয়া, ১/৫৮, আল-মুহিতুল বুরহানি, ২/১৩৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ঘরে ছবি থাকে, সে ঘরে ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২২৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১০৬)
এ কারণে মুসলমানের জন্য ছবি-মুক্ত পোশাক নির্বাচন করা অধিক উত্তম ও সতর্কতাপূর্ণ।
বিশেষ সতর্কতা
বর্তমানে অনেক আন্তর্জাতিক ক্লাব, জাতীয় দল কিংবা ব্র্যান্ডের লোগোতে ক্রসচিহ্ন দেখা যায়। ক্রস মূলত খ্রিষ্টধর্মের একটি সুপরিচিত ধর্মীয় প্রতীক। রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্রসচিহ্নের প্রতি বিশেষ বিরাগ পোষণ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ঘরে কোনো ক্রসচিহ্নযুক্ত বস্তু দেখলে তা অপসারণ করে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৫২)
এ কারণে সুস্পষ্ট ক্রসচিহ্নযুক্ত জার্সি পরিধান করা এবং তা পরে নামাজ আদায় করা অপছন্দনীয়। বিশেষত যদি তা খ্রিষ্টীয় ক্রসচিহ্নযুক্ত প্রতীকসহ হয়, তাহলে তা আরো গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
জার্সি বিক্রি করা কি বৈধ?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্যণীয়। অনেক ফকিহের মতে, ছবিযুক্ত কাপড় বা ক্রসযুক্ত পোশাক বিক্রি করা সরাসরি হারাম না হলেও মাকরূহ। কারণ এর মাধ্যমে এমন বস্তুর প্রচলন ঘটে যা শরয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। ফিকহের বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখ রয়েছে, ‘যে বস্তু নিজে বৈধ কিন্তু কখনো কখনো গুনাহের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, তার বিক্রয় মূলত বৈধ; তবে যদি তা বিশেষভাবে গুনাহের কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিক্রি করা হয়, তাহলে তা নিন্দনীয় ও গুনাহের সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)
সুতরাং ছবিযুক্ত বা ক্রসযুক্ত জার্সি বিক্রি করার মধ্যে সরাসরি হারাম বলা না গেলেও তা নিঃসন্দেহে একটি মাকরূহ ও অনুৎসাহিত ব্যবসার আওতাভুক্ত হতে পারে। (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৬২, মাজমাউল আনহার, ৪/১৮৮)
তাই যদি ব্যবসার অধিকাংশ জার্সি হয়—ছবি-মুক্ত, ক্রস-মুক্ত, অশ্লীল স্লোগানবিহীন, এবং ইসলামবিরোধী প্রতীকবিহীন, তাহলে এ ব্যবসা মূলত হালাল ব্যবসা। অন্যথায় ব্যবসা মাকরূহ ও শরয়ি দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর জন্য করণীয় হলো, শুধু লাভের কথা চিন্তা না করে উপার্জনের হালাল-হারামের প্রতিও সচেতন দৃষ্টি রাখা। তাই যদি সম্ভব হয়—ছবি-মুক্ত জার্সি, সাধারণ স্পোর্টস জার্সি, কাস্টম ডিজাইনের জার্সি, ক্রস ও আপত্তিকর প্রতীকবিহীন পোশাক নিয়ে ব্যবসা করাই অধিক নিরাপদ, উত্তম এবং তাকওয়ার দাবি। এতে ব্যবসাও হবে, আবার সন্দেহজনক বিষয় থেকেও দূরে থাকা যাবে। (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৬১)
জার্সি পরিধান করা অবৈধ নয়। জার্সি পরে নামাজও শুদ্ধ হয়ে যায়, যদি নামাজের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ হয়। তবে প্রাণীর স্পষ্ট ছবি, মানুষের প্রতিকৃতি কিংবা ক্রসচিহ্নযুক্ত জার্সি পরিধান ও তা পরে নামাজ আদায় করা শরিয়াহ পরিপন্থী। একই ভাবে এসব জার্সির ব্যবসা সরাসরি হারাম না হলেও ফোকাহায়ে কেরাম তা মাকরূহ তথা অপছন্দনীয় বলেছেন এবং অনুৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে উত্তম আমল ও হালাল উপার্জন গ্রহণ করার এবং সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।




