উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও তিস্তা নদীতে পানি বাড়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুরক্ষা বাঁধে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। তীব্র স্রোতে এলজিইডির ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁশের পাইলিং ভেঙে যাওয়ায় সেতু ও রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক হুমকিতে পড়েছে।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের তিন গ্রামের এক হাজারের বেশি পরিবার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
এদিকে, দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুরক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন ও ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা বাঁশের পাইলিং (স্পার) ধসে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের দলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে।
জানা গেছে, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারি বৃষ্টির কারণে তিস্তা নদীতে পানিপ্রবাহ বেড়েছে। এতে সেতুরক্ষায় নির্মাণ করা বাঁশের পাইলিং ভেঙে গেছে। এর প্রভাবে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর উত্তর-পশ্চিম অংশের রক্ষা বাঁধেও বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের ফলে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু ও রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়কও হুমকির মুখে পড়েছে।
সূত্র জানায়, গত শনিবার (২০ জুন) সন্ধ্যা থেকে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বাড়ে। এতে মহিপুর দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের রক্ষা বাঁধে ভাঙন শুরু হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ মিটারের বেশি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং সেখানে প্রায় ৬০ ফুট গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গতবছর নদীভাঙনে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর রক্ষা বাঁধের ১০০ মিটারেরও বেশি অংশ নদীগর্ভে চলে যায়। ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার ছয় মাস না যেতেই চলতি মৌসুমের প্রথম বড় ঢলেই সেটি ধসে পড়ে।
ভাঙনে রক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। সেখানে প্রায় ৬০ ফুট গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘ভাঙনের শুরুতেই দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা হলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না। দুই-এক লাখ টাকার জরুরি কাজেই ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন কোনো বরাদ্দ না আসায় ভাঙন বাড়তে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘গত বছর থেকেই বরাদ্দের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’
ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘বুয়েটের এক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি প্রথম বড় পানির চাপই সহ্য করতে পারেনি। ফলে ১৪ লাখ টাকার কাজ কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।’
এলজিইডির গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘গত বছর ভাঙন শুরু হলে বিষয়টি আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের নদীভাঙন মোকাবেলায় অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করা হয়। তবে এবার পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সেটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।’
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, ‘ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘ভাঙনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কারণ এটি শুধু একটি বাঁধের ক্ষতি নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও আঞ্চলিক সড়কের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এ কারণে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আহসান হাবিব বলেন, ‘তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ ও ভাঙন পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য টেকসই নদীশাসন ব্যবস্থার বিকল্প নেই।’







