মানুষের জীবনে বিয়ে শুধু একটি সামাজিক বন্ধন নয়; বরং এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক পবিত্র সম্পর্ক। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে দুনিয়ার জীবনেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং জান্নাতেও এই সম্পর্কের স্থায়িত্বের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাই অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন জাগে—কোনো নারীর যদি দুনিয়ায় একাধিক স্বামী হয়ে থাকে, যেমন প্রথম স্বামী মৃত্যুবরণ করার পর তিনি পুনরায় বিয়ে করেছেন, তাহলে জান্নাতে তিনি কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবেন?
জান্নাতে প্রিয়জনদের পুনর্মিলন
ইসলাম জান্নাতকে এমন এক আবাসস্থল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়, যেখানে কোনো দুঃখ, কষ্ট, অপূর্ণতা বা বিচ্ছেদ থাকবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরও তাদের সঙ্গে মিলিত করে দেব।’ (সুরা : তুর, আয়াত : ২১)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্থায়ী জান্নাত, যাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল, তারাও তাদের সঙ্গে প্রবেশ করবে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৩)
প্রখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, জান্নাতবাসীদের আনন্দকে পূর্ণাঙ্গ করার জন্য আল্লাহ তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে একত্রিত করবেন, যদিও তাদের আমলের স্তরে কিছু পার্থক্য থাকে।
একাধিক বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবেন?
কিছু আলেমের মতে, কোনো নারীর একাধিক স্বামী থাকলে তিনি জান্নাতে তার সর্বশেষ স্বামীর সঙ্গে থাকবেন। এ মতের পক্ষে আবু দারদা (রা.) থেকে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়। তিনি তার স্ত্রী উম্মু দারদাকে বলেছিলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কোনো নারী যার স্বামী মারা যাওয়ার পর অন্য কাউকে বিয়ে করে, সে জান্নাতে তার শেষ স্বামীর জন্য হবে।’ (তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৩১৩০)
যদিও মুহাদ্দিসরা এ বর্ণনার সনদ নিয়ে আলোচনা করেছেন, তবুও অনেক ফকিহ এ মতকে গ্রহণ করেছেন। আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, উম্মে সালামা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোনো নারীর যদি দুনিয়ায় দুইজন স্বামী থাকে, তবে জান্নাতে সে কার সঙ্গে থাকবে?’ উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তাকে পছন্দের সুযোগ দেওয়া হবে। তখন সে সেই স্বামীকে বেছে নেবে, যে দুনিয়ায় তার সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করেছিল।’ এরপর তিনি বলেন, ‘সুন্দর চরিত্র দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণকে একত্রিত করে।’ (আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি)
এই বর্ণনা থেকে অনেক আলেম মত প্রকাশ করেছেন যে, জান্নাতে নারীর সন্তুষ্টি ও সুখের বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে।
কোনো কোনো ইসলামী স্কলারের মতে, জান্নাত যেহেতু পরিপূর্ণ সুখের আবাস, তাই সেখানে কাউকে এমন অবস্থায় রাখা হবে না, যা তার মনে কষ্ট বা অপূর্ণতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। ফলে কোনো নারীর যদি একাধিক স্বামী থাকে, তবে তাকে তার পছন্দ অনুযায়ী স্বামী নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এই মতকে সমর্থন করে আল্লাহ তাআলার সাধারণ ঘোষণা, ‘সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা তোমাদের মন চাইবে এবং সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা তোমরা কামনা করবে।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩১)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘সেখানে থাকবে যা মন আকাঙ্ক্ষা করে এবং যা চোখকে তৃপ্ত করে।’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৭১)
আর সমকালীন বর্তমানের আলেমরা এভাবে সমন্বয় করেছেন যে, যদি কোনো নারীর স্বামীদের মধ্যে একজন তার সঙ্গে উত্তম আচরণকারী ও অধিক নেককার হয়ে থাকেন, তবে তিনি তাকে বেছে নেবেন। আর যদি তাদের মর্যাদা ও আচরণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য না থাকে, তবে তিনি শেষ স্বামীর সঙ্গে থাকবেন। তবে মনে রাখতে হবে, এসব ব্যাখ্যার অনেকগুলোই ইজতিহাদভিত্তিক। এ বিষয়ে কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কোনো চূড়ান্ত ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য নেই, যা সব মতভেদের অবসান ঘটিয়ে দেয়।
অতএব, দুই বা ততোধিক বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবেন—এ বিষয়ে ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। কেউ বলেন, তিনি শেষ স্বামীর সঙ্গে থাকবেন; কেউ বলেন, তাকে পছন্দের অধিকার দেওয়া হবে; আবার কেউ বলেন, তিনি সেই স্বামীকে বেছে নেবেন, যিনি দুনিয়াতে তার সঙ্গে সবচেয়ে উত্তম আচরণ করেছিলেন।
তবে এসব মতের ঊর্ধ্বে যে সত্যটি নির্দ্বিধায় বলা যায়, তা হলো—জান্নাত আল্লাহর সন্তুষ্ট বান্দাদের জন্য পরিপূর্ণ সুখ, শান্তি ও তৃপ্তির আবাস। সেখানে কোনো মুমিনের মনে দুঃখ, আফসোস বা অপূর্ণতা থাকবে না। আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম হিকমত ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রত্যেক জান্নাতবাসীর জন্য এমন ব্যবস্থা করবেন, যাতে তারা চিরস্থায়ী সুখ ও প্রশান্তি লাভ করে। সুতরাং এ বিষয়ে চূড়ান্ত জ্ঞান আল্লাহর কাছেই রয়েছে, আর মুমিনের কর্তব্য হলো—জান্নাত লাভের জন্য ঈমান ও নেক আমলে জীবনকে সাজিয়ে তোলা।




