• ই-পেপার

অর্ডার বাতিল হলে কাস্টমস বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের বিধান

একাধিক বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবেন?

ইসলামী জীবন ডেস্ক
একাধিক বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবেন?
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে বিয়ে শুধু একটি সামাজিক বন্ধন নয়; বরং এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক পবিত্র সম্পর্ক। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে দুনিয়ার জীবনেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং জান্নাতেও এই সম্পর্কের স্থায়িত্বের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাই অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন জাগে—কোনো নারীর যদি দুনিয়ায় একাধিক স্বামী হয়ে থাকে, যেমন প্রথম স্বামী মৃত্যুবরণ করার পর তিনি পুনরায় বিয়ে করেছেন, তাহলে জান্নাতে তিনি কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবেন?

জান্নাতে প্রিয়জনদের পুনর্মিলন
ইসলাম জান্নাতকে এমন এক আবাসস্থল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়, যেখানে কোনো দুঃখ, কষ্ট, অপূর্ণতা বা বিচ্ছেদ থাকবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরও তাদের সঙ্গে মিলিত করে দেব।’ (সুরা : তুর, আয়াত : ২১)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্থায়ী জান্নাত, যাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল, তারাও তাদের সঙ্গে প্রবেশ করবে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৩)
প্রখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, জান্নাতবাসীদের আনন্দকে পূর্ণাঙ্গ করার জন্য আল্লাহ তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে একত্রিত করবেন, যদিও তাদের আমলের স্তরে কিছু পার্থক্য থাকে।

একাধিক বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবেন?
কিছু আলেমের মতে, কোনো নারীর একাধিক স্বামী থাকলে তিনি জান্নাতে তার সর্বশেষ স্বামীর সঙ্গে থাকবেন। এ মতের পক্ষে আবু দারদা (রা.) থেকে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়। তিনি তার স্ত্রী উম্মু দারদাকে বলেছিলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কোনো নারী যার স্বামী মারা যাওয়ার পর অন্য কাউকে বিয়ে করে, সে জান্নাতে তার শেষ স্বামীর জন্য হবে।’ (তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৩১৩০)

যদিও মুহাদ্দিসরা এ বর্ণনার সনদ নিয়ে আলোচনা করেছেন, তবুও অনেক ফকিহ এ মতকে গ্রহণ করেছেন। আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, উম্মে সালামা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোনো নারীর যদি দুনিয়ায় দুইজন স্বামী থাকে, তবে জান্নাতে সে কার সঙ্গে থাকবে?’ উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তাকে পছন্দের সুযোগ দেওয়া হবে। তখন সে সেই স্বামীকে বেছে নেবে, যে দুনিয়ায় তার সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করেছিল।’ এরপর তিনি বলেন, ‘সুন্দর চরিত্র দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণকে একত্রিত করে।’ (আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি)
এই বর্ণনা থেকে অনেক আলেম মত প্রকাশ করেছেন যে, জান্নাতে নারীর সন্তুষ্টি ও সুখের বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে।

কোনো কোনো ইসলামী স্কলারের মতে, জান্নাত যেহেতু পরিপূর্ণ সুখের আবাস, তাই সেখানে কাউকে এমন অবস্থায় রাখা হবে না, যা তার মনে কষ্ট বা অপূর্ণতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। ফলে কোনো নারীর যদি একাধিক স্বামী থাকে, তবে তাকে তার পছন্দ অনুযায়ী স্বামী নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এই মতকে সমর্থন করে আল্লাহ তাআলার সাধারণ ঘোষণা, ‘সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা তোমাদের মন চাইবে এবং সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা তোমরা কামনা করবে।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩১)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘সেখানে থাকবে যা মন আকাঙ্ক্ষা করে এবং যা চোখকে তৃপ্ত করে।’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৭১)

আর সমকালীন বর্তমানের আলেমরা এভাবে সমন্বয় করেছেন যে, যদি কোনো নারীর স্বামীদের মধ্যে একজন তার সঙ্গে উত্তম আচরণকারী ও অধিক নেককার হয়ে থাকেন, তবে তিনি তাকে বেছে নেবেন। আর যদি তাদের মর্যাদা ও আচরণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য না থাকে, তবে তিনি শেষ স্বামীর সঙ্গে থাকবেন। তবে মনে রাখতে হবে, এসব ব্যাখ্যার অনেকগুলোই ইজতিহাদভিত্তিক। এ বিষয়ে কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কোনো চূড়ান্ত ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য নেই, যা সব মতভেদের অবসান ঘটিয়ে দেয়।

অতএব, দুই বা ততোধিক বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবেন—এ বিষয়ে ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। কেউ বলেন, তিনি শেষ স্বামীর সঙ্গে থাকবেন; কেউ বলেন, তাকে পছন্দের অধিকার দেওয়া হবে; আবার কেউ বলেন, তিনি সেই স্বামীকে বেছে নেবেন, যিনি দুনিয়াতে তার সঙ্গে সবচেয়ে উত্তম আচরণ করেছিলেন।

তবে এসব মতের ঊর্ধ্বে যে সত্যটি নির্দ্বিধায় বলা যায়, তা হলো—জান্নাত আল্লাহর সন্তুষ্ট বান্দাদের জন্য পরিপূর্ণ সুখ, শান্তি ও তৃপ্তির আবাস। সেখানে কোনো মুমিনের মনে দুঃখ, আফসোস বা অপূর্ণতা থাকবে না। আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম হিকমত ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রত্যেক জান্নাতবাসীর জন্য এমন ব্যবস্থা করবেন, যাতে তারা চিরস্থায়ী সুখ ও প্রশান্তি লাভ করে। সুতরাং এ বিষয়ে চূড়ান্ত জ্ঞান আল্লাহর কাছেই রয়েছে, আর মুমিনের কর্তব্য হলো—জান্নাত লাভের জন্য ঈমান ও নেক আমলে জীবনকে সাজিয়ে তোলা।

হাদিসের বাণী

সমাজে অসৎকাজ থেকে বাধা না দেওয়ার পরিণতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সমাজে অসৎকাজ থেকে বাধা না দেওয়ার পরিণতি
সংগৃহীত ছবি

নোমান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি কারিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহর নির্ধারিত সীমায় অবস্থানকারী এবং ওই সীমা লঙ্ঘনকারীর দৃষ্টান্ত হলো ওই কাফেলার মতো, যারা দুই তলাবিশিষ্ট একটি জাহাজে আরোহণ করার জন্য লটারির মাধ্যমে কিছু লোক নিচতলায় অবস্থান করল আর কিছু লোক ওপরের তলায়...।

হাদিসের সহজ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : একটা জাহাজে কয়েকজন লোক আরোহণ করল। কেউ নিচে কেউ ওপরে। তো নিচতলার লোকজনের পানির প্রয়োজন দেখা দিল। তারা সেই পানির জন্য ওপরের তলায় না গিয়ে ভাবল, আমাদের নিচেই তো পানি আছে, তাই তারা সেই জাহাজের তলা ফুটা করার সিদ্ধান্ত নিল। এখন ওপরের তলার লোকজন যদি নিচতলার লোকজনকে বাধা না দেয়, তাহলে সবাই ডুবে মরবে। আর যদি এই ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে নিষেধ করে, তাহলে সবাই বেঁচে যাবে। আর এই দৃষ্টান্ত অসৎ কাজের বাধা প্রদান না-করার সাথে করা হয়েছে। সমাজে যদি অসৎকাজের বাধা প্রদান না থাকে, তাহলে পুরো সমাজ এই জাহাজবাসীর মতো ধ্বংস হয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ২৪৯৩)

শিক্ষা ও বিধান

১. সমাজে কেউ অন্যায়, পাপ বা ক্ষতিকর কাজ করলে তাকে যথাসাধ্য বাধা দেওয়া মুসলমানদের দায়িত্ব। কেননা ইসলাম অন্যায়ের প্রতি নীরব থাকাকে সমর্থন করে না।

২. একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর অন্যায় কাজের পরিণতি অনেক সময় পুরো সমাজকে ভোগ করতে হয়। জাহাজের ছিদ্র যেমন সবাইকে ডুবিয়ে দেয়, তেমনি সমাজে ছড়িয়ে পড়া পাপ ও অপরাধও সামষ্টিক বিপর্যয় ডেকে আনে।

৩. মানুষ একা নয়; সবাই একটি সমাজের অংশ। তাই অন্যের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড দেখে উদাসীন থাকা উচিত নয়।

৪. নীরবতা অনেক সময় অপরাধে সহযোগিতার শামিল। যারা জাহাজে ছিদ্র করতে চেয়েছিল, তাদের বাধা না দিলে উপরতলার লোকেরাও ধ্বংস হতো। একইভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়া অনেক সময় সেই অন্যায়ের পরোক্ষ সমর্থন হয়ে যায়।

৫. সঠিক সময়ে উপদেশ, নসিহত ও সংশোধনের চেষ্টা ব্যক্তি ও সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

৬. কেউ নিজের ইচ্ছামতো এমন কিছু করতে পারে না, যা অন্যের ক্ষতি বা সামষ্টিক ক্ষতির কারণ হয়। ইসলামে ব্যক্তিস্বাধীনতারও সীমারেখা আছে।

সবশেষে এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, একটি সমাজের মানুষ পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িত, যেমন একটি জাহাজের যাত্রীরা। সমাজে অন্যায়, পাপ ও ক্ষতিকর কাজকে প্রশ্রয় দিলে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত সবার ওপর এসে পড়ে। তাই ব্যক্তি ও সমাজকে রক্ষা করতে হলে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও উত্তম পদ্ধতিতে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে বাধা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

অশুভ লক্ষণ ও অকল্যাণ থেকে বাঁচতে যে দোয়া পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
অশুভ লক্ষণ ও অকল্যাণ থেকে বাঁচতে যে দোয়া পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবন সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, কল্যাণ-অকল্যাণের নানা ঘটনার সমষ্টি। কখনো এমন কিছু দৃশ্য, স্বপ্ন, সংবাদ বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যা মানুষের মনে অশুভ আশঙ্কা, ভয় কিংবা উদ্বেগ সৃষ্টি করে। জাহেলি যুগে মানুষ নানা কুসংস্কার, অশুভ লক্ষণ ও কল্পিত অমঙ্গলের ওপর বিশ্বাস করত। ইসলাম এসে এসব ভিত্তিহীন ধারণা দূর করে মানুষের হৃদয়ে তাওহিদ, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেছে। একজন মুমিন জানে, কোনো বস্তু, ব্যক্তি, দিন বা ঘটনার নিজস্বভাবে কল্যাণ বা অকল্যাণ সাধনের ক্ষমতা নেই; সব কিছুই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও ফয়সালার অধীন।

তবে মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতার কারণে কখনো কখনো মনে অশুভ আশঙ্কা জাগতেই পারে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং তাঁর কাছে দোয়ার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করা। দোয়াটি হলো-  


اللَّهُمَّ لَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ، وَلَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা লা ত্বাইরা ইল্লা ত্বাইরুকা ওয়া লা খাইরা ইল্লা খাইরুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনার পক্ষ থেকে অশুভ মঞ্জুর না হলে অশুভ বলে কিছু নেই। আপনার কল্যাণ ছাড়া কোনো কল্যাণ নেই। আর আপনি ছাড়া কোনো প্রকৃত ইলাহ নেই। 

হাদিস : ইবনে ওমর (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অশুভ লক্ষণ ও অকল্যাণ থেকে বাঁচতে মানুষ যেন এই দোয়া পাঠ করে।  (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর : ৭০৪৫)

হাদিসের বর্ণনায় দেশের সীমান্ত পাহারার মর্যাদা ও ফজিলত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হাদিসের বর্ণনায় দেশের সীমান্ত পাহারার মর্যাদা ও ফজিলত
সংগৃহীত ছবি

দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু একটি নাগরিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি মহান ইবাদতও বটে। মানুষের জীবন, সম্পদ, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত থাকেন, ইসলাম তাদের জন্য ঘোষণা করেছে বিশেষ মর্যাদা ও বিরাট সওয়াবের সুসংবাদ। ইসলামী পরিভাষায় সীমান্ত ও জনপদ রক্ষার উদ্দেশ্যে শত্রুর অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে থাকাকে বলা হয় ‘রিবাত’। কোরআন ও হাদিসে এই আমলের এমনসব ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, যা অনেক নফল ইবাদতের চেয়েও অধিক মর্যাদাপূর্ণ।

কোরআনে সীমান্ত পাহারায় সতর্ক থাকার নির্দেশ
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে অটল থাকো, সীমান্তে ও প্রহরায় নিয়োজিত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ২০০)

মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, এ আয়াতে মুসলিম সমাজ, রাষ্ট্র ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘রাবিতু’ শব্দটি সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে।

এক দিনের সীমান্ত পাহারা দুনিয়ার সব কিছুর চেয়েও উত্তম
সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে এক দিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর ওপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৯২)
দুনিয়ার বিপুল সম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগ-বিলাসের সঙ্গে তুলনা করেও সীমান্ত পাহারার প্রকৃত মর্যাদা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হাদিসটি এই মহান আমলের অসাধারণ ফজিলত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

এক দিন-এক রাতের প্রহরা এক মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে এক দিন ও এক রাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোজা রাখা এবং এক মাস রাতভর ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আত্মনিবেদিত দায়িত্ব পালন অনেক সময় দীর্ঘ নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াবের কারণ হতে পারে।

মৃত্যুর পরও বন্ধ হয় না সওয়াব
একই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে তার আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকবে, তার জন্য রিজিক প্রবাহিত হতে থাকবে এবং সে কবরের পরীক্ষার ভয় থেকে নিরাপদ থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
সাধারণত মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার মতো জনকল্যাণমূলক দায়িত্বের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর পরও অব্যাহত রাখেন।

যে রাত কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন এক রাতের কথা বলব না, যা কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ? সে হলো ওই প্রহরীর রাত, যে ভয়সংকুল স্থানে পাহারা দেয় এবং আশঙ্কা করে যে হয়তো সে তার পরিবারের কাছে জীবিত ফিরে যেতে পারবে না।’ (আল মুসতাদরাক আলা আসসহিহাইন, হাদিস : ২৪২৪, তারগিব ওয়াত তারহিব : ১২৩২)

এ হাদিস সীমান্তরক্ষীদের আত্মত্যাগ, ঝুঁকি ও আন্তরিকতার উচ্চ মর্যাদা তুলে ধরে।

যে চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—এক. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়; দুই. যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৯)
এ হাদিসে সীমান্ত ও জনপদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।


একটি রাতের প্রহরায় জান্নাতের সুসংবাদ
হুনাইনের যুদ্ধের রাতে সাহাবি আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি (রা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ পাহারার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সারা রাত ঘোড়ার পিঠে থেকে প্রহরা দেন এবং নামাজ ও প্রয়োজন ছাড়া একবারও দায়িত্বস্থল ত্যাগ করেননি। পরদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুমি নিজের জন্য জান্নাত অবধারিত করে নিয়েছ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫০১)
এ সুসংবাদ তার নিষ্ঠা, সতর্কতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দায়িত্ব পালনের ফলস্বরূপ প্রদান করা হয়েছিল।

জান্নাতের সুসংবাদ যাদের জন্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুসংবাদ ওই বান্দার জন্য, যে আল্লাহর পথে সদা প্রস্তুত থাকে। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে সে পাহারায় থাকে, আর পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে।’ (বুখারি ২৮৮৭)

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষা
বর্তমান সময়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সেনাবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। যদি তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি, দেশ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়তে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারা কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত এসব ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করতে পারেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে সীমান্ত পাহারা ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি মহান ইবাদত। এক দিনের প্রহরা দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান, এক দিন-এক রাতের প্রহরা এক মাসের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, এমনকি এর সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। যারা দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে দায়িত্ব পালন করেন, তারা নিঃসন্দেহে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।

ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরের ইবাদতকে নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা, সমাজের স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য নিবেদিত দায়িত্বশীল কাজকেও মহান সওয়াবের উৎস হিসেবে গণ্য করেছে। সীমান্ত পাহারা তারই একটি উজ্জ্বল ও অনন্য উদাহরণ। আল্লাহ তাআলা আমাদের দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী সব সদস্যের খেদমত কবুল করুন, তাদের হেফাজত করুন এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।