• ই-পেপার

খেতাবের আড়ালে রাজনীতি

এক টুকরো নিজস্ব মাটি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অনলাইন ডেস্ক
এক টুকরো নিজস্ব মাটি

সেদিন বৃষ্টির ভিতর রিকশাওয়ালা বলল, তার গাড়িটা ভারি ডিস্টার্ব করছে, একে বদলে নেবে পথে। রিকশার মালিকের আস্তানায় গেল, না পেয়ে মালিকের স্ত্রীকে বলে এলো, ‘বলবেন রিকশায় ডিফেক্ট আছে, রিটার্ন করতে হবে।’ নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল যে সে একেবারে অশিক্ষিত নয়, কিছুটা লেখাপড়া আছে তার। কিন্তু একে কি উন্নতি বলবেন আপনি? বলবেন কি যে নবযুগ এসে গেছে বাংলাদেশে? শিক্ষিত লোকেরা এখন রিকশা চালাচ্ছে। রিকশাচালকরা শিক্ষিত হচ্ছে- এমন হলে তা-ও বুঝতাম কিন্তু শিক্ষিতরা অন্য কোনো কাজ না পেয়ে রিকশাচালক হচ্ছে- এ খবরে উল্লসিত হব কেন?

যথার্থ উন্নতি হচ্ছে বুঝতাম, যদি দেখতাম শহর থেকে রিকশা উঠে গেছে, মিনিটে মিনিটে পাওয়া যাচ্ছে বাস এবং এককালে যারা রিকশা চালাত তাদের বিকল্প ও মানবিক কর্মের সংস্থান হয়ে গেছে। চমৎকার!

তা তো হবে না। তা তো হওয়ার নয়। সংগ্রাম চলছে। চলবে। তা, চলতে থাকুক সংগ্রাম, কিন্তু ইতোমধ্যে মানুষ বসবাস করছে কোথায়? কোথায় তারা থাকে? থাকবে? বাংলা ভাষায় আমরা ঘর ও বাড়ির মধ্যে তেমন একটা তফাত করি না। যা ঘর তা-ই বাড়ি। অনেকটা ঘর নিয়ে একটা বাড়ি- এমন একটা সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারি হয়তো কিন্তু তা ঠিক দাঁড়িয়ে থাকে না। ঘরবাড়ি ও বাড়িঘর একাকার হয়ে যায়। ঘরের বদলে বাড়ি এবং বাড়ির বদলে ঘর ব্যবহার করা যায় খুব সহজে। বাড়িওয়ালাকে কিছুতেই ঘরওয়ালা বলা যাবে না। ভয়ে। পাছে উচ্ছেদ করে দেয়। এর বাইরে ঘরই বাড়ি হয়ে যাবে। মেয়েরা স্বামীর ঘর করে, বাড়ি করে না। মানুষের ঘরই পোড়ে, বাড়ি পোড়ে না। বাড়িটা অস্পষ্ট হতে পারে, ঘরটা খুবই নির্দিষ্ট।

‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’ শেখ মুজিব বলেছিলেন একাত্তরে। বাড়িতে বাড়িতে দুর্গ গড়ার কথা বলেননি। বললে কথাটার তেমন জোর থাকত না, কথাটা যেন বাস্তবসম্মতও হতো না। না, ঘর হলেই চলে, চলে যায়, বাড়ির দরকার নেই। আমরা ঘর বাঁধতে চাই, ঘর ভাঙাকে ভীষণ ডরাই, ঘর পুড়ে গেলে সর্বস্বান্ত হয়ে পথে এসে দাঁড়াই। ঘরই বাড়ি আমাদের জন্য, কোনোমতে একটা ঘর হলেই বেঁচে যাই। তার চেয়ে বড় কিছু দরকার নেই। আমরা লোভী নই। আমরা বড়ই সংযমী জাতি।

কী অসম্ভব সামান্য আমাদের বাসগৃহগুলো। টিন দিয়ে বানিয়েছে যারা, তারা মহা সৌভাগ্যবান। লাখ লাখ মানুষ হোগলাপাতা, মুলিবাঁশ, নারকেলের ডাল- এসব দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকে। অনেকের তা-ও নেই। খোলা আকাশের নিচে প্রকাশ্য বসবাস। একে কি স্বাধীনতা বলে? ওই স্বাধীনতা উপলক্ষে বহু মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে এ দেশের। সাতচল্লিশে একবার, একাত্তরে একবার। ভয়াবহ ছিল সেই দুটি ঘটনা। কিন্তু মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া তো কেবল ওই বিশেষ দুটি সময়ের ঘটনা নয়, প্রতিনিয়ত উদ্বাস্তু হচ্ছে মানুষ। প্রতিদিন। গ্রাম থেকে শহরে আসছে কচুরিপানার মতো ভাসতে ভাসতে। কচুরিপানারও একটা সৌন্দর্য আছে, মানুষের এই অন্তহীন শোভাযাত্রায় সেই সৌন্দর্যটুকুও নেই। কোথায় যায় এত মানুষ? কোথায় থাকে? ঘরবাড়ি আছে কি? জিজ্ঞেস করার লোক নেই। উত্তর দেওয়ার লোক আরো কম। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান বলছে, প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিজ নিজ গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকবে। অত্যন্ত সুন্দর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু আছে কি? নিরাপত্তা পরে হবে, গৃহ আছে কি? সুন্দর, অসুন্দর, সুশ্রী, কুশ্রী, সংস্কৃতিবান, সংস্কৃতিহীন, যা-ই হোক ঠাঁই আছে কি মাথা গোঁজার? মূল প্রশ্ন তো সেটাই।

সংবিধান বলছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধির সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়। অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা’ তালিকায় আরও বিষয় আছে সেগুলো থাক, প্রাথমিক প্রয়োজনগুলো মিটেছে কি? রাষ্ট্রের যাত্রা সমাজতন্ত্রাভিমুখী হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। আমরা জানি, আমরা এখন পুঁজিবাদী। কিন্তু এমনকি ঘোরতর পুঁজিবাদী দেশও তো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য অনেক রকম পদক্ষেপ নেয়। আমাদের এখানে নেওয়া হচ্ছে কি? অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা সবই প্রয়োজন, কিন্তু বাসস্থানও তো প্রয়োজন মানুষের। সে মানুষ তো মানুষ নয়, যার কোনো আশ্রয় নেই। মানুষ পাখি হতে চায় ঠিকই, কিন্তু পাখি তো মানুষ নয়। ছিল না, হবে না কখনো। না, ঘর নেই মানুষের। ভূমিহীনের নেই, ভিক্ষুকের নেই, রোজগেরে বালকদের নেই। এমন কি সেই সরকারি কর্মচারীটিরও নেই- আগামীকাল যিনি অবসর নেবেন চাকরি থেকে। অবসর তাঁকে ব্যস্ত করবে। এমন ব্যস্ত, যা তিনি কর্মজীবনে কোনো দিন ছিলেন না। আগামীকাল অস্থির, বিপন্ন, দিগ্ভ্রান্ত হবেন তিনি, ঘরের অভাবে। ঘরের খোঁজে।

 গাড়িকেউ কেউ করেছে। ঘর নয়, বাড়িই করেছে বড় বড়। এক পুরুষের বাড়িঘর সেসব। সাতচল্লিশের আগে এই ঢাকা শহরে কারোই উল্লেখযোগ্য বাড়িঘর ছিল না। মা-বাবা গ্রামে থাকতেন, বড়জোর টিনের ঘরে। সাতচল্লিশের পর বাড়ি হলো কারও কারও। কারও কারও একাত্তরের পরে। সে-ও এক পুরুষের কারবার। আগের পুরুষের খোঁজ করুন, খবর পাবেন না। এসি দূরের কথা, টেলিফোনই দেখেনি আগের পুরুষ। বলা বাহুল্য এসব বাড়িঘর ইট দিয়ে যতটা গড়া নয়, প্রতারণা দিয়ে গড়া তার চেয়ে বেশি। পরিশ্রমের জোরে ধনী হবে- এ যদি সম্ভব হতো বাংলাদেশে তাহলে এখানে ধনীর সংখ্যা হতো কয়েক কোটি। আর যদি উত্তরাধিকার ধনী হওয়ার পথ হতো, তাহলে এ দেশে ধনী খুঁজে পাওয়া ভার হতো।

স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষকে কিছু সুযোগ অবশ্যই এনে দিয়েছে। যেমন বিদেশে যাওয়া। আগে এমন সুযোগ ছিল না। বড়জোর করাচি-লাহোর-পিন্ডি যেত কেউ কেউ। এখন যাচ্ছে লন্ডন, ওয়াশিংটনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। হাজার হাজার মানুষ পৃথিবীর যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু যেখানেই যাক, কেবল যে পাসপোর্ট নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে তা নয়, গৃহের স্বপ্ন ও স্মৃতিও নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে করে। ঘড়বাড়ি থাকে সঙ্গেই; বহন করে চলে শামুকের মতো পিঠে না হলেও ক্যাঙারুর মতো বুকের ভিতর বটে। বিদেশের উপার্জন দিয়ে দেশে একটি ঘর তৈরি করব- এই থাকে স্বপ্ন। করেও। ওভাবেই বেশ কিছু বাড়িঘর তৈরি হচ্ছে। বাড়ি না থাকার স্মৃতিটা থাকে, একেবারে অনিবার্যভাবে। তাড়া করে। স্মৃতিই স্বপ্নকে প্রবল করে। এ তো খুবই সত্য কথা যে গৃহহীনরাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গৃহী। কেননা তারা ঘর খোঁজে এবং ঘর নেই যেহেতু, তাই দুয়ার দিয়ে শোয়। বিদেশিরা আমাদের মিসকিন বলে, ঘৃণা করে, সর্বনিম্ন বেতন দেয় কিন্তু আমরা পড়ে থাকি সেখানেই। পাসপোর্ট হয়তো ভুয়া কারও, কারও ভিসা হয়তো ঠিক নেই। ভয়ে ভয়ে থাকি কখন না জানি তাড়িয়ে দেয়। তাড়িয়ে দিলেই সর্বনাশ। আমাদের ঘর নেই। আমরা ঘর করব কী দিয়ে? বিদেশিরা জানে, আমাদের ঘরের খবর। তাই বেতন দেয় সবচেয়ে কম। পরিশ্রম করিয়ে নেয় সবচেয়ে বেশি। জানে, যা-ই দিক আমরা রাজি হয়ে যাব। যে মুসলিম উম্মাহর সদস্য আমরা, তারাও মুসলমান ভাই বলে এতটুকু খাতির করে না। বিধর্মী আমেরিকানদের বেতন দেয় সর্বোচ্চ, স্বধর্মী বাংলাদেশিদের দেয় সর্বনিম্ন। দেশে যদি ঘর থাকত তাহলে ওই দশা হতো না। আমরা দর-কষাকষি করতাম। বলতাম, ‘না, পোষাবে না, মাফ করবেন, অন্য লোক দেখুন।’ আমরা পারি না। বিদেশে পারি না, দেশেও পারি না। যুগ যুগ ধরে আমরা নিরাশ্রয়ী গৃহী। আউলবাউলরা ওই পথে গেছেন বুঝি ঘর পাননি বলেই। অনেকেই আধ্যাত্মিক হয়েছেন সংসার থেকে পলায়নের অভিপ্রায়ে। ঘর নেই, সংসার করেন কী করে? এখনো সেই গৃহহীন দশাই আমাদের। আমাদের কে মর্যাদা দেবে? অথচ বিদেশিরা যখন আসে এ দেশে-কোথায় রাখব তাদের, ভেবে পাই না। কেননা তারা আশ্রয়দাতা, আমরা নিরাশ্রয়।

সামগ্রিকভাবে বঙ্গভূমি আগেও পশ্চাদপদই ছিল। পূর্ববঙ্গ ছিল জঙ্গলের ভিতরে জঙ্গল। বঙ্গ গেছে, পূর্ব পাকিস্তান গেল, বাংলাদেশ হয়েছে, বদল হয়েছে রাষ্ট্রের; কিন্তু মানুষ এখনো এখানে তার ঘর খুঁজে পায়নি। বাঙালি মুসলমান আগে বাঙালি, না আগে মুসলমান- এই বিতর্ক একসময় ছিল আজও যে নেই তা-ও নয়। আজ সে বাঙালিই হতে চায়, নাগরিকত্বে বাংলাদেশি। কিন্তু তার যে ঘর নেই তার কী হবে? একসময় সরকারি উদ্যোগে কেবল তার কর্মচারীদের জন্য হলেও কিছু আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হয়েছিল। আজ সেই উদ্যোগটিও সেভাবে নেই। গৃহনির্মাণ ঋণদান সংস্থা ঋণ দেয় অল্প কয়েকজনকে। তা-ও বন্ধ করে দেয় মাঝেমধ্যেই। সমবেত উদ্যোগ ছাড়া ঘর হবে না। ঘর ব্যক্তির, কিন্তু বাঁধতে হবে অপরের সাহায্যে, নইলে নয়। কিন্তু সমবেত উদ্যোগের ঐতিহ্য তো আমাদের নেই। একসঙ্গে কাজ করা অসম্ভব। সমবায় সমিতিগুলো অনেক দিন ধরেই আছে। তবে নামেই প্রধানত শুধু, কাজে নেই। ব্যক্তি বিনিয়োগ করতে যে চায় না তা নয়, খুবই চায়। কিন্তু কোথায় বিনিয়োগ করবে খুঁজে পায় না। সমাজ সাহায্য করে না, রাষ্ট্র যে এগিয়ে আসবে তা আসে না। উল্টো বরং বাধা দেয়। শিল্পে বিনিয়োগ বিপজ্জনক, দোকানপাটেই তাই টাকা খাটে। কিন্তু কয়টা আর দোকান চলবে? কিনবে কে? সন্তানসন্ততিতে বিনিয়োগ করে লোকে। আর করে বাড়িতে। বাড়ি তৈরির আগ্রহ খুবই প্রবল। কিন্তু ওই তো সমস্যা। তৈরি থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ পর্যন্ত কোনো পর্যায়েই সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। অন্তরায় পাওয়া যায় বরং পদে পদে। ফলে ঘরের সমস্যা মেটে না কিছুতেই। 

প্রয়োজন গৃহায়নের ব্যাপক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। গ্রামের মানুষ যাতে উচ্ছেদ হয়ে শহরে এসে ভাসমান জনগোষ্ঠীতে পরিণত না হয়, সেটা দেখা দরকার। গ্রামে থেকেই যাতে তারা শহরের সুযোগসুবিধা পায়, বিশেষভাবে পায় উপার্জনের পথ- সেদিকটায় দৃষ্টি দেওয়া অত্যাবশ্যক। সেই সঙ্গে গ্রামীণ গৃহায়নের কর্মসূচি নেওয়া চাই। অনুরূপভাবে শহরের মানুষের জন্যও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। লোকে যাতে থাকার জায়গা পায় এবং থাকার জায়গা যাতে ঝুপড়ি না হয়ে ঘর হয়। রাষ্ট্র এমনি এমনি এ কাজ করবে না। চাপ দিতে হবে। সেই চাপ রাজনৈতিক চাপ। নইলে ভবিষ্যৎ কী? উন্নতি তো দূরের কথা।

আশার বিষয় যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য, সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটে সবার জন্য উন্নয়ন ও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।  এর মধ্যে কি মানুষের ন্যূনতম বাসস্থানের প্রশ্নটি আসবে না? পায়ের নিচে এক টুকরো নিজস্ব মাটি, মাথার ওপর নিরাপত্তার ছাউনি মানুষের মৌলিক অধিকার। নতুন বাজেটে সরকার নিশ্চয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখেছে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে

আহসান হাবিব বরুন
সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্রের সীমান্ত একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, কিন্তু মানুষের মর্যাদা তারও ঊর্ধ্বে। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং কূটনৈতিক রীতিনীতি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশ ইন’ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি, মানবাধিকার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে সীমান্ত সংকট নতুন নয়। ভারতের তরফে সীমান্ত হত্যা, গুলি, আটক, নির্যাতন এবং বিভিন্ন সময়ে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কের একটি অস্বস্তিকর অধ্যায় হয়ে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পুশ ইন বিতর্ক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ এখানে শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, সরাসরি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠ। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)-এর ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব মানুষ মর্যাদা ও অধিকারে সমান। ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে খামখেয়ালি গ্রেপ্তার, আটক বা নির্বাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তি (ICCPR)-এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করতে হলে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

আবার আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি নন-রিফাউলমেন্ট (Non-Refoulement) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া যায় না, যেখানে তার নিরাপত্তা, অধিকার বা আইনগত অবস্থান মারাত্মকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তার সমাধান হতে হবে যৌথ যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; সীমান্তে একতরফাভাবে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে নয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বর্তমান অবস্থানকে আরো বিব্রতকর করে তুলেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সমালোচনা শুধু বাংলাদেশ থেকে আসছে না; ভারতের ভেতর থেকেও আসছে। পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন Association for Protection of Democratic Rights (APDR) প্রকাশ্যে বিএসএফের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে এবং একে মানবাধিকারবিরোধী ও অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেছে। সংগঠনটি ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের আলোকে প্রশ্ন তুলেছে—যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কীভাবে কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়?

এই সমালোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমি মনে করি। কারণ অভিযোগগুলো কোনো বিদেশি সরকার বা ভারতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে আসেনি; এসেছে ভারতের নিজস্ব নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোর কাছ থেকে। ফলে এটি আর কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।

এদিকে ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু সীমান্তে যদি এমন আচরণের অভিযোগ ওঠে, যা সেই মূল্যবোধের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—ভারত কি তার ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে বাস্তব আচরণের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারছে?

এখানে ভারতের নীতিনির্ধারকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপলব্ধি করা জরুরি। বাংলাদেশ এখন আর নব্বই দশক কিংবা একবিংশ শতাব্দীর শুরুর সেই বাংলাদেশ নয়, যাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে দুর্বল অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। গত দুই দশকে অর্থনীতি, অবকাঠামো, মানবসম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে বঙ্গোপসাগর শুধু একটি জলরাশি নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস, সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং নৌ-বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। ফলে ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে পুরোনো মানসিকতা বা একতরফা প্রভাব বিস্তারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালনার চেষ্টা করে তবে তা কৌশলগতভাবে কখনোই ফলপ্রসূ হবে না।

ভারতের উপলব্ধি করে জরুরি যে,প্রতিবেশী সম্পর্ক কখনো আধিপত্যের ভিত্তিতে টিকে থাকে না। ইতিহাস বলে, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং সমতা। সুতরাং ভারত যদি সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীল নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক নীতিগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির আরেকটি দিক দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সীমান্তে ভারতের অস্বাভাবিক তৎপরতা এমন এক সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে, যখন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে।

সময়গত এই মিলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে। যদিও কোনো কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করা কঠিন, তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের অধিকার সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপার।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত প্রয়োজন বিবেচনা করেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করবে। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সমার্থক নয়। আধুনিক কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব।

যদি ভারতে সত্যিই বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে কোনো অসন্তোষ থেকে থাকে, তাহলে তা বাস্তবতার সঙ্গে মোটেও  সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের অংশ নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল এবং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন রাষ্ট্র। তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হবে ঢাকার জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে; অন্য কোনো রাজধানীর প্রত্যাশার ভিত্তিতে নয়।

এখানে আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতার কথাও উপেক্ষা করা যায় না। বিগত সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকার নীতিগত অবস্থান নিয়ে দেশের ভেতরে বিস্তর বিতর্ক ছিল। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, তৎকালীন সরকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন এক নীতি অনুসরণ করেছিল, যেখানে পারস্পরিকতার তুলনায় একতরফা ছাড় ও সুবিধা প্রদানের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান ছিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সেই বাস্তবতার পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অধিক ভারসাম্য ও বহুমাত্রিকতার প্রত্যাশা ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক মহলে অস্বস্তির কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে—এটাই একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পথ।

এখানে আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্যও সীমান্ত পরিস্থিতি একটি নির্মম শিক্ষা। তাই শুধু প্রতিরোধ করলেই হবে না; আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার কাউন্সিল, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে তথ্য-প্রমাণসহ বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। সীমান্তে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ নথিভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবেগ নয়, তথ্যই শক্তি। অভিযোগ নয়, প্রমাণই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। আর নীরবতা কখনো মর্যাদা রক্ষা করে না; বরং অনেক সময় অন্যায়কে উৎসাহিত করে।

বাংলাদেশ সংঘাত চায় না, উত্তেজনাও চায় না। বাংলাদেশ চায় একটি মর্যাদাপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ কখনো নীরব আনুগত্য নয়। বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

আজকের বাস্তবতায় ভারতের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনুধাবন করা। কারণ ইতিহাসের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো—যে রাষ্ট্র সময়মতো পরিবর্তনকে বুঝতে ব্যর্থ হয়, শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রই কৌশলগত ক্ষতির মুখোমুখি হয়।


পরিশেষে বলা যায়, পুশ ইন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল সীমান্তের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে শক্তির প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সম্মানের প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের করণীয়ও স্পষ্ট। সীমান্তে সতর্কতা ও প্রতিরোধ যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও সক্রিয়, সুসংগঠিত এবং তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা শুধু তার ভূখণ্ড রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দৃঢ় ও সাহসী অবস্থান গ্রহণের মধ্যেও নিহিত। সুতরাং পুশ ইনের বিরুদ্ধে শুধু প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে; এবং সেই প্রতিবাদ হতে হবে যুক্তি, প্রমাণ, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও জাতীয় আত্মমর্যাদার দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অতএব যেকোনো মূল্যে সীমান্ত সংকটের সুষ্ঠু সমাধান করতেই হবে। 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected] 
 

স্বপ্নের বাজেট, বাস্তবের দুঃস্বপ্ন : বাস্তবায়নের ব্যর্থতায় ডুবছে জাতির প্রত্যাশা

মৌসুমী ইসলাম
স্বপ্নের বাজেট, বাস্তবের দুঃস্বপ্ন : বাস্তবায়নের ব্যর্থতায় ডুবছে জাতির প্রত্যাশা
সংগৃহীত ছবি

প্রতি বছর সংসদে বাজেট পেশের দিনটি আসে বিশাল প্রতিশ্রুতি আর উচ্চাভিলাষী সংখ্যার ভার নিয়ে। কিন্তু অর্থবছর শেষে যখন হিসাব মেলানো হয়, তখন দেখা যায়, বরাদ্দের বিশাল অংশ কাগজেই রয়ে গেছে, মাঠে পৌঁছায়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও এই পুরনো রোগ থেকে মুক্ত নয়। একজন উদ্যোক্তা, শিল্পনেতা ও নারী উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না—বাস্তবায়নের সংস্কৃতি বদলাতে হবে।

বাজেটের চ্যালেঞ্জ : যে বাধা পেরোনো যাচ্ছে না এবারের বাজেটে সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বিপুল অংকে, কিন্তু রাজস্ব আহরণের বাস্তবতা সেই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ধারাবাহিক ব্যর্থতা, কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অনুপস্থিতি এবং সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক দুষ্টচক্র।

•    রাজস্ব ঘাটতি : প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০-৩০% কম রাজস্ব আদায় হচ্ছে, যা বাজেটের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করছে।
•    ব্যাংকিং খাতের সংকট : খেলাপি ঋণের পাহাড় বাড়তেই থাকছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না, আর বৃহৎ ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
•    মুদ্রাস্ফীতির চাপ : সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশছোঁয়া, অথচ বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর কাঠামো নেই।
•    বৈদেশিক মুদ্রার সংকট : রিজার্ভ সংকট এখনও কাটেনি, আমদানি নির্ভরতা কমানোর কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়।

বাজেটের ফাঁকফোকর : যেখানে হারিয়ে যায় টাকা বাজেট বক্তৃতায় সুন্দর কথা, আর বাস্তব মাঠে পরিস্থিতি — এই দুয়ের মধ্যে যে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কোনো গোপন তথ্য নয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) মাত্র ৫০-৬০% বাস্তবায়িত হয় প্রতি বছর। খাত    বরাদ্দ  (প্রতিশ্রুতি)   বাস্তবতা (সমস্যা) স্বাস্থ্য খাত   GDP-র ১% এরও কম  বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় লাগামহীন ব্যয়।  শিক্ষা খাত    GDP-র ২% এর কাছাকাছি   মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নারী উন্নয়ন  নামমাত্র বরাদ্দ। তৃণমূল নারী উদ্যোক্তারা বঞ্চিতই থাকছেন।  চিকিৎসা যন্ত্রপাতি  আমদানি নির্ভরতা অব্যাহত। দেশীয় উৎপাদনে কোনো প্রণোদনা নেই।  এসএমই খাত ঋণ সহজলভ্যতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে জামানত সংকটে আটকে থাকছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। 

প্রভাব : কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি?বাজেটের দুর্বল বাস্তবায়নের মাশুল দিতে হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের — বিশেষত তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। নারী উদ্যোক্তাদের উপর প্রভাব AGWEB-এর মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি — তৃণমূল নারী উদ্যোক্তারা এখনও ব্যাংক ঋণ, প্রশিক্ষণ সুবিধা ও বাজার সংযোগ থেকে বঞ্চিত। বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক তহবিল ও নীতি সহায়তার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা তাদের কাছে পৌঁছায় না। মধ্যবর্তী স্তরের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতায় এই সুযোগগুলো হারিয়ে যায়।

চিকিৎসা যন্ত্রপাতি শিল্পে প্রভাব MEDMEB-এর একজন নেতৃত্ব হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি যে, বাংলাদেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বাজেটে কার্যকর প্রণোদনা নেই। আমদানি শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সাজানো যে দেশীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

শিল্প ও বাণিজ্যে প্রভাব PROMIXCO Group-এর মতো বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আজ যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, তা হলো — গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্থির মূল্য, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং নীতি অনিশ্চয়তা। বাজেটে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই।

দুর্বল বাস্তবায়ন: সংখ্যায় যখন বলা হয় গল্প বাজেট বাস্তবায়নের হার নিয়ে তথ্য-উপাত্ত বলছে এক বেদনাদায়ক সত্য। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ বছরের শেষ তিন মাসে ব্যয় হওয়া 'জুন মাসের উন্মাদনা' এখন যেন একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে — শুধু বাস্তবায়নের তাড়নায় টাকা ঢালা হয়, প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত না করেই।

•    ADP বাস্তবায়ন হার গড়ে মাত্র ৫৫-৬৫% — প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত ফেরত যায়।
•    সরকারি প্রকল্পে মেয়াদ বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে — জবাবদিহির কোনো কাঠামো নেই।
•    সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর টাকা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানোর হার উদ্বেগজনকভাবে কম — তালিকায় ভুয়া নাম ও দুর্নীতি এখনও বড় সমস্যা।
•    ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ হয়, কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেবার বাইরেই থাকে।

আমাদের দাবি ও সুপারিশ :

শুধু সমালোচনায় দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, সুনির্দিষ্ট সংস্কার পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব:

•    নারী উদ্যোক্তা তহবিল : তৃণমূল নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতমুক্ত ঋণ ও ডিজিটাল বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
•    দেশীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদন : আমদানি শুল্ক পুনর্বিন্যাস করে দেশীয় উৎপাদনকারীদের প্রণোদনা দিতে হবে।
•    ADP বাস্তবায়নে জবাবদিহি : প্রকল্প পরিচালকদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে বাস্তবায়ন হারকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
•    এসএমই সংস্কার: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য একক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (Single Window) তৈরি করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে।
•    সামাজিক নিরাপত্তা সংস্কার : ডিজিটাল পদ্ধতিতে সুবিধাভোগী যাচাই ও সরাসরি নগদ হস্তান্তর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

বাজেট নয়, বাস্তবায়নই হোক প্রতিশ্রুতি :

বাজেট একটি দলিল, বাস্তবায়ন একটি সংস্কৃতি। যতদিন না আমরা এই সংস্কৃতি বদলাতে পারব — যতদিন না প্রতিটি টাকার হিসাব প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত হবে — ততদিন লক্ষ কোটি টাকার বাজেটও শুধু কাগজের স্বপ্নই থাকবে। আমাদের দেশের নারী উদ্যোক্তারা, প্রান্তিক মানুষেরা, তরুণ উদ্যোক্তারা — তারা ভালো বক্তৃতা চান না, তারা চান কর্মসংস্থান, ঋণ, বাজার আর মর্যাদা। সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ — বাজেট ঘোষণা নয়, বাজেট বাস্তবায়নকেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে নিন।

লেখক : সভাপতি, AGWEB ও MEDMEB এবং চেয়ারপারসন PROMIXCO Group। 

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আমরা ৪ বছর ধরে লাল তালিকাভুক্ত : ড. জাহাঙ্গীর আলম

অনলাইন ডেস্ক
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আমরা ৪ বছর ধরে লাল তালিকাভুক্ত : ড. জাহাঙ্গীর আলম
ছবি: কালের কণ্ঠ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ নিয়ে কালের কণ্ঠ মাল্টিমিডিয়ার নিয়মিত আয়োজন দ্য বিজনেস রিভিউ শোতে কথা বলেছেন একুশে প্রদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম।

ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কন্ট্রাকশন পলিসির সঙ্গে ফিসকাল পলিসির একটা সম্পর্ক আছে। ফিসকাল পলিসি যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয় তাহলে শুধু কন্ট্রাক্ট শ্রেণি মনিটরি পলিসি দিয়ে দ্রব্যমূল্যকে স্বাভাবিক করা সম্ভব না। ইনফ্লেশনটা কমিয়ে আনা ডিফিকাল্ট। কারণ একদিকে আপনি সুদের হার বাড়িয়েছেন, বাড়িয়ে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন ব্যাংকের খাতে। আরেক দিকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি আপনি ব্যাংকের সিস্টেম থেকে নিয়ে গেছেন এবং বাজারে ছেড়েছেন। তো এই যখন হয় তখন উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নির্বাপিত করা এটা খুব ডিফিকাল্ট হয়ে পড়ে। সবচাইতে বড় জিনিস হলো খাদ্য মূল্যস্ফীতি।’

এবারও কিন্তু খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৯.০৬ শতাংশ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত মাসেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এখন খাদ্যমূল্যস্ফীতি গত চার বছর ধরে আমরা খুব উচ্চ পর্যায়ে দেখছি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আমরা লাল তালিকাভুক্ত গত চার বছর ধরে। তো এমন একটা পরিস্থিতিতে উৎপাদন না বাড়িয়ে আপনি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে নামিয়ে আনা এটা ডিফিকাল্ট। এখন গত বছর ২০২৪-২৫ সময়ে আমাদের যেই প্রবৃদ্ধি কৃষি খাতে সেটা ছিল ২.৪২ শতাংশ।

এই বছর যে প্রবৃদ্ধি ধারণা করা হচ্ছে এটা প্রাথমিকভাবে যেটা প্রকাশ করা হয়েছে আজকে আমি দেখলাম এটা ২.৭২ শতাংশ। এর মানে গত ৫৪ বছর ধরে আমরা যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি ৩ শতাংশ বা তার চাইতে ওপরে গড়ে লং টার্ম ট্রেন যেটা সেটা খুব কম এবং উৎপাদন যখন স্বাভাবিকভাবে প্রবৃত্তি অর্জন করা না হয় তখন বাজারে স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহ কমে এবং সরবরাহ যখন কমে তখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে। খাদ্যের ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত খুব জটিল। কারণ এটা শুধু আপনার যে উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কম সেটা না।’

একুশে প্রদকপ্রাপ্ত এই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাজার ব্যবস্থাকে কিন্তু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। সরকারের নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাটা নাই। বাজার ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণভাবে আমাদের ব্যবসায়ী যারা আছেন তাদের হাতে। কারণটা বুঝতে হবে, সেটা হলো সরকার যে ইন্টারভিন করে, কি দিয়ে ইন্টারভিন করে? আমার মাত্র ২০ থেকে ২২ লাখ টন চাল থাকে গম থাকে এর বেশি না, সরকারের এর বেশি ক্যাপাসিটিও নাই। কিন্তু প্রাইভেট সেক্টরে সেটা এক কোটি টনেরও বেশি খাদ্যশস্য মজুদ থাকে, সুযোগ তাদের বেশি। কাজেই প্রাইভেট সেক্টরে যখন যেভাবে বাজারটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তারা সেটা করতে পারে। সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারত যদি তাদের হাতে আরো বেশি আপনার ইন্টারভিন করার ক্ষমতা থাকত কিন্তু সরকারের হাতে এই ইন্টারভিন করার ক্ষমতা নাই।’

তিনি বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হলো যে আন্তর্জাতিক মূল্য। আন্তর্জাতিক মূল্য মাঝখানে কিছুটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু এখন এই আপনি যেটা বললেন, যে ইরান এবং ইউএস যেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে এটার কারণে আবার পণ্যমূল্য বেড়ে গেছে। সবচাইতে বড় জিনিস হলো—যে উপকরণ যেমন সার, রাসায়নিক সার, তেল এগুলোর দাম বেড়ে গেছে এবং এগুলোর দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে সারা বিশ্বের উৎপাদন ২ শতাংশ হ্রাস পাবে এটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই সব পণ্যের দাম কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাচ্ছে। তো বাংলাদেশেও এটার প্রভাব পড়েছে। এখন হলো গরুর মৌসুম। এই সময়ে চালের দাম তিন থেকে চার টাকা প্রতিকেজি বেড়ে গেছে।’