বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে নিয়ে কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিবেদনে বেনজীর আহমেদকে ঘিরে সিডনির একটি বৈঠক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরার পর, বেনজীরবিরোধী পোস্টকারী পরিবেশবাদী লেখিকা ড. নার্গিস বানুকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি পোস্ট, মন্তব্য ও অপপ্রচার শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রসঙ্গে পরিবেশবাদী লেখিকা ড. নার্গিস বানু দাবি করছেন, কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর তিনি তা জানতে পেরেছেন। তবে সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তাঁকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত অপপ্রচার শুরু হয়েছে।
তাঁর দাবি, সিডনিতে অবস্থানরত বেনজীরের দুর্নীতির সহযোগীদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর অবস্থান ও পোস্টের জের ধরেই চিহ্নিত দুষ্কৃতকারীরা, যারা অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে ব্যবসার নাম করে এতদিন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে নানা অপকর্মে লিপ্ত ছিল, সেই একই কুচক্রী মহল এখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তাদের মানি লন্ডারিংয়ের ব্যবসাসহ অপরাধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বর্তমান সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পা চাটতে দ্বিধা করছে না। তারাই তাঁর বিরুদ্ধে এখন মনগড়া প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ড. নার্গিস বানু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের পর বেনজীরের সহযোগীদের বিরুদ্ধে তাঁর দেওয়া পোস্টকে ঘিরে কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর তাঁকে উদ্দেশ্য করে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বেনজীর আহমেদের সহযোগী বলে যাঁদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা তাঁকে ঘিরে অপপ্রচার শুরু করেছে।’
তিনি বলেন, ‘দুটো কারণে ওরা আমার পেছনে লেগেছে। প্রথমত, সিডনিতে বসবাসরত বেনজীর আহমেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপকর্মের সহযোগী কিছু ব্যক্তি, যারা অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ব্যবসার আড়ালে প্রবাসে হুন্ডি ও অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত। আরেকটি গ্রুপ হলো জামায়াতের, যারা অস্ট্রেলিয়ায় এখনো গুপ্ত হিসেবে পরিচিত। তারা জিয়া পরিবারের ওপর আমার ভালোবাসাটা সহ্য করতে পারছে না। তাছাড়া কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি, যারা বিভিন্ন কারণে আমাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে ‘
তিনি আরো জানান, সিডনিতে বেনজীরের অপকর্মের সহযোগীদের মুখোশ উন্মোচনে সাধারণ প্রবাসীরা যখন সোচ্চার, তখন প্রবাসীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত মন্তব্য ঘিরে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বেনজীরের সহযোগীরা নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে তাঁকে আক্রমণ করে আওয়ামী লীগ বানানোর চেষ্টা করছে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁকে সাংবাদিক হিসেবে প্রেস পাস দেওয়া হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিএফআইয়ের কাছেও রিপোর্ট করা হয়েছিল।
নিজের একটি বহুল আলোচিত ছবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে ছবিগুলো প্রচার করা হচ্ছে, সেগুলো ‘গ্লোবাল সামিট অব উইমেন’ অনুষ্ঠানের। আমি সেখানে একজন সাংবাদিক হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বেসরকারি সংস্থার আয়োজন ছিল। আমি সেখানে গিয়েছিলাম ওই সংস্থার প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎকার নিতে এবং সেই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। এটি দুই দিনব্যাপী একটি অনুষ্ঠান ছিল। আমি পরদিন গণমাধ্যমবিষয়ক সেমিনারেও অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গেও আমার ছবি তোলা হয়েছিল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু একটি ছবি প্রচার করে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে ওই কুচক্রী মহলের সদস্যরা।
তিনি বলেন, ‘সিডনিতে বসবাসরত কিছু দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ রয়েছে। ওদের বিপক্ষে গেলেই যে কাউকে আওয়ামী লীগ বানায়, আবার নিজেদের স্বার্থে তারাই যে কাউকে বিএনপিও বানায়।’
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, বেনজীর আহমেদকে ঘিরে অতীতে সিডনিতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন প্রবাসীকে নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। আবার পাল্টা পোস্টে বলা হচ্ছে, কোনো সামাজিক বা পেশাগত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অর্থ রাজনৈতিক সমর্থন নয় এবং একটি স্থিরচিত্র দিয়ে কারো রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না।
সাম্প্রতিক একটি পোস্টে একজন প্রবাসী দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুটি ছবি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, একটি ছবিতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশিকে দেখা গেলেও, সেটি থেকে কারো রাজনৈতিক পরিচয় বা ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
একই পোস্টে তিনি আরো দাবি করেন, অপর একটি ছবিতে একজন পরিবেশবিদ, সাংবাদিক ও প্রবাসী ব্যক্তিত্বকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে দেখা যাওয়ায় তাঁকে নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে। তবে তাঁর মতে, একজন সাংবাদিক হিসেবে কোনো রাষ্ট্রীয় বা জনসমাগমের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বা ছবি তোলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক সমর্থনের প্রমাণ নয়। পোস্টে আরো দাবি করা হয়, শেখ হাসিনার অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় সিডনিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছিলেন এবং পোস্টদাতা নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে কমিউনিটি নেতা আবিদুর রহমান বলেন, ‘সমাজের কিছু লোক রয়েছে, যারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। নিজেদের ফায়দা হাসিল করতে অতীতে আওয়ামী লীগ ঘরানার কিছু প্রবাসী এখন বিএনপি সাজার চেষ্টা করছে। বিএনপির কিছু নেতা তাদের দলে টানার চেষ্টা করতে গিয়ে সাধারণ প্রবাসীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছেন।’ তাঁর মতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরোনো ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যা বিভ্রান্তিরও জন্ম দিচ্ছে। কোনো ছবি বা অনুষ্ঠানে উপস্থিতির ভিত্তিতে কারো রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য শিপন আহমদ বলেন, বেনজীর আহমেদকে ঘিরে যেসব অভিযোগ ও দুর্নীতির বিষয় এখন প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলো দেশ-বিদেশে আলোচনার বিষয়। আমার মতে, যারা এসব অপকর্মে সহযোগী ছিল, তারা বেনজীরের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবেদন বা আলোচনা প্রকাশিত হলেই অস্বস্তি বোধ করে। সিডনিতে অবস্থানরত এমন কিছু ব্যক্তি নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বা প্রশ্ন থেকে দৃষ্টি সরাতে সমাজের ভালো মানুষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করছে। অপরাধীর কোনো দল নেই, তারা সুবিধাবাদী। অস্ট্রেলিয়ার মতো আইনের শাসনের দেশে থেকেও যারা বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকতে চায়, তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে—এটাই কমিউনিটির অনেকের দাবি।
সব মিলিয়ে বেনজীর আহমেদকে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরলেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, ব্যাখ্যা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত পোস্টের কারণে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক আরো বেড়েছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন কমিউনিটি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গরা।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০২৪ সালে সিডনিতে তাঁর একটি বৈঠকের ছবি এবং তাঁকে ও তাঁর কথিত সহযোগীদের ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হওয়া আলোচনার প্রেক্ষাপটে গত ১৭ জুন কালের কণ্ঠে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে সিডনিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা, মন্তব্য ও পাল্টা মন্তব্য অব্যাহত থাকতে দেখা যাচ্ছে।




