হঠাৎ করেই নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করলে দৃশ্যটি যেমন অস্বস্তিকর, তেমনি অনেকের জন্য ভীতিকরও। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটলে অভিভাবকরা প্রায়ই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা ‘নোজব্লিড’ কোনো গুরুতর সমস্যা নয়। শুষ্ক আবহাওয়া, অ্যালার্জি, সর্দি-কাশি কিংবা নাক খোঁচানোর মতো সাধারণ কারণেই এটি হতে পারে। তবু কিছু ক্ষেত্রে বারবার নাক দিয়ে রক্ত পড়া শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো রোগেরও জানান দিতে পারে। তাই নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা প্রয়োজন।
ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিক নাকে রক্ত পড়ার কারণ নিয়ে এ প্রতিবেদন করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নাক দিয়ে রক্ত পড়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘এপিস্ট্যাক্সিস’ বলা হয়। নাকের ভেতরের আবরণী টিস্যুতে অসংখ্য ক্ষুদ্র রক্তনালি থাকে, যা শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাসকে উষ্ণ ও ভেজা রাখতে সাহায্য করে। এসব রক্তনালি খুবই সূক্ষ্ম এবং নাকের ভেতরের দিকে থাকায় সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে সামান্য আঘাত, ঘর্ষণ বা শুষ্কতার কারণেও রক্তপাত শুরু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৬ জন নাক দিয়ে রক্ত পড়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রক্তপাত অল্প সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় এবং বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
কেন হয় নাক দিয়ে রক্তপাত?
নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো শুষ্ক বাতাস। শুষ্ক আবহাওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকার ফলে নাকের ভেতরের আবরণী শুকিয়ে যায়। এতে টিস্যুতে ফাটল তৈরি হয় এবং রক্তনালিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর নাক ঝাড়া, ঘষা বা খোঁচানোর মতো সাধারণ কাজেও রক্তপাত শুরু হতে পারে।
এ ছাড়া সর্দি-কাশি, সাইনাসের সংক্রমণ, অ্যালার্জি, নাকে আঘাত লাগা, নাকের ভেতরে কোনো বস্তু ঢুকে যাওয়া কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে। যারা নিয়মিত অ্যাসপিরিন বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেয়ে থাকেন তাদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
কিছু বিরল ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা, লিউকেমিয়া, নাকের টিউমার বা পলিপের মতো রোগও বারবার নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ হতে পারে।
শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি
দুই থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে নাক দিয়ে রক্ত পড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। কারণ এ বয়সে শিশুরা প্রায়ই নাক খোঁচায় বা নাকে বিভিন্ন বস্তু ঢোকানোর চেষ্টা করে। অন্যদিকে ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ধমনির পরিবর্তন এবং রক্ত পাতলা করার ওষুধ ব্যবহারের কারণে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।
গর্ভাবস্থায়ও নাকের রক্তনালিতে চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক নারীর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে।
নাক দিয়ে রক্ত পড়লে যা করবেন
নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হলে প্রথম কাজ হলো আতঙ্কিত না হওয়া। অনেকেই ভুলবশত মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে দেন, যা ঠিক নয়। এতে রক্ত গলার ভেতর দিয়ে পেটে চলে যেতে পারে এবং বমি বমি ভাব তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, সোজা হয়ে বসে মাথা সামান্য সামনে ঝুঁকিয়ে রাখতে হবে। এরপর নাকের নরম অংশ দুই আঙুল দিয়ে চেপে ধরে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। এ সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এভাবে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
যদিও বেশির ভাগ নোজব্লিড গুরুতর নয়, তবুও কিছু লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়।
যদি ১৫ থেকে ২০ মিনিট চাপ দেওয়ার পরও রক্তপাত বন্ধ না হয়, যদি প্রচুর রক্ত বের হয়, যদি শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বা মাথায় আঘাত পাওয়ার পর রক্তপাত শুরু হয়, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
এ ছাড়া ঘন ঘন নাক দিয়ে রক্ত পড়া, শরীরে অস্বাভাবিক কালশিটে দাগ দেখা দেওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রতিরোধেই সমাধান
নাক দিয়ে রক্ত পড়া প্রতিরোধে কিছু সহজ অভ্যাস কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ঘরের বাতাস আর্দ্র রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং নাক খোঁচানোর অভ্যাস ত্যাগ করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও ধূমপান থেকে দূরে থাকা, অ্যালার্জির সঠিক চিকিৎসা নেওয়া এবং নাক ঝাড়ার সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার পরামর্শও দেন বিশেষজ্ঞরা।
নাক দিয়ে রক্ত পড়া সাধারণত আতঙ্কের বিষয় নয়। তবে এটি শরীরের একটি সতর্কবার্তাও হতে পারে। তাই একদিকে যেমন অযথা ভয় পাওয়ার কারণ নেই, অন্যদিকে বারবার বা অস্বাভাবিক রক্তপাতকে হালকাভাবে নেওয়াও ঠিক নয়। সমস্যাটি কেন হচ্ছে, তা বোঝা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।




