পাকার সঙ্গে সঙ্গে সবুজ খোসা ছেড়ে হলদে আভাধারণ করে নাক ফজলি আম। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে মিষ্টি সুবাস। নওগাঁর বদলগাছীর বাগান গুলোতে এখন উৎসবের আমেজ। গাছ থেকে নামছে জিআই স্বীকৃত নাক ফজলি আম। উপজেলার ডাকবাংলো মোড়ে অস্থায়ীভাবে বসেছে আমের বেচাকেনার কেন্দ্রও। তবে বাম্পার ফলনের আনন্দের মধ্যেও চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। নির্দিষ্ট বাজার না থাকায় ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা।
কৃষি বিভাগ বলছে, চলতি মৌসুমে বদলগাছীতে নাক ফজলি আম থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থা না থাকার কারণে এই সম্ভাবনার পুরো সুফল পাচ্ছেন না আম চাষীরা।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বদলগাছীর আটটি ইউনিয়নে কয়েক দশক ধরে নাক ফজলি আমের চাষ হয়ে আসছে। গত বছর এ আম ভৌগোলিকি নর্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশজুড়ে এর চাহিদা আরো বেড়েছে। স্বাদ, আকার ও দীর্ঘ দিন সংরক্ষণ যোগ্য হওয়ায় অন্যান্য আমের তুলনায় নাক ফজলির কদর বেশি। ফলে ধান ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি অনেক কৃষক এখন এই আম চাষে ঝুঁকছেন।
স্থানীয় চাষিদের বলছেন, এ বছর ফলন ভালো হলেও বাজারে আকার ভেদে প্রতিমণ নাক ফজলি আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় কম। তাঁদের অভিযোগ, বদলগাছী ছাড়া অন্য কোথাও উল্লেখযোগ্য পরিসরে এ আমের আবাদ নাহলেও উপজেলায় নেই কোনো স্থায়ী বাজার বা সংগ্রহ কেন্দ্র। ফলে মৌসুম এলেই বাগান থেকেই পাইকারদের কাছে আম বিক্রি করতে বাধ্য হনতাঁরা।
সদর ইউনিয়নের আম চাষি জুয়েল সরদার বলেন, ‘সারা বছর বাগানের পরিচর্যা করি। কিন্তু বিক্রির সময় পাইকাররা যে দাম বলেন, অনেক সময় সেই দামেই আম ছাড়তে হয়। বাজারে ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থাকলে আরও ভালো দাম পাওয়া যেত। কর্তৃপক্ষ যদি একটি নির্দিষ্ট বাজারের ব্যবস্থা করত, তাহলে আমরা উপকৃত হতাম।’
স্থানীয় আম ব্যবসায়ী মোস্তাকিম বলেন, ‘নাক ফজলি আমের চাহিদা দেশজুড়ে রয়েছে। কিন্তু ডাকবাংলো মোড়ের ছোট জায়গায় আম সংগ্রহ ও পরিবহন করা কষ্টকর। পাশেই বিস্তীর্ণ বালুচর রয়েছে। সেখানে মৌসুমি আমের বাজার গড়ে তোলা হলে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় আম পাঠানো সহজ হবে।’
কৃষি বিভাগ আরো জানায়, চলতি মৌসুমে বদলগাছী উপজেলায় মোট ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে নাক ফজলির আবাদ হয়েছে ২৫৫ হেক্টরে। উৎপাদন ও বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় এ আম থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
চাষি সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘বদলগাছীতে একটি স্থায়ী আমের বাজার গড়ে উঠলে দেশের বিভিন্ন এলাকার আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি এখানে আসতে পারবেন। এতে আমরা ন্যায্য মূল্য পাব, একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবাব ফারহান বলেন, ‘নাক ফজলি আমের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। স্থায়ী বাজার প্রতিষ্ঠার বিষয়েও কৃষকদের নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আম সংরক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি নিয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
চাষিদের দাবি, ‘জিআই স্বীকৃত নাক ফজলি আমের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট বাজার, সংগ্রহ কেন্দ্র ও সংরক্ষণ সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে উৎপাদন বাড়লেও লাভের বড় অংশ মধ্যস্বত্ব ভোগীদের হাতেই চলে যাবে।’