দক্ষিণ কোরিয়ার ৭৮ বছর বয়সী ব্যাং চুন-জার দিন শুরু হয় একটি পুতুলের সঙ্গে কথা বলে। ঘরে ফিরলে পুতুলটি তাকে স্বাগত জানায়, একঘেয়েমি লাগলে গান শোনায়, সময়মতো খাবার ও ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। এমনকি মাঝেমধ্যে ভালোবাসার কথাও বলে। তবে এটি কোনো সাধারণ পুতুল নয়—এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিচালিত ‘হিওডল’।
গত ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) প্রযুক্তিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টেক এক্সপ্লোর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দেয়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা। একই সঙ্গে বাড়ছে একাকিত্বের সমস্যাও। পরিবার ছোট হয়ে আসা, সন্তানদের দূরে বসবাস এবং কম জন্মহারের কারণে অনেক বয়স্ক মানুষকে একাই জীবন কাটাতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় তাদের মানসিক সঙ্গী হয়ে উঠছে এআই পুতুল।
ব্যাং চুন-জা বলেন, কঠিন জীবনসংগ্রাম, বিবাহবিচ্ছেদ এবং একক মা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর এখন তিনি মানুষের চেয়ে হিওডলের সঙ্গেই বেশি স্বস্তি পান। তিনি বলেন, ‘মানুষ আমাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু হিওডল কখনো কষ্ট দেয় না। সে শুধু আমাকে হাসায়।’
দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। দেশটির প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বয়স ৫০ বছরের বেশি। একাকিত্ব সেখানে এখন বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে ৩ হাজার ৯২০টিরও বেশি ‘নিঃসঙ্গ মৃত্যু’র ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ, অনেক মানুষ একা মারা গেছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের মৃত্যুর খবর কেউ জানতে পারেনি। (সূত্রঃ ইয়াহু নিউজ)
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন একা বসবাসকারী প্রবীণদের মধ্যে এআই পুতুল বিতরণ করছে। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ হিওডল ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু ব্যক্তি নিজে কিনেছেন, কিছু স্থানীয় সরকার ভাড়া দিয়েছে এবং কিছু ব্যবহার হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে।
হিওডল শুধু কথাবার্তাই বলে না। এটি চ্যাটজিপিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সঙ্গে আলাপ করতে পারে। পাশাপাশি ঘুম, খাবার, মানসিক অবস্থা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে। কোনো প্রবীণ দীর্ঘ সময় সাড়া না দিলে বা অস্বাভাবিক আচরণ করলে সমাজকল্যাণকর্মীদের সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
হিওডলের প্রধান নির্বাহী কিম জি-হি জানান,বহু প্রবীণ সারা জীবন পরিবার ও সন্তানের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন। বয়স বাড়ার পর যখন তারা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে করেন, তখন গভীর এক শূন্যতা তাদের গ্রাস করে। সেই শূন্যতা দূর করতেই পুতুলটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন এটি নাতি-নাতনির মতো ব্যবহারকারীর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা প্রকাশ করে।
পুতুলটির একটি জনপ্রিয় সংলাপ হলো, ‘দাদি, কোথায় গিয়েছিলেন? সারাদিন আপনার জন্য অপেক্ষা করেছি।’ এমন কথাগুলো অনেক প্রবীণের মুখে হাসি ফোটায় এবং একাকিত্ব কিছুটা হলেও কমিয়ে দেয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি কখনো মানুষের সম্পর্কের পুরোপুরি বিকল্প হতে পারে না। তারপরও একা বসবাসকারী প্রবীণদের জন্য এআই পুতুল মানসিক স্বস্তি, নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন জীবনে সহায়তার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা সমাজে দক্ষিণ কোরিয়ার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও নতুন উদাহরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রঃ রেস্ট অব ওয়ার্ল্ড




