যশোর সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের আমদাবাদ গ্রামে ‘জ্বীন সাপ’ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত তিন দিন ধরে এ আতঙ্ক চলছে। স্থানীয়দের দাবি, কথিত অদৃশ্য ‘জ্বীন সাপের’ কামড়ে প্রায় ৭০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু অসুস্থ হয়েছেন। তারা স্থানীয় ওঝার চিকিৎসা নিয়েছেন। অনেকের হাত-পায়ে সাপের কামড়ের মতো ক্ষতচিহ্নও দেখা যায়।
অদৃশ্য সাপের আতঙ্ক থেকে বাঁচতে গ্রামবাসী পানি পড়া ছিটিয়েছেন। ষষ্ঠীতলায় দুধ-কলা দিয়ে পূজাও দিয়েছেন। কিন্তু সোমবার (২৯ জুন) পর্যন্ত আতঙ্ক কমেনি। অসুস্থরা এখন সুস্থ আছেন বলে জানা যায়। তবে অনেক অভিভাবক ভয়ে শিশুদের বাড়ির বাইরে যেতে দিচ্ছেন না। অনেক শিশু বিদ্যালয়েও যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের দাবি, গত শুক্রবার পাপন ঘোষ (২১) নামে এক যুবকের মৃত্যুর পর থেকেই এ আতঙ্ক শুরু হয়।
সোমবার দুপুরে আমদাবাদ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামজুড়ে ‘জ্বীন সাপ’ নিয়ে আলোচনা চলছে। সবাই এ বিষয় নিয়েই কথা বলছেন।
পাপন ঘোষের মা কৃষ্ণা ঘোষ বলেন, “সকালে আমার ছেলের পেটব্যথা করছিল। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি। পরে এক ভাগ্নির পরামর্শে ওঝার কাছে যাই। ওঝা ‘হাত চালক’ দিয়ে বলেন, জ্বীন সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হয়েছে।”
পাপনের কাকা প্রকাশ ঘোষ বলেন, “রোববার দুপুরে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরি। তখন দেখি বাম হাতে চিনচিনে ব্যথা করছে। পরে ওঝার কাছে গেলে তিনি বলেন, আমাকে জ্বীন সাপ কামড় দিয়েছে। কিন্তু আমি কোনো সাপ দেখিনি। কখন কামড় দিয়েছে তাও বুঝতে পারিনি। ওঝা ঝাড়ফুঁক করার পর এখন একটু ভালো আছি।”
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়া ঘোষের বাবা দীপঙ্কর ঘোষ বলেন, “মেয়েকে জ্বীন সাপ কামড় দিয়েছে বলে শুনে বাড়ি যাই। গিয়ে দেখি তার পায়ে সাপের কামড়ের মতো দাগ। পরে ওঝার কাছে গেলে তিনিও একই কথা বলেন।”
রিয়া ঘোষ বলেন, “বাড়ির পাশের মন্দিরে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরে পায়ে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। পরে ওঝা বলেন, জ্বীন সাপ কামড় দিয়েছিল। তবে আমি কোনো সাপ দেখিনি। কখন কামড়েছে তাও বুঝতে পারিনি।”
স্থানীয়দের দাবি, রিয়া ও প্রকাশ ঘোষ ছাড়াও গত শনিবার, রবিবার ও সোমবার অজয়, শেফালি, নিত্যানন্দ, সোমেন, প্রতীক, সিধু, চম্পা, সোহাগী, মুন, সদানন্দ, মনিরসহ প্রায় ৭০ জন একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন।
এসব ব্যক্তির চিকিৎসা দেওয়া গ্রামের ওঝা সাধন কুমার ঘোষ বলেন, “রবিবারও প্রায় ৪০ জনকে চিকিৎসা দিয়েছি। আমার মতে, তারা জ্বীন সাপের কামড়ে আক্রান্ত।” কীভাবে বুঝলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “‘হাত চালক’ দিয়ে বিষয়টি বুঝতে পারি।”
সাপের আতঙ্ক থেকে রক্ষা পেতে গ্রামবাসী পানি পড়া ছিটিয়েছেন। ষষ্ঠীতলায় দুধ-কলা দিয়ে পূজাও দিয়েছেন। গ্রামের বাসিন্দা স্বরজিত বলেন, “প্রথমে ব্রাহ্মণের কাছ থেকে পানি পড়া এনে ঘরে ঘরে ছিটিয়েছি। মানুষের মাথায়ও দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, এরপর আর সাপের আক্রমণ হবে না। কিন্তু আতঙ্ক কমেনি। পরে সবাই মিলে ষষ্ঠীতলায় দুধ-কলা দিয়ে পূজা করেছি।”
দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মাসুদ রানা বলেন, “গত তিন দিনে প্রায় ৭০ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়েছি। এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক শিশু ভয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




