গ্যাস সংকটের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি উৎপাদন কমছে চালু থাকা কেন্দ্রগুলোতেও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০টির মধ্যে ইতোমধ্যে অন্তত ৯টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি অব্যাহত রয়েছে। তবু খুলনা-বরিশালসহ পদ্মার এপারের ২১ জেলার মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে উৎপাদিত ও আমদানি করা বিদ্যুতের একটি বড় অংশ জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ করা হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু হয়েও অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের।
নাগরিক নেতাদের দাবি, এটি শুধু উৎপাদন সংকট নয়, বরং বিদ্যুৎ বণ্টনে দীর্ঘদিনের বৈষম্যের আরেকটি উদাহরণ।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি (ওজোপাডিকো) সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস স্বল্পতার কারণে ৪১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভেড়ামারা নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার প্লান্ট কয়েকদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ১১৫ মেগাওয়াটের খুলনা কেপিসিএল, ২২৫ মেগাওয়াটের নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার প্লান্ট, ১০৫ মেগাওয়াটের রূপসা ওরিয়ন পাওয়ার প্লান্টসহ কয়েকটি কেন্দ্র উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
শুধু কেন্দ্র বন্ধই নয়, চালু থাকা বেশিরভাগ কেন্দ্রও তাদের সক্ষমতার অনেক নিচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
ওজোপাডিকোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বুধবার (১৭ জুন)-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৩৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার খুলনা পাওয়ার প্লান্ট উৎপাদন করেছে মাত্র ১০০ মেগাওয়াট; এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন করেছে ৫১০ মেগাওয়াট; ১৫০ মেগাওয়াটের পায়রা ইউনাইটেড পাওয়ার প্লান্ট থেকে এসেছে মাত্র ১৭ মেগাওয়াট; ১২০ মেগাওয়াটের বরিশাল সামিট পাওয়ার প্লান্ট উৎপাদন করেছে ১৬ মেগাওয়াট এবং ১০৫ মেগাওয়াটের গোপালগঞ্জের মধুমতি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন করেছে মাত্র ১৫ মেগাওয়াট।
প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, ওইদিন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কেন্দ্রগুলো থেকে মোট চার হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও ওজোপাডিকোর গ্রাহকদের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট। অবশিষ্ট দুই হাজার ১০৪ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নাগরিক সমাজের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের দাবি, উৎপাদন কেন্দ্রগুলো এই অঞ্চলে অবস্থিত হলেও এখানকার মানুষ পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় লোড ডেসপাস সেন্টার (এলডিসি)
বিদ্যুৎ বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি নাগরিক নেতাদের।
ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, খুলনা ও বরিশাল জোনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। দুই জোনে মোট চাহিদা ৬০০ থেকে ৭০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ঘাটতি থাকছে ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট। ফলে অনেক এলাকায় দিনে আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল এবং ভিআইপি ফিডারের বাইরে থাকা এলাকাগুলোতে লোডশেডিং বেশি।
এদিকে, বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কোল্ড স্টোরেজ, আইটি সেবা, হাসপাতাল এবং উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কার্যত অর্ধেক সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
ওজোপাডিকোর প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘ওজোপাডিকো কেবল বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান। এলডিসির মাধ্যমে পিডিবি থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তা-ই বিতরণ করা হয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হলে কিছু এলাকায় লোডশেডিং করতেই হয়। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামানের অভিযোগ, খুলনা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। এখানে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও তার বড় অংশ অন্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। ফলে স্থানীয় জনগণকে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
অন্যদিকে পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি অ্যাড. কুদরত-ই-খুদা বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘খুলনা সিটি করপোরেশনের সোনাডাঙ্গা সোলার পার্কটি অল্প ব্যয়ে সচল করা গেলে স্থানীয়ভাবে কিছু বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমবে।’




