• ই-পেপার

শতাব্দীর প্রাচীনতম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ

ইউছুফ (আ.)-এর জীবনের অবিস্বরণীয় কিছু শিক্ষা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইউছুফ (আ.)-এর জীবনের অবিস্বরণীয় কিছু শিক্ষা
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবনে পরিবারই হলো ভালোবাসা, নিরাপত্তা, পরিচয় ও মূল্যবোধের প্রথম বিদ্যালয়। একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন, নৈতিক বিকাশ এবং মানসিক প্রশান্তির মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবারকে কেন্দ্র করে। কিন্তু কখনো কখনো পারিবারিক সংকট, ঈর্ষা, বিচ্ছেদ, দারিদ্র্য কিংবা ভৌগোলিক স্থানান্তরের কারণে এই বন্ধন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফ শুধু একজন নবীর জীবনের ইতিহাস নয়; এটি একটি পরিবারের উত্থান-পতন, বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের জীবন্ত দলিল। 

ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনী শুরু হয় পরিবারের উষ্ণ পরিবেশে। একবার তিনি একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেন। তারপর তিনি নিজের স্বপ্ন অন্য কারও কাছে নয়, বরং প্রিয় পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর কাছেই ব্যক্ত করেন। ‘যখন ইউসুফ তাঁর পিতাকে বললেন, 'হে আমার পিতা!......।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪)

ইউছুফ (আ.) একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখা মাত্র পরিবারের স্বরণাপন্ন হন। কেননা সন্তানের প্রথম ভরসার স্থান হলো পরিবার। সে তার আনন্দ, দুঃখ, স্বপ্ন ও আশঙ্কা সবচেয়ে আগে পরিবারের কাছেই প্রকাশ করতে চায়। ইয়াকুব (আ.) শুধু স্বপ্নের ব্যাখ্যাই দেননি; একজন আদর্শ পিতার মতো সন্তানের নিরাপত্তার কথাও ভেবেছেন। তিনি উপদেশ দিয়ে বললেন, ‘হে আমার সন্তান! তোমার স্বপ্ন তোমার ভাইদের কাছে বলো না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫)
তাই যেকোনো বিষয়ে সন্তানের আবেগ, প্রতিভা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় সচেতন অভিভাবকের ভূমিকা অপরিসীম।

ঈর্ষা—পরিবার ভাঙনের সূচনা
যে পরিবার ভালোবাসার কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেই পরিবারেই যখন ঈর্ষা ও হিংসা স্থান করে নেয়, তখন সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইউসুফ (আ.)-এর ভায়েরা তাঁর এই সুন্দর স্বপ্নের কথা শোনে তাদের অন্তরে জন্ম নেওয়া ঈর্ষা তাদের এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়, যা পুরো পরিবারের জন্য দীর্ঘ বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোরআনের ভাষায় ‘ইউসুফকে হত্যা করো অথবা তাকে কোনো দূর দেশে ফেলে আসো।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯)

এটি শুধু ভাইদের ষড়যন্ত্র ছিল না; এটি ছিল পারিবারিক ঐক্যের ভয়াবহ ভাঙন। এখান থেকেই শুরু হয় ইউসুফ (আ.)-এর দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পথ। আজও অসংখ্য পরিবার হিংসা, অহংকার, সম্পদের লোভ কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে ভেঙে যাচ্ছে। সুরা ইউসুফ আমাদের শেখায়—পারিবারিক সংকটের সূচনা বাইরে থেকে নয়, অনেক সময় পরিবারের ভেতর থেকেই হয়।

সংকটের মাঝেও আল্লাহ নতুন পথ খুলে দেন
ভাইদের ষড়যন্ত্রে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর ইউসুফ (আ.) মিশরে বিক্রি হন। বাহ্যিকভাবে এটি ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। কিন্তু আল্লাহ সেই সংকটকেই তাঁর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার বানিয়ে দেন। নির্দেশ দেয়া হলো, ‘তাঁর থাকার ব্যবস্থা সম্মানজনকভাবে করো।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২১)

ধৈর্য—সংকট মোকাবিলার সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি
ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ধৈর্য। তিনি বললেন, ‘অতএব, উত্তম ধৈর্যই আমার অবলম্বন।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১৮)

বহু বছর ধরে সন্তানহারা থাকার পরও তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে, ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৭)
এই শিক্ষা আজও প্রতিটি ভেঙে পড়া পরিবারের জন্য আশার আলো। যত বড় সংকটই আসুক, আল্লাহর প্রতি আস্থা ও ধৈর্য পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকট ও পারিবারিক স্থানান্তর
দুর্ভিক্ষের সময় ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের খাদ্যের সন্ধানে বারবার মিশরে যেতে হয়েছিল। এখানে আমরা দেখি, মানুষের অভিবাসনের পেছনে শুধু রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণ নয়, জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ জীবিকার সন্ধানে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমায়। সুরা ইউসুফ সেই বাস্তবতার এক প্রাচীন কিন্তু চিরন্তন উদাহরণ।

দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত করেন। কোরআনের ভাষায়, ‘যখন তারা ইউসুফের কাছে প্রবেশ করল, তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন। (তারপর) তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে সম্মানের আসনে বসালেন।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৯-১০০)
ইউসুফ (আ.) প্রতিশোধ নেননি; বরং ক্ষমা করেছেন। আর তাঁর সেই ক্ষমা, উদারতা ও ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত ভেঙে যাওয়া পরিবারকে আবার একত্রিত করেছিল।

ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনী প্রতিটি পরিবারের জন্য এক অনন্ত আলোকবর্তিকা। এখানে রয়েছে সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসা, ভাইদের ঈর্ষার পরিণতি, বিচ্ছেদের বেদনা, ধৈর্যের সৌন্দর্য, আল্লাহর অদৃশ্য পরিকল্পনা এবং ক্ষমার মাধ্যমে পুনর্মিলনের মহান শিক্ষা। এই কাহিনী আমাদের জানিয়ে দেয়—পরিবার কখনো নিখুঁত হয় না; কিন্তু ঈমান, ধৈর্য, ক্ষমা এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা থাকলে সবচেয়ে ভেঙে পড়া পরিবারও আবার নতুন করে গড়ে উঠতে পারে। তাই সুখী, স্থিতিশীল ও কল্যাণময় পরিবার গঠনের জন্য সুরা ইউসুফ এক চিরন্তন কোরআনিক দিকনির্দেশনা, যা যুগে যুগে মানবজাতিকে আলো দেখিয়ে যাবে।

টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান সময়ে তরুণদের কাছে টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকস বেশ জনপ্রিয়। ক্লান্তি দূর করা, কর্মক্ষমতা বাড়ানো কিংবা সতেজ অনুভব করার উদ্দেশ্যে অনেকেই এসব পানীয় পান করে থাকেন। তবে সচেতন মুসলমানদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে—এসব এনার্জি ড্রিংকস পান করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ?

ইসলাম মানুষের খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রদান করেছে। আল্লাহ তাআলা যা হালাল করেছেন, তা বিনা প্রমাণে হারাম বলা যেমন বৈধ নয়; তেমনি যা হারাম করেছেন, তা হালাল বলাও গুরুতর অপরাধ। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে কোরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী ফিকহের মূলনীতির আলোকে।

ইসলামে খাদ্য ও পানীয় সম্পর্কে মূলনীতি হলো—সব কিছুই বৈধ, যতক্ষণ পর্যন্ত কোরআন, সুন্নাহ বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে তা হারাম প্রমাণিত না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তাদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র ও নিকৃষ্ট বস্তুসমূহ হারাম করেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭)

আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, আমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে, তাতে আমি কোনো ভক্ষণকারীর জন্য কোনো খাদ্যকে হারাম পাই না; তবে মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত কিংবা শূকরের গোশত হলে তা হারাম।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪৫)

এনার্জি ড্রিংকসের বিধান কী?
টাইগার, স্পিড, রেডবুল বা এ ধরনের অধিকাংশ এনার্জি ড্রিংকসে সাধারণত ক্যাফেইন, চিনি, ভিটামিন ও অন্যান্য বৈধ উপাদান ব্যবহার করা হয়। যদি কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ দ্বারা নিশ্চিতভাবে জানা না যায় যে এসব পানীয়তে হারাম কোনো উপাদান (যেমন—মাদক, নেশাজাতীয় অ্যালকোহল বা হারাম প্রাণীর উপাদান) ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে এসব পান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। শুধু গুজব, সন্দেহ বা অনুমানের ভিত্তিতে কোনো খাদ্য বা পানীয়কে হারাম বলা বৈধ নয়।

অ্যালকোহল লেখা না থাকলে কী হবে?
বর্তমানে বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ এনার্জি ড্রিংকসের গায়ে অ্যালকোহল উপাদান উল্লেখ থাকে না। যদি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত না হয় যে, এতে নেশাজাতীয় হারাম অ্যালকোহল রয়েছে, তাহলে শুধু সন্দেহের কারণে একে হারাম বলা যাবে না। ইসলামী ফিকহে একটি প্রসিদ্ধ নীতি হলো, ‘যেকোনো বস্তুর মূল বিধান হলো বৈধতা।’ (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪৫৯)

অর্থাৎ কোনো বস্তু হারাম হওয়ার জন্য সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। দলিল না থাকলে সেটিকে হালাল হিসেবেই গণ্য করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ কিছু বিষয় ফরজ করেছেন, সেগুলো নষ্ট কোরো না; কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন, তা অতিক্রম কোরো না। আর কিছু বিষয় সম্পর্কে নীরব থেকেছেন—এটি তোমাদের প্রতি রহমতস্বরূপ, ভুলে যাওয়ার কারণে নয়। তাই সেসব বিষয়ে অযথা অনুসন্ধান কোরো না।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস : ৪৩৯৬)

কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
১. যদি কোনো এনার্জি ড্রিংকসে নিশ্চিতভাবে হারাম উপাদান মিশ্রিত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা পান করা বৈধ হবে না।
২. অতিরিক্ত ক্যাফেইন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তা পরিহার করা জরুরি।
৩. যেসব পানীয় শরীরের জন্য নিশ্চিত ক্ষতিকর বা চিকিৎসকের নিষেধ রয়েছে, সেগুলো থেকে বিরত থাকাই ইসলামের শিক্ষা।

সুতরাং শরিয়তের দৃষ্টিতে টাইগার, স্পিড, রেডবুলসহ প্রচলিত এনার্জি ড্রিংকসের মধ্যে যদি নিশ্চিতভাবে কোনো হারাম উপাদান বা নেশাজাতীয় বস্তু থাকার প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেগুলো পান করা জায়েজ। ইসলামের মূলনীতি হলো—কোনো বস্তুকে দলিল ছাড়া হারাম বলা যাবে না। একই সঙ্গে একজন মুসলিমের উচিত হালাল-হারামের ব্যাপারে সচেতন থাকা, স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং সব ক্ষেত্রে পরিমিতি অবলম্বন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল রিজিক গ্রহণ এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মানুষের ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল, ইসলাম কী বলে ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
মানুষের ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল, ইসলাম কী বলে ?
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও জিজ্ঞাসিত বিষয়গুলোর একটি হলো—‘ভাগ্য কি পরিবর্তনশীল?’ অনেকেই মনে করেন, যেহেতু আল্লাহ সবকিছু পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন, তাই মানুষের চেষ্টা, দোয়া কিংবা সৎকর্মের কোনো প্রভাব নেই। আবার কেউ কেউ মনে করেন, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই সম্পূর্ণভাবে গড়ে তোলে। ইসলাম এ দুই চরমপন্থার কোনোটিকেই সমর্থন করে না।

ইসলামের দৃষ্টিতে তাকদির তথা ভাগ্য হলো-আল্লাহ তাআলার সর্বজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের অংশ। তিনি সবকিছু জানেন, সবকিছু লিখে রেখেছেন; তবে একই সঙ্গে মানুষকে ইচ্ছাশক্তি, কর্মক্ষমতা এবং দোয়ার সুযোগও দিয়েছেন। তাই একজন মুমিন বিশ্বাস করে—আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কিছুই ঘটে না, আবার আল্লাহর নির্দেশিত উপায় অবলম্বন করলে তিনি বান্দার অবস্থা ও নির্ধারিত অনেক বিষয় পরিবর্তনও করেন।

তাকদির বা ভাগ্য কী?
তাকদির অর্থ হলো—মহান আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান অনুযায়ী সৃষ্টিজগতের সবকিছুর পরিমাণ, সময়, অবস্থা ও পরিণতি পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই সমস্ত সৃষ্টির তাকদীর লিখে রেখেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৫৩)

ভাগ্য কি পরিবর্তন হয়?
এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, আল্লাহ যেসব বিষয় পরিবর্তনের সঙ্গে শর্তযুক্ত রেখেছেন, সেগুলো দোয়া, সৎকর্ম, তওবা ও আমলের মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে আল্লাহর চূড়ান্ত ও সর্বজ্ঞ সিদ্ধান্ত কখনো ভুল হয় না।

১. চেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের অবস্থা পরিবর্তন করেন
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১১)
এই আয়াত প্রমাণ করে, মানুষের ঈমান, আমল, চরিত্র ও কর্মের পরিবর্তনের সঙ্গে আল্লাহ তাদের অবস্থাও পরিবর্তন করেন।

২. দোয়া ভাগ্যের পরিবর্তনের অন্যতম মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোয়া ছাড়া কোনো কিছুই তাকদীরকে প্রতিহত করতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২১৩৯)
অর্থাৎ, আল্লাহ এমনভাবেই তাকদির নির্ধারণ করেছেন যে বান্দা দোয়া করলে বিপদ দূর হবে, আর দোয়া না করলে তা নেমে আসবে।

৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি পায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ু বরকতময় হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬)

তাকদিরের দুই স্তর
আলেমগণ তাকদিরকে সাধারণভাবে দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেছেন—
১. চূড়ান্ত তাকদির (যা আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞানে সংরক্ষিত)। এটি লাওহে মাহফুজে লিখিত, যা কখনো পরিবর্তিত হয় না।

২. শর্তযুক্ত তাকদীর
এটি ফেরেশতাদের নিকট লিখিত বিষয়, যা আল্লাহর নির্দেশে দোয়া, তওবা, সদকা, নেক আমল ইত্যাদির কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন; আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব (লাওহে মাহফুজ)।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ৩৯)

অতএব, মানুষের ভাগ্য নিয়ে ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা সবকিছু পূর্ব থেকেই জানেন এবং তাঁর জ্ঞানে কোনো পরিবর্তন হয় না। তবে তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য এমন অনেক বিষয় শর্তসাপেক্ষে নির্ধারণ করেছেন, যা দোয়া, তওবা, সৎকর্ম, তাকওয়া ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ‘ভাগ্যে যা আছে তাই হবে’—এই অজুহাতে অলস বসে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং একজন মুমিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, আল্লাহর কাছে কান্নাভেজা দোয়া করবে, নেক আমলে নিজেকে সমৃদ্ধ করবে এবং সবশেষে ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করবে।

আসুন, আমরা তাকদিরের ওপর দৃঢ় ঈমান রাখি, দোয়া ও সৎকর্মকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানাই এবং বিশ্বাস করি—যিনি তাকদিরের মালিক, তিনিই চাইলে আমাদের জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোয়, সংকট থেকে স্বস্তিতে এবং হতাশা থেকে সফলতায় পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মুমিনের করণীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় মুমিনের করণীয়
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবী মহান আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি, আর এই বিশ্বজগতের প্রতিটি ঘটনা তাঁরই ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার অধীন। কখনো ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, খরা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা মহামারির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। মুহূর্তের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি, হারিয়ে যেতে পারে অগণিত প্রাণ, সম্পদ ও স্বপ্ন। এসব দুর্যোগ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—পৃথিবীতে মানুষের শক্তি, প্রযুক্তি ও সামর্থ্য যতই উন্নত হোক না কেন, আল্লাহর অসীম ক্ষমতার সামনে মানুষ চরম অসহায়।

ইসলাম প্রাকৃতিক দুর্যোগকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়; বরং আত্মসমালোচনা, ঈমানের পরীক্ষা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং শিক্ষা গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো—দুর্যোগের সময় ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তিগফার করা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের জীবনকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে পরিচালিত করা।

১. আল্লাহর ফয়সালার প্রতি ঈমান ও ধৈর্য ধারণ করা
মুমিন সর্বপ্রথম বিশ্বাস করবে যে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, সবই আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্ধারণ অনুযায়ী ঘটে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ

অর্থ : আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তিনি তার হৃদয়কে সঠিক পথ দেখান।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১১)
দুর্যোগের সময় হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

২. তাওবা, ইস্তিগফার পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করায়। তাই এমন সময় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ

অর্থ : ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। তবে তিনি অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)
এই আয়াত মানুষকে আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার শিক্ষা দেয়।

৩. আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা
দুর্যোগের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় আল্লাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিপদে-আপদে এ দোয়া পড়তেন, 

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫১৪)

৪. আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

অর্থ : ‘আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫)


৫. দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবিক শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

وَاللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ

অর্থ : ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহও ততক্ষণ তার সাহায্যে থাকেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
অর্থ, খাদ্য, ওষুধ, আশ্রয় ও সান্ত্বনা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।

৬. গুজব ও বিভ্রান্তি থেকে বিরত থাকা
দুর্যোগের সময় যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো খবর প্রচার করা উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا

অর্থ : ‘হে মুমিনগণ! কোনো অবাধ্য ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)

৭. নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা
ইসলাম শুধু দোয়ার শিক্ষা দেয় না; বরং বাস্তবিক সতর্কতাও গ্রহণ করতে নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ

অর্থ : ‘আগে তোমার উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
অতএব দুর্যোগের সময় সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করাও ইসলামের শিক্ষা।

৮. দুর্যোগ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে দুনিয়ার অস্থায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এবং নিজের জীবন সংশোধনের একটি সুযোগ। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ

অর্থ : ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ৪১)
এই আয়াত আমাদেরকে আল্লাহভীরু জীবনযাপনের প্রতি আহ্বান জানায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের অহংকার ভেঙে দিয়ে মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এগুলো কখনো পরীক্ষা, কখনো সতর্কবার্তা, আবার কখনো আত্মশুদ্ধির সুযোগ। তাই একজন মুমিনের উচিত আতঙ্ক বা হতাশায় ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা, বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার ও দোয়া করা, গুজব থেকে বিরত থাকা, নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মনে রাখতে হবে, দুর্যোগ কেবল ধ্বংসের বার্তা নয়; বরং এটি ঈমানকে দৃঢ় করা, মানবতার সেবা করা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনেরও এক মূল্যবান সুযোগ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের বিপদ-মুসিবত থেকে হেফাজত করুন, ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন।