বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অর্থ লেনদেনের পদ্ধতিতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এক সময় টাকা পাঠানোর জন্য ব্যাংক বা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হলেও আজ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদির মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টাকা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—এসব মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা কি শরীয়তসম্মত? এজেন্ট বা দোকান পরিচালনা করে যে কমিশন পাওয়া যায়, তা কি হালাল? এতে কোনো সুদ বা হারাম উপাদান জড়িত আছে কি না?
ইসলাম মানুষের জীবনকে সহজ ও কল্যাণময় করার জন্য বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুমতি দিয়েছে এবং সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তাই এ বিষয়ে শরীয়তের মূলনীতি জানা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
অতএব, কোনো লেনদেন বৈধ না অবৈধ হবে, তা নির্ভর করে সেখানে সুদ, প্রতারণা বা হারাম কোনো উপাদান আছে কি না তার ওপর।
বিকাশ/নগদ/রকেটে টাকা লেনদেন কি সুদের অন্তর্ভুক্ত?
সাধারণভাবে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট বা বিল পরিশোধ করা সুদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এখানে মূলত একটি সেবা (Service) প্রদান করা হচ্ছে এবং সেই সেবার বিনিময়ে নির্ধারিত ফি নেওয়া হচ্ছে। যেমন, একজন ব্যক্তি ঢাকায় টাকা জমা দিলেন, আর অন্যজন চট্টগ্রামে সেই টাকা উত্তোলন করলেন। এখানে কোম্পানি একটি অর্থ স্থানান্তর সেবা প্রদান করছে। এটি সুদ নয়; বরং বৈধ সেবামূলক লেনদেন। ইসলামী ফিকহে এ ধরনের লেনদেনকে হাওয়ালা (حوالة) বা অর্থ স্থানান্তরের একটি বৈধ পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, ‘এক ব্যক্তি অন্য শহরে অবস্থানরত বন্ধুর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একজন ব্যবসায়ীর কাছে অর্থ প্রদান করে এবং ব্যবসায়ী তা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে সেখানে সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করে। এটি বৈধ।’ (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাওয়ালা, ৮/১৭)
অর্থাৎ নিরাপদে অর্থ স্থানান্তরের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা শরীয়তে স্বীকৃত।
এজেন্ট বা বিকাশের দোকান দিয়ে আয় করা কি জায়েজ?
যদি একজন ব্যক্তি বিকাশ, নগদ বা রকেটের অনুমোদিত এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন এবং কোম্পানির নির্ধারিত কমিশন গ্রহণ করেন, তাহলে সেই আয় বৈধ ও হালাল হবে। কারণ তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি বৈধ সেবা প্রদান করছেন। তিনি গ্রাহকের টাকা গ্রহণ করছেন, উত্তোলনের ব্যবস্থা করছেন এবং বিনিময়ে কমিশন পাচ্ছেন। এটি ব্যবসা ও সেবার পারিশ্রমিক, সুদ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে তা বৈধ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
এখানে গ্রাহক ও সেবাদাতার উভয়ের সম্মতিতে সেবা প্রদান করা হচ্ছে, তাই কমিশন গ্রহণ বৈধ।
কখন সতর্ক থাকতে হবে?
যদিও সাধারণ লেনদেন ও এজেন্ট ব্যবসা জায়েজ, তবুও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন—
১. সুদভিত্তিক স্কিমে অংশ না নেওয়া
যদি কোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে সুদভিত্তিক সঞ্চয়, ঋণ বা বিনিয়োগ স্কিম যুক্ত থাকে, তাহলে সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর সাক্ষীদের ওপর অভিশাপ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৯৮)
২. প্রতারণা ও জালিয়াতি থেকে দূরে থাকা
এজেন্ট ব্যবসায় গ্রাহকের অর্থের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সততা বজায় রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০২)
৩. অবৈধ লেনদেনে সহযোগিতা না করা
যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে কোনো লেনদেন হারাম কাজে ব্যবহৃত হবে, তাহলে তাতে সহযোগিতা করা বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)
ইসলামের দৃষ্টিতে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা
ডিজিটাল অর্থ লেনদেন মানুষের সময়, শ্রম ও ঝুঁকি কমিয়ে দিয়েছে। নিরাপদে অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ এবং আর্থিক সেবার সহজলভ্যতা মানুষের জন্য কল্যাণকর। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, ‘লেনদেনের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো বৈধতা, যতক্ষণ না হারাম হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়।’ সুতরাং যেসব ডিজিটাল লেনদেনে সুদ, জুয়া, প্রতারণা বা অন্য কোনো শরীয়তবিরোধী উপাদান নেই, সেগুলো বৈধ বলে গণ্য হবে।
অতএব, বিকাশ, নগদ, রকেটসহ অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সাধারণ অর্থ লেনদেন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। কারণ এটি সুদভিত্তিক লেনদেন নয়; বরং অর্থ স্থানান্তর ও আর্থিক সেবার বিনিময়ে ফি গ্রহণের একটি বৈধ ব্যবস্থা। একইভাবে অনুমোদিত এজেন্ট হিসেবে দোকান পরিচালনা করে কমিশনভিত্তিক আয় করাও বৈধ ও হালাল। তবে একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো সবসময় সুদ, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং হারাম কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে রাখা। ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা, আমানতদারিতা ও আল্লাহভীতিকে প্রাধান্য দিলে তার উপার্জন হবে বরকতময় এবং আখিরাতেও কল্যাণের কারণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন, হারাম ও সন্দেহজনক বিষয় থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের রিজিকে বরকত দান করুন। আমিন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




