বিশ্বজুড়ে ইসলামী ইতিহাস ও কোরআন গবেষণায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে পবিত্র কোরআনের একটি অত্যন্ত প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত একটি বিরল কোরআনের পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষকদের নতুন মূল্যায়ন সামনে এসেছে। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এটি হয়তো পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত অনুলিপিগুলোর একটি, এমনকি এর কিছু অংশ মহানবী (সা.)-এর জীবনকালেই লেখা হয়ে থাকতে পারে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮৬৯ সালে মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক শহর সমরখন্দে কোরআনের একটি অত্যন্ত মূল্যবান ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়। পরে এটি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের ইম্পেরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা হয়। তৎকালীন তুর্কিস্তানের গভর্নর জেনারেল কাফম্যান এই অমূল্য পাণ্ডুলিপিটি সংগ্রহ করে লাইব্রেরিতে পাঠান। ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, এটি প্রথমে এশিয়া মাইনর থেকে একজন বিশিষ্ট তুর্কিস্তানি আলেমের কাছে উপহার হিসেবে পৌঁছে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিখ্যাত বিজয়ী তৈমুরের (তামারলেন) পৃষ্ঠপোষকতায় তুর্কিস্তানে নিয়ে আসা হয়।
এই পাণ্ডুলিপি ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত দাবি হলো, এটি তৃতীয় খলিফা ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর হস্তলিখিত কোরআনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। প্রাচীন সূত্রগুলোতে এমন দাবির উল্লেখ থাকলেও আধুনিক গবেষকরা এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাঁদের মতে, পাণ্ডুলিপিটি অত্যন্ত প্রাচীন হওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণ থাকলেও এটি সরাসরি ওসমান (রা.)-এর নিজের হাতে লেখা—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইম্পেরিয়াল রাশিয়ান আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটির সদস্য ও প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক শপুটিন দীর্ঘদিন এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগে লিখিত এবং হিজরির দ্বিতীয় শতাব্দীর পরের হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। গবেষকদের মতে, এই পাণ্ডুলিপি প্রাচীন আরবি লিপির বিকাশ, কোরআনের লিখনরীতি এবং ইসলামের প্রথম যুগের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এক অমূল্য দলিল।
রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পর দেশটির মুসলিম জনগণ এই পবিত্র পাণ্ডুলিপিটি নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানায়। সরকার সেই আবেদন মঞ্জুরও করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তুর্কিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পথে পাণ্ডুলিপিটি রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়। এর পর থেকে এর প্রকৃত অবস্থান আজও অজানা। তবে সৌভাগ্যের বিষয় হলো এর আগেই ১৯০৪-০৫ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রত্নতত্ত্ব সমিতির উদ্যোগে পাণ্ডুলিপিটির একটি উচ্চমানের প্রতিলিপি প্রস্তুত করা হয়েছিল, যা আজও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই প্রতিলিপির মাত্র ৫০টি বিলাসবহুল সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রতিটি কপির ওজন ছিল প্রায় ১৮ কিলোগ্রাম এবং এতে ছিল ৩৫৩টি বৃহৎ আকারের পৃষ্ঠা। প্রতিটি কপির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০০ পাউন্ড, যা সে সময়ে ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, মূল পাণ্ডুলিপির শ্লোক বিভাজনের রং ও অলংকরণ যতটা সম্ভব হুবহু সংরক্ষণ করা হয়েছিল, ফলে এটি শিল্প ও ইতিহাস—উভয় দিক থেকেই এক অনন্য নিদর্শনে পরিণত হয়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত কোরআনের পাণ্ডুলিপির চর্মপত্রের রেডিওকার্বন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি সপ্তম শতাব্দীর অত্যন্ত প্রাচীন সময়ের। ফলে অনেক গবেষক মনে করেন, এই পাণ্ডুলিপির অংশগুলো মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশা অথবা তাঁর ইন্তেকালের অল্প সময় পরই লিখিত হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রাচীন কোনো পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হওয়া মানেই সেটি নিশ্চিতভাবে ওসমান (রা.)-এর নিজের হাতে লেখা—এমন দাবি ইতিহাসবিদদের কাছে এখনো সর্বসম্মতভাবে প্রমাণিত নয়। তাই এ বিষয়ে গবেষণালব্ধ তথ্য ও ঐতিহাসিক সতর্কতা—উভয়কেই গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি মূল্যায়ন করাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য।