• ই-পেপার

জার্মান ভূমিতে মুসলমানদের হাজার বছরের পদচারণ

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব ১১৬৫

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

‘তারা কি পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করেনি এবং দেখেনি তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছে? আল্লাহ তাদের ধ্বংস করেছেন এবং অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে অনুরূপ পরিণাম। এটা এ জন্য যে আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক এবং অবিশ্বাসীদের কোনো অভিভাবক নেই। যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে আল্লাহ তাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত; কিন্তু যারা কুফরি করে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং জন্তু-জানোয়ারের মতো উদরপূর্তি করে, জাহান্নামই তাদের আবাস।’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ১০-১২)

আয়াতগুলোতে আল্লাহর সাহায্য ও শাস্তির আলোচনা করা হয়েছে।

 

শিক্ষা ও বিধান

১. আল্লাহ যদিও তাঁর নবীর সম্মানে মুশরিকদের চূড়ান্ত শাস্তি দেননি, কিন্তু তাদের নমুনা শাস্তির মাধ্যমে বারবার সতর্ক করেছেন।

২. মক্কার মুশরিকদের দেওয়া নমুনা শাস্তি হলো বদর ও হুনাইনের যুদ্ধে চরম পরাজয়, খন্দকের যুদ্ধে প্রবল বায়ুর প্রকোপ, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং মক্কা বিজয়ের সময় অন্তরে প্রচণ্ড ভয় তৈরি ইত্যাদি।

৩. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় সংঘটিত যুদ্ধগুলো মুসলমানদের জন্য আল্লাহর সাহায্য লাভের নমুনা।

৪. অবিশ্বাসীরা তাদের দেব-দেবীর অভিভাবক মনে করত আর বলত, মুসলমানদের কোনো অভিভাবক নেই। আয়াতে তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

৫. আয়াতে ইঙ্গিত মেলে পানাহারে সংযম আবশ্যক। অসংযত পানাহার ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী এবং তা পশুসুলভ আচরণের অন্তর্ভুক্ত। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির : ২৬/৮৮)

ব্রাজিলে খলিফা উমর (রা.)-এর নামে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ

আবু তাশফিন
ব্রাজিলে খলিফা উমর (রা.)-এর নামে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ

দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ব্রাজিলের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন মসজিদ ‘উমর ইবনুল খাত্তাব মসজিদ’। সেখানে অবস্থানরত মুসলমানদের এই ধর্মীয় উপাসনালয়টি ব্রাজিলের পারানা অঙ্গরাজ্যের ফোজ দো ইগুয়াসু শহরে অবস্থিত। মসজিদের কাছে আছে বিশ্বের বিখ্যাত ইগুয়াসু জলপ্রপাত।

দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ ১৯৮৩ সালের ২৩ মার্চ উদ্বোধন করা হয়। নকশার দিক থেকে মসজিদটি বেশ খোলামেলা এবং পুরো ভবনটি সাদা রঙে সজ্জিত। অনেকের মতে, এর স্থাপত্যশৈলীতে অনেকটা জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদকে অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে। মসজিদটির নামকরণ হয়েছে মহানবী (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবি ও ইসলামের চার খলিফার অন্যতম খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর নামে।

মসজিদের সুউচ্চ দুটি মিনার দূর থেকে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সেখান থেকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দেওয়া হয়, যা মুসল্লিদের জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য প্রশস্ত মূল নামাজকক্ষে সমবেত হতে আহবান জানায়।

মসজিদের অভ্যন্তরে প্রায় ৪০০ বর্গমিটার (প্রায় চার হাজার ৩০০ বর্গফুট) আয়তনের একটি প্রশস্ত মূল নামাজের হল রয়েছে, যা মোট ৬০০ বর্গমিটার (প্রায় ছয় হাজার ৫০০ বর্গফুট) নির্মিত এলাকার অংশ। মূল নামাজকক্ষের পেছনের দেয়ালে একটি আকর্ষণীয় ডিজাইনের মিহরাব নির্মিত হয়েছে।

সেখানে অবস্থানরত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের এটি একটি আধ্যাত্মিক প্রশান্তির কেন্দ্র। এ ছাড়া সে দেশে ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকরা ইসলামের এই অনন্য নিদর্শনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসে।

 

ইসলাম কী বলে

স্ত্রীর টাকায় কার অধিকার

ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভী
স্ত্রীর টাকায় কার অধিকার

ইসলামের মৌলিক নীতি হলো বিয়ের পরও স্বামী ও স্ত্রীর সম্পদের মালিকানা স্বতন্ত্র। আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষের জন্য তার উপার্জনে, নারীর জন্য তার উপার্জনে অংশ আছে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩২)

সুতরাং বৈবাহিক সম্পর্ক শুধু মালিকানা বদলে দেয় না;

১. ঋণ হিসেবে স্ত্রী স্বামীকে কোনো অর্থকড়ি দিলে স্বামী তা ফেরত দিতে বাধ্য, সময়মতো ফেরত না দেওয়া জুলুম। (বুখারি, মুসলিম)

২. আমানত হিসেবে দিলে স্বামীকে তা ফেরত দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দাও।’

(সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

৩. হিবা/উপহার হিসেবে দিলে পরিষ্কার নিয়ত ও প্রমাণ থাকলে মালিকানা স্বামীর। ফেরত আবশ্যক নয়।

৪. চুক্তি স্পষ্ট না হলে ইসলামী বিধান উদ্দেশ্য, উ‌রফ ও প্রমাণ দেখবে; সাধারণত মালিকানা স্ত্রীরই ধরে নেওয়া হবে, বিশেষত তিনি প্রতিবর্ত ফেরতের শর্ত রেখেছেন।

কোরআন ঋণ লিখে রাখতে উৎসাহিত করেছে (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮২); এটি অবিশ্বাস নয়, বরং ভবিষ্যৎ বিরোধ রোধ করে। তাই স্ত্রী ন্যায্য অর্থ ফেরত চাইলে তাকে অবিশ্বস্ত বলা বা তালাক-হুমকি দেওয়া অন্যায় ও অনৈসলামী।

পরামর্শ :

অর্থ লেনদেন শুরুতেই লিখিত ও স্পষ্ট করুন—ঋণ, আমানত, হিবা না অংশীদারি।

অধিকার রক্ষায় জোর দিন, একই সঙ্গে ইহসান, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখুন।

স্বামী হোক বা স্ত্রী—ন্যায্য হকের দাবি সম্পর্ক নষ্ট করে না; বরং স্বচ্ছতা আস্থা বাড়ায়।

দাম্পত্য শুধু আইনগত অধিকার নয়; বরং দয়া, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের নাম।

 

হারিয়ে যাওয়া কোরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ঘিরে আলোড়ন

উম্মে আহমাদ ফারজানা
হারিয়ে যাওয়া কোরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ঘিরে আলোড়ন

বিশ্বজুড়ে ইসলামী ইতিহাস ও কোরআন গবেষণায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে পবিত্র কোরআনের একটি অত্যন্ত প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত একটি বিরল কোরআনের পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষকদের নতুন মূল্যায়ন সামনে এসেছে। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এটি হয়তো পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত অনুলিপিগুলোর একটি, এমনকি এর কিছু অংশ মহানবী (সা.)-এর জীবনকালেই লেখা হয়ে থাকতে পারে।

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮৬৯ সালে মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক শহর সমরখন্দে কোরআনের একটি অত্যন্ত মূল্যবান ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়। পরে এটি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের ইম্পেরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা হয়। তৎকালীন তুর্কিস্তানের গভর্নর জেনারেল কাফম্যান এই অমূল্য পাণ্ডুলিপিটি সংগ্রহ করে লাইব্রেরিতে পাঠান। ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, এটি প্রথমে এশিয়া মাইনর থেকে একজন বিশিষ্ট তুর্কিস্তানি আলেমের কাছে উপহার হিসেবে পৌঁছে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিখ্যাত বিজয়ী তৈমুরের (তামারলেন) পৃষ্ঠপোষকতায় তুর্কিস্তানে নিয়ে আসা হয়।

এই পাণ্ডুলিপি ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত দাবি হলো, এটি তৃতীয় খলিফা ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর হস্তলিখিত কোরআনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। প্রাচীন সূত্রগুলোতে এমন দাবির উল্লেখ থাকলেও আধুনিক গবেষকরা এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাঁদের মতে, পাণ্ডুলিপিটি অত্যন্ত প্রাচীন হওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণ থাকলেও এটি সরাসরি ওসমান (রা.)-এর নিজের হাতে লেখা—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইম্পেরিয়াল রাশিয়ান আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটির সদস্য ও প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক শপুটিন দীর্ঘদিন এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগে লিখিত এবং হিজরির দ্বিতীয় শতাব্দীর পরের হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। গবেষকদের মতে, এই পাণ্ডুলিপি প্রাচীন আরবি লিপির বিকাশ, কোরআনের লিখনরীতি এবং ইসলামের প্রথম যুগের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এক অমূল্য দলিল।

রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পর দেশটির মুসলিম জনগণ এই পবিত্র পাণ্ডুলিপিটি নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানায়। সরকার সেই আবেদন মঞ্জুরও করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তুর্কিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পথে পাণ্ডুলিপিটি রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়। এর পর থেকে এর প্রকৃত অবস্থান আজও অজানা। তবে সৌভাগ্যের বিষয় হলো এর আগেই ১৯০৪-০৫ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রত্নতত্ত্ব সমিতির উদ্যোগে পাণ্ডুলিপিটির একটি উচ্চমানের প্রতিলিপি প্রস্তুত করা হয়েছিল, যা আজও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই প্রতিলিপির মাত্র ৫০টি বিলাসবহুল সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রতিটি কপির ওজন ছিল প্রায় ১৮ কিলোগ্রাম এবং এতে ছিল ৩৫৩টি বৃহৎ আকারের পৃষ্ঠা। প্রতিটি কপির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০০ পাউন্ড, যা সে সময়ে ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, মূল পাণ্ডুলিপির শ্লোক বিভাজনের রং ও অলংকরণ যতটা সম্ভব হুবহু সংরক্ষণ করা হয়েছিল, ফলে এটি শিল্প ও ইতিহাস—উভয় দিক থেকেই এক অনন্য নিদর্শনে পরিণত হয়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত কোরআনের পাণ্ডুলিপির চর্মপত্রের রেডিওকার্বন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি সপ্তম শতাব্দীর অত্যন্ত প্রাচীন সময়ের। ফলে অনেক গবেষক মনে করেন, এই পাণ্ডুলিপির অংশগুলো মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশা অথবা তাঁর ইন্তেকালের অল্প সময় পরই লিখিত হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রাচীন কোনো পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হওয়া মানেই সেটি নিশ্চিতভাবে ওসমান (রা.)-এর নিজের হাতে লেখা—এমন দাবি ইতিহাসবিদদের কাছে এখনো সর্বসম্মতভাবে প্রমাণিত নয়। তাই এ বিষয়ে গবেষণালব্ধ তথ্য ও ঐতিহাসিক সতর্কতা—উভয়কেই গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি মূল্যায়ন করাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য।