বাংলাদেশ পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বর্তমানে চ্যাম্পিয়ন না হলেও বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ১৫টি দেশের মধ্যেই থাকছে। আর এর অন্যতম কারণ, রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার দুর্বলতা। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে সুশাসন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী আইনগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতীয় সংসদে সেই দাবিই তুলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কয়েক দিন আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে দুর্নীতির যে বাড়বাড়ন্ত চিত্র তুলে ধরেছে, তার উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সব কার্যক্রম দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ দিন।’
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্রের তথ্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাবে দেশে ‘লুটেরা অর্থনীতি’ ও ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ গড়ে ওঠে। এ সময় বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ১৫ বছরে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ, মেগাপ্রকল্পে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো এবং আইনের মাধ্যমে দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।”
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আওয়ামী লীগ সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্নীতি তদন্ত করছে। অনেক মামলা বিচারাধীন। দেশে যেহেতু দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানসহ আইন-কানুন একই আছে, তাই সেই আইনের আওতায় অন্তর্বর্তী সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, কিভাবে হয়েছে, কারা করেছে—সবকিছু খুঁজে বের করা হোক। তিনি বলেন, ‘তাই তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) কোনো ধরনের দায়মুক্তি পেতে পারে না।’
টিআইবি সম্প্রতি ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক বছরে সেবা খাতে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সালে সেবাগ্রহীতাদের ৮১.৬ শতাংশ কোনো না কোনো খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যা ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০.৯ শতাংশ। টিআইবির এই প্রতিবেদন ছাড়াও বিভিন্ন সময় অন্তর্বর্তী সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নানা ধরনের দুর্নীতির অনেক খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। স্বচ্ছতা ও ন্যয়বিচারের স্বার্থেই সেগুলো যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের ভিত্তি স্বচ্ছতা। তাই যেকোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।’
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থেকে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়, তারও অন্যতম কারণ ছিল দেড় দশকের সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার দুর্নীতিবিরোধী সেই জনপ্রত্যাশাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করবে, সেই দুর্নীতি যেভাবেই হোক না কেন কিংবা যে-ই করুক না কেন। আমরা চাই, বাংলাদেশ দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পাক। সর্বত্র স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হোক। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের প্রতিটি দুর্নীতির ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।

