তৈরি পোশাক শিল্পকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা বলা হলেও এই খাতে সংকটের শেষ নেই। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক উভয়মুখী সংকটে দেশের বিপুল সম্ভাবনাময় খাতটির জেরবার অবস্থা। করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই ইউক্রেন যুদ্ধের দামামা। সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তৈরি পোশাক খাত একেবারে মুমূর্ষু হয়ে পড়েছে। দেশের ৯৫ শতাংশ তেল ও গ্যাস যেহেতু উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে, সে কারণে এবার জ্বালানিসংকটই তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে অর্ডারে খরা, উৎপাদন ব্যয় অনেকাংশে বৃদ্ধি—এমন পরিস্থিতিতে ছাঁটাইয়ের খড়্গ নেমে এসেছে হাজারো শ্রমিকের ওপর।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দি ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে কালের কণ্ঠ জানিয়েছে, ইরান-মার্কিন যুদ্ধের কারণে ভয়াবহ জ্বালানিসংকটে ভুগছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প। জ্বালানির বাড়তি দাম ব্যবসায়ীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। এমন চাপের মুখে গত ৬ জুন আল-মুসলিম গ্রুপ ঢাকায় তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় এক হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। একই পরিস্থিতি আরো অনেক কারখানায়।
খবরে বলা হয়েছে, গত মে মাসে সরকার ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গড়ে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামে কখনো কখনো তা দিনে আট ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মে মাস পর্যন্ত উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে।
এদিকে মে মাসে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকটে থাকা ব্যবসাগুলোর জন্য ৬০০ বিলিয়ন টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পোশাকশিল্পের জন্য। কিন্তু এসব ঋণের সুদের হার প্রায় ৭ শতাংশ, যা আর্থিক চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বহন করা কঠিন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পোশাকশিল্পে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করে, যাদের বেশির ভাগই নারী। গত বছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই এসেছে এই খাত থেকে। আমরা মনে করি, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে তৈরি পোশাক শিল্পে চলমান সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া খাতটি টিকিয়ে রাখতে এবং লক্ষ্য অর্জনে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—এই তিন পক্ষেরই দায়িত্বশীল ও সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

