লামিন ইয়ামাল না থাকলে স্পেনের আক্রমণভাগ কতটা ভোঁতা তা বোঝা গিয়েছিল প্রথম ম্যাচেই। নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর রবিবার এই তরুণ ফরোয়ার্ডের উপস্থিতি আটলান্টায় সেই দলটির আক্রমণকেই করেছে ক্ষুরধার। এ কারণেই সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের বেশ ভালোভাবেই ফিরে পেয়েছে স্পেন। শুরুর একাদশে নেমে দশ মিনিটেই গোলের সূচনা করা ইয়ামাল ছুঁয়েছেন কম বয়সী ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড। আর সেন্টার ফরোয়ার্ড মিকেল ওয়াইরসাবালও প্রথমার্ধেই জোড়া গোল করে দলের এমন জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন। এ দুজন দ্বিতীয়ার্ধে না থাকায় ছন্নছাড়া হয়ে পড়া স্পেন আর সাফল্য পায়নি বটে, তবে রক্ষণভাগের ভুলে আত্মঘাতী গোলে বড় হারই সঙ্গী হয়েছে সৌদি আরবের।
আগের ম্যাচে সেন্টার ফরোয়ার্ড ওয়াইরসাবাল একেবারেই নিষ্প্রভ ছিলেন, প্রথম ৩০ মিনিট পায়ে কোনো বলই ছোঁয়াতে পারেননি তিনি। তীরের অগ্রভাগ যখন ভোঁতা থাকে, তখন আর লক্ষ্যভেদ হবে কী করে! সেটিই হয়েছে, নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে জাল খুঁজে পায়নি স্পেন। তাতে চরম হতাশা তৈরি হয় লা রোজা ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে। এ ছাড়া শুরু আক্রমণের শাণিয়ে তোলার অন্যতম কারিগর লামিন ইয়ামাল ছিলেন অনুপস্থিত। তিনি থাকলে বিপর্যস্ত একটি দলের চেহারাও যে ভিন্ন হয়ে যায় তা মিনিট খেলেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন ১৮ বছরের এই তরুণ। ফিটনেস সমস্যার কারণে আবারও শুরুর একাদশে থাকবেন কি না তা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু এবার প্রথম থেকেই মাঠে নেমে স্পেনের আক্রমণকে গতিশীল করেছেন তিনি। ওয়াইরসাবালের দেওয়া বল থেকে ম্যাচের ১০ মিনিটে গোলও করেন তিনি। ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ গোল এটি তাঁর। এর মাধ্যমে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলেকেও ছুঁয়ে ফেলেন ইয়ামাল। এত দিন বৈশ্বিক আসরে ১৮ বা তার চেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে গোল করার রেকর্ড শুধু পেলেরই ছিল। ১৯৫৮ সালের আসরে তিনি ওয়েলসের বিপক্ষে মাত্র ১৭ বছর বয়সে গোল করেছিলেন। ৬৮ বছর পর তাঁর পাশেই বসলেন নতুন যুগের বিশ্ব-মাতানো ফুটবলার ইয়ামাল।
ইয়ামালের এই সাফল্যই যেন স্পেনের তাঁবুতে জীবনীশক্তি বাড়িয়ে দেয়। সেটিই পরে ধ্বংসাত্মক করে তুলেছে গত ম্যাচের নখ-দন্তহীন ওয়াইরসাবালকে। জোড়া গোল পেতে দেরি হয়নি তাঁর। ২১ মিনিটে কর্নার থেকে পাওয়া বলে দানি ওলমো শট নিলে তা ওপরের বারে লেগে প্রতিহত হয়। বলটি এমেরিক লাপোর্তের হেডে গিয়ে পড়ে ওয়াইরসাবালের সামনে, তিনি সহজেই পরাভূত করেন সৌদি গোলরক্ষক আল ওয়াইসকে। মাত্র তিন মিনিট পরেই ওলমোর হেডে বাড়িয়ে দেওয়া বলে আবার লক্ষ্যভেদ করেন এই ফরোয়ার্ড (৩-০)। মাত্র ২৪ মিনিটেই সৌদি রক্ষণভাগকে এলেমেলো করে দিয়ে তিনটি গোল আদায় করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে স্প্যানিশরা।
৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করে সৌদি আরব। অবশ্য প্রথম থেকেই ইয়ামাল-ওয়াইরসাবাল জুটি না থাকায় যেন স্পেনের আগুনে অক্রমণ স্তিমিত হয়ে যায়। সে কারণেই নিজেদের অনেকটাই ফিরে পায় গ্রিন ফ্যালকনস। কিন্তু নিজেদের ভুলেই আবার শুরুতেই ব্যবধান বেড়ে যায়। ৪৯ মিনিটে মার্ক কুকুয়েরার ভলি সৌদি গোলরক্ষক ওয়াইস ফিরিয়ে দেন। কিন্তু সেটি হাসান আল তামবাকতির গায়ে লেগে জড়িয়ে যায় জালে (৪-০)। এটি চলতি বিশ্বকাপের অষ্টম আত্মঘাতী গোল। এখন পর্যন্ত শুধু ২০১৮ সালের আসরেই এর চেয়ে বেশি ১৮টি আত্মঘাতী গোল হয়েছে। এর পরেও সুযোগ পেয়েছে স্পেন। তবে আর গোলের দেখা পায়নি তারা। যদিও ম্যাচ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে (৯২ মিনিট) ডান প্রান্ত থেকে পেদ্রো পোরোর বাড়িয়ে দেওয়া বলে আগুয়ান ফেরান তোরেস ছোটো ডি-বক্সে ঢুকে দারুণ এক শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। পরে ভিএআর বিশ্লেষণে অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায় গোলটি। এর কিছু পরেই ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজান রেফারি।
ম্যাচ জিতলেও দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনের দৈন্য ফুটে ওঠে, যা প্রথম ম্যাচে নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষেও দেখা গিয়েছিল। ইয়ামালবিহীন ২০১০ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দুর্বলতাটা কতখানি সেটাই যেন ফুটে ওঠে। তবে এই জয়ে ‘এইচ’ গ্রুপে এখন চার পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে উঠে এসেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। এটিই হয়তো শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে তাদের আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে নামার সুযোগ করে দেবে।



