ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আট দিন পর এক নিরাপত্তারক্ষীকে জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। বৃহস্পতিবার ভোরে তাকে উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ কয়েক দিনের এই কঠিন উদ্ধার অভিযানকে অনেকেই আশার প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির নাম হার্নান আলবার্তো গিল ফ্লোরেস। তার বয়স ৪৩ বছর। গত ২৪ জুন উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরার গালেরিয়াস প্লায়া গ্রান্দে শপিং সেন্টার ধসে পড়ার পর থেকেই তিনি ভবনের বেইসমেন্টে আটকা ছিলেন। বৃহস্পতিবার ভোরে ধুলাবালিতে ঢাকা অবস্থায় তাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনা হয়। উদ্ধারকর্মীরা তাকে স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যান। এ সময় তিনি অক্সিজেন মাস্ক পরা ছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত উদ্ধারকর্মীরা হাততালি দিয়ে এবং উল্লাস করে এই সফল উদ্ধার অভিযান উদ্যাপন করেন। উদ্ধারকর্মীরা জানান, গত সপ্তাহান্তে প্রথমবারের মতো তারা গিল ফ্লোরেসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। এরপর তাকে নিরাপদে বের করে আনতে টানা ১০০ ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করেন তারা। উদ্ধার অভিযান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ধসে পড়া ভবনের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে সুড়ঙ্গ তৈরি করে আটকে পড়া ব্যক্তির কাছে পৌঁছাতে হয়েছে। এ সময় অত্যন্ত অস্থিতিশীল কাঠামো, মুষলধারে বৃষ্টি এবং একটানা আফটারশক উদ্ধারকাজকে আরো কঠিন করে তোলে।
গিল ফ্লোরেসকে উদ্ধার করার পর বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দল আনন্দ প্রকাশ করে। স্ট্রেচার বহন করা চিলির এক উদ্ধারকর্মী মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। কোস্টারিকার রেড ক্রসের সদস্যরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। অনেকেই হাততালি দিয়ে উদ্ধারকর্মীদের অভিনন্দন জানান। কোস্টারিকার রেড ক্রসের উদ্ধারকর্মী মিনিয়ার কোলিয়াদো বলেন, প্রথমবার গিল ফ্লোরেসের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি অনুরোধ করেছিলেন, তিনি জীবিত আছেন—এ কথা যেন তার স্ত্রীকে না জানানো হয়। কারণ, শেষ পর্যন্ত যদি তাকে উদ্ধার করা সম্ভব না হয়, তাহলে তার পরিবার আরো বেশি কষ্ট পাবে। তবে কোলিয়াদো বলেন, উদ্ধারকারী দল শুরু থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কোনো অবস্থাতেই তাকে ধ্বংসস্তূপের নিচে ফেলে রাখা হবে না। উদ্ধারকর্মীরা জানান, ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকে থাকা অবস্থায় নিয়মিত গিল ফ্লোরেসের কাছে খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি দীর্ঘ সময় জীবিত থাকতে পেরেছেন। সাধারণভাবে কোনো দুর্যোগে আটকে পড়া ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের জন্য প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। সেই হিসেবে আট দিন পর তাকে জীবিত উদ্ধার করা বিরল ঘটনা।
গিল ফ্লোরেস ওই শপিং সেন্টারে রাতের শিফটের নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করতেন। প্রথম ভূমিকম্পের সময় তিনি নিজের ছোট নিরাপত্তাকক্ষে ছিলেন। ভবনের বড় অংশ ধসে পড়লেও তার কক্ষটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। এতে তিনি ধ্বংসস্তূপের চাপ থেকে রক্ষা পান এবং সেখানে পর্যাপ্ত বাতাসও ছিল। কোস্টারিকার রেড ক্রসের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল প্রথম তার জীবিত থাকার লক্ষণ শনাক্ত করে। পরে রবিবার তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। গিল ফ্লোরেসের স্ত্রী গুসবিমার গনসালেস বলেন, কয়েক দিন ধরে তিনি স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে ভেঙে পড়েছিলেন। পরে উদ্ধারকর্মীরা জানালেন যে তিনি জীবিত আছেন, তখন নতুন করে আশা ফিরে পান। এই দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে। তাদের বয়স আট ও দশ বছর।
চিলির দমকল বাহিনীর নগর অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারীদল পুরো অভিযান পরিচালনা করে। তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, পর্তুগাল, মেক্সিকো, কোস্টারিকা, এল সালভাদর ও ভেনেজুয়েলার বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারীদল দিন-রাত কাজ করেছে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস এই সফল উদ্ধার অভিযানের প্রশংসা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, একটি মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য সবাই একসঙ্গে কাজ করলে মানবতার সবচেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত তৈরি হয়। তিনি দেশি-বিদেশি সব উদ্ধারকর্মীকে ধন্যবাদ জানান। উদ্ধারকাজে আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্ধারকারীরা একটি দূরনিয়ন্ত্রিত লম্বা ক্যামেরার মাধ্যমে সারাক্ষণ গিল ফ্লোরেসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। অভিযানের শেষ তিন দিনে একটি সরু ছিদ্র দিয়ে তাকে পানি ও তরল পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়। এতে তার শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়নি। চিলির অভিজ্ঞ দমকলকর্মী মারিয়া পাস কাম্পোস পুরো সময় গিল ফ্লোরেসের সঙ্গে কথা বলে তাকে মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছেন। বিশেষ করে উদ্ধারের শেষ কয়েক ঘণ্টায় তিনি তাকে শান্ত থাকতে সাহায্য করেন। উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সময় কাটানোর জন্য গিল ফ্লোরেস ছবি আঁকছেন। পরে মারিয়া পাস কাম্পোস তাকে সুরক্ষার চশমা পরে থাকতে বলেন, যাতে ওপর থেকে পড়া ধুলাবালি বা কংক্রিটের ছোট টুকরো তার চোখে না লাগে।
উল্লেখ্য যে, ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া (ডাবলেট) ভূমিকম্পে ২ হাজার ২৯০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত, ১১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি আহত এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ বলে জানা গেছে। এতে আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৭০০ কোটি (৭ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কয়েক হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। অগভীর কেন্দ্রে হওয়া এই ভূমিকম্প রিখটার স্কেলে যথাক্রমে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী কম্পনে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দেশটির উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্বল স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর কারণে দেশটিতে উদ্ধারকাজ ও চিকিৎসা পরিস্থিতি চরম সংকটের মুখে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য, যেখানে আট দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার হলেন হার্নান আলবার্তো গিল ফ্লোরেস।




