পাসপোর্টকে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে ভারতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিভ্রান্তি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (এমইএ) স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ভারতীয় পাসপোর্ট মূলত একটি ভ্রমণ নথি। এটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং বিদেশে পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য দেওয়া হয়। তাই পাসপোর্টকে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত বা একমাত্র প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সম্প্রতি ভারতের পাসপোর্ট ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক চলাচল এবং বিদেশে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আয়োজিত এক বিস্তারিত ব্রিফিংয়ে এই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পাসপোর্ট সেবা সহজ করা, নিরাপত্তা বাড়ানো এবং আরও বেশি মানুষের কাছে এই সেবা পৌঁছে দেওয়ার বিভিন্ন পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়। কর্মকর্তারা বলেন, পাসপোর্ট দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশ ভ্রমণ সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচয় নিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন নথি নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই সরকারের এই ব্যাখ্যা এসেছে।
ভারত সরকার জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে পাসপোর্ট সেবায় বড় ধরনের উন্নতি আনা হয়েছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে মাত্র পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যেই পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, আবেদনকারীরা বর্তমানে পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্রগুলোতে গড়ে ৪৫ মিনিটেরও কম সময় ব্যয় করছেন। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা এবং প্রক্রিয়া সহজ করার ফলে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হিসেবে ই-পাসপোর্ট চালুর বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সরকার জানিয়েছে, গত বছরের মে মাস থেকে নতুন ইস্যু করা সব পাসপোর্টে বিশেষ ইলেকট্রনিক চিপ যুক্ত করা হচ্ছে। এই চিপে আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক তথ্য এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) মান অনুসরণ করে এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে পাসপোর্ট জালিয়াতি কমবে, নিরাপত্তা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সীমান্ত চেকপয়েন্টে যাচাই প্রক্রিয়া আরো সহজ হবে।
ভারতের পাসপোর্ট সেবা নেটওয়ার্কও উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। এক দশক আগে যেখানে এই সেবার পরিধি সীমিত ছিল, সেখানে বর্তমানে সারা দেশে ৫৪৫টি পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্র চালু রয়েছে। এটি আগের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। চলতি বছরে আরো ২০টি নতুন কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি লোকসভা আসনে অন্তত একটি পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা। কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রায় সব সংসদীয় এলাকাই এই সেবার আওতায় এসেছে। শুধু প্রায় ৩০টি জেলায় এখনো স্থায়ী কেন্দ্র নেই। এসব দুর্গম এলাকায় ভ্রাম্যমাণ পাসপোর্ট দল পাঠিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। গত বছর পরিচালিত বিশেষ ক্যাম্পের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় তিন লাখ মানুষকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।
এত উন্নয়ন সত্ত্বেও ভারতে এখনো পাসপোর্টধারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের কাছে পাসপোর্ট রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। তাই আরো বেশি মানুষের হাতে পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চলাচল ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি ২৫টি দেশের সঙ্গে মোট ২৭টি চলাচল চুক্তি করেছে। এসব দেশের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ রয়েছে। এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থী, গবেষক, প্রশিক্ষণার্থী, পেশাজীবী এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের আন্তর্জাতিক চলাচল সহজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের জন্য আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এখন আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। বর্তমানে ২৭টি দেশ ভারতীয় নাগরিকদের ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ দেয়। আরো ৪৭টি দেশ পৌঁছানোর পর ভিসা বা ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ সুবিধা দেয়। এছাড়া ৬৬টি দেশে ভারতীয় নাগরিকরা ই-ভিসা সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন।
বিদেশে কাজ করতে যাওয়া ভারতীয়দের জন্যও নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, উন্নত সংস্করণের ই-মাইগ্রেট ২.০ প্ল্যাটফর্ম চালুর ফলে অভিবাসন ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ ভারতীয় কর্মী এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ ছাড়া ১৭টি পাসপোর্ট অফিসে স্বয়ংক্রিয় ও দৈবচয়নভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে এবং আবেদন নিষ্পত্তির সময় কমিয়েছে।
সরকার কর্মীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদেশে যাওয়ার আগে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের গন্তব্য দেশের সংস্কৃতি, আইনকানুন এবং প্রয়োজনীয় কাজের দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে ভারত একটি বড় মানবসম্পদ চলাচল ফোরামের আয়োজন করবে। এতে জার্মানি, ইতালি, জাপান, রাশিয়া এবং ডেনমার্ক অংশ নেবে। এর লক্ষ্য হলো দক্ষ ভারতীয় কর্মীদের বিদেশের দায়িত্বশীল নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সংযুক্ত করা। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো এবং সিঙ্গাপুরে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য আইনি সহায়তা ও মানসিক পরামর্শ সেবা চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে বিপদে পড়া নারী কর্মীরা এসব সেবা থেকে উপকৃত হচ্ছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো পাসপোর্টকে সীমিত সংখ্যক মানুষের নথি হিসেবে না রেখে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করে তোলা। তাদের মতে, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং অভিবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও সরকারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে পাসপোর্ট ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে।




