মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ঘনসন্নিবিষ্ট গঠনগুলোর একটি নতুন ছবিতে প্রকাশ করেছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা। ছবিটি তুলেছে নাসার পরিচালিত হাবল মহাকাশ দূরবীন। এতে দেখা গেছে হাজার হাজার গ্যালাক্সির এক বিশাল সমাবেশ, যেখানে মহাকর্ষের শক্তিশালী প্রভাবও স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। সেখানকার মহাকর্ষ বল এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনেক দূরবর্তী বস্তু থেকে আসা আলোকে বাঁকিয়ে দেয় এবং বিবর্ধিত করে।
ছবির কেন্দ্রে রয়েছে 'গ্যালাক্সি ক্লাস্টার এমএসি এস০৩২৯-০২১১'। এটি এমন একটি বিশাল গ্যালাক্সির সমষ্টি, যেখানে অসংখ্য গ্যালাক্সি মহাকর্ষের টানে একসঙ্গে যুক্ত হয়ে রয়েছে। নাসা জানিয়েছে, এই ধরনের গ্যালাক্সি ক্লাস্টার বা ছায়াপথের গুচ্ছ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঠামোগুলোর মধ্যে অন্যতম।
প্রথম দেখায় পুরো ছবিটি বেশ জটিল ও এলোমেলো মনে হয়। বিভিন্ন আকারের গ্যালাক্সি পুরো দৃশ্যজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তবে এই বিশৃঙ্খল সৌন্দর্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের গঠন ও বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমএসি এস০৩২৯-০২১১-এর মতো গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলো মহাবিশ্ব কীভাবে কোটি কোটি বছরে তৈরি হয়েছে, তা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্লাস্টারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর শক্তিশালী মহাকর্ষীয় প্রভাব। এই মহাকর্ষ শুধু গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে ধরেই রাখে না, বরং এর আশপাশের আলোকে বাঁকিয়ে দেয় এবং অনেক সময় দূরের গ্যালাক্সিকে বড় করে দেখায়। এই ঘটনাকে বলা হয় মহাকর্ষীয় লেন্সিং। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এমন দূরের বস্তু দেখতে পান, যা সাধারণভাবে দেখা সম্ভব নয়। কারণ, সেগুলোর আলো অনেক সময় অত্যন্ত দুর্বল হয়ে আসে বা দূরত্বের কারণে হারিয়ে যায়।
হাবলের ছবিতে দেখা গেছে, ক্লাস্টারের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের গ্যালাক্সি ছড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে বড় ও উজ্জ্বল উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি যেমন আছে, তেমনি সর্পিল গ্যালাক্সিও রয়েছে, যেগুলোর ঘূর্ণায়মান বাহু স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কিছু গ্যালাক্সি পাশ থেকে দেখা যাওয়ায় সরু রেখার মতো মনে হচ্ছে। এছাড়া ছবিতে লেন্টিকুলার গ্যালাক্সিও দেখা গেছে, যেগুলো উপবৃত্তাকার ও সর্পিল, দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যই বহন করে। সব মিলিয়ে এটি একটি অত্যন্ত ঘন ও বৈচিত্র্যপূর্ণ মহাজাগতিক দৃশ্য তৈরি করেছে।
ছবির কিছু অংশে আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সির সামনের দিকের কয়েকটি তারকাও দেখা গেছে। এগুলো তাদের আলোর বিশেষ বিচ্ছুরণ বৈশিষ্ট্যের কারণে দূরের গ্যালাক্সিগুলোর থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো মহাকর্ষীয় লেন্সিংয়ের প্রভাব। ছবির কিছু জায়গায় বাঁকানো আলোর রেখা দেখা যায়, যা আসলে কোনো আলাদা গঠন নয়। এগুলো অনেক দূরের গ্যালাক্সি, যাদের আলো বিশাল ক্লাস্টারের মহাকর্ষীয় টানের কারণে বাঁকিয়ে গেছে। একটি জায়গায় মোচড়ানো আটের মতো একটি আকৃতিও দেখা গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি একটি দূরের গ্যালাক্সি, যার চেহারা মহাকর্ষীয় লেন্সিংয়ের কারণে বিকৃত হয়ে গেছে। নাসা জানিয়েছে, এই ধরনের বিকৃতি শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্য নয়, বরং এটি বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলো কীভাবে বাঁকছে তা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ক্লাস্টারের ভেতরে থাকা অদৃশ্য পদার্থের বণ্টন সম্পর্কেও ধারণা পান।
হাবল এই ক্লাস্টারটি পর্যবেক্ষণ করেছে একটি বিশেষ গবেষণা কর্মসূচির অংশ হিসেবে, যেখানে শক্তিশালী এক্স-রে বিকিরণ ছড়ানো গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলোকে অধ্যয়ন করা হয়। এসব ক্লাস্টার মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সক্রিয় অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। পর্যবেক্ষণে হাবল তার দুটি প্রধান যন্ত্র- অ্যাডভান্সড ক্যামেরা ফর সার্ভে এবং ওয়াইড ফিল্ড ক্যামেরা থ্রি ব্যবহার করেছে। এগুলো দৃশ্যমান আলো ও অবলোহিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যে তথ্য সংগ্রহ করেছে, যা ক্লাস্টারের গঠন আরো বিস্তারিতভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।










