‘দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল মৃত’—ক্ষুব্ধ জনতার মাথার ওপর ভাসতে থাকা প্ল্যাকার্ডের লেখাটিই যেন পুরো পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছিল।
অনেক প্রত্যাশা নিয়ে ফিফা বিশ্বকাপে খেলতে গিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু দেশবাসীর প্রত্যাশার চাপেই কি না দলটি চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে ফিরেছে। বাজে পারফরম্যান্সে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে তারা।
দল দেশে ফেরার পর রাজধানী সিউলের ইনচন বিমানবন্দরের বাইরে কয়েক হাজার সমর্থক জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ‘মৃত ফুটবল’ জাগিয়ে তুলেতে দেন আলটিমেটাম।
সমর্থকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ ছিলেন প্রধান কোচ হং মিয়ুং-বোর ওপর। তাদের একাংশ ‘হং আউট’ স্লোগান দেন, এমনকি কেউ কেউ তাকে গাড়িতে ওঠার আগ পর্যন্ত কথা শুনিয়ে দেন।
বিশ্বকাপে ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন হং মিয়ুং-বো। দলের ভরাডুবি দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুং গুরুত্ব সহকারে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের মতে, যোগ্যতার পরিবর্তে পক্ষপাতিত্ব ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়াতেই এমন পরিণতি হয়েছে।
হং মিয়ুং-বো একসময় দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলের বড় তারকা ছিলেন। ঘরের মাঠে ২০০২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন হং মিয়ুং-বো। পরে কোচ হিসেবেও বয়সভিত্তিক দলে সাফল্য পান। কিন্তু ২০২৪ সালে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়।
সমর্থকদের বড় একটি অংশের অভিযোগ ছিল, হং মিয়ুং-বোকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নয়; বরং ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অনেকের দাবি, কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (কেএফএ) শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে হং মিয়ুং-বোকে পছন্দ করতেন বলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদিও কেএফএ শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
বিতর্ক আরো বাড়ে যখন কেএফএর কোচ নির্বাচন কমিটির সাবেক সদস্য ও সাবেক ফুটবলার পার্ক জু-হো অভিযোগ করেন, কোচ নিয়োগের নিয়ম সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তার দাবি, অন্য প্রার্থীদের সমান সুযোগ দেওয়া হয়নি। কেএফএ তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করলেও অনেক সমর্থক এবং কিংবদন্তি ফুটবলার পার্ক জি-সুং তার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।
পরবর্তীতে সরকারি এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কোচ নিয়োগ ও আগের কোচকে বরখাস্ত করার পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতির কথা উঠে আসে। তদন্তে কেএফএর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়। তবে আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়লেও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পায়। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা ও আসরের সহ-আয়োজক মেক্সিকোর কাছে হেরে বিদায় নেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দলের রক্ষণাত্মক কৌশল এবং আক্রমণে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় অধিনায়ক ও দলের সবচেয়ে বড় তারকা সন হিউং-মিনকে শুরুর একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত। অনেকের মতে, কোচ হং মিয়ুং-বো সন হিউং-মিনের সামর্থ্যকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেননি। ম্যাচগুলোতে সনকে অনেক সময় একা লড়াই করতে হয়েছে, পর্যাপ্ত সমর্থন পাননি।
বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর সন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চান। তিনি লেখেন, ‘সমর্থকদের হতাশার অনুভূতি আমি বুঝতে পারছি। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া খুব কঠিন।’
দক্ষিণ কোরিয়ায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল ২০০২ বিশ্বকাপের পর। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময়ে দেশটি ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করতে পারেনি।
বিপরীতে প্রতিবেশী দেশ জাপান পরিকল্পিতভাবে নিজেদের ফুটবলকে এগিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে ফিফা র্যাংকিংয়েও তারা অনেক এগিয়ে। রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে ব্রাজিলকে তারা কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপান দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, একই দর্শনে দল গঠন এবং উপযুক্ত কোচিংয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী ভিত তৈরি করেছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়মিত কোচ বদলে যাওয়ায় স্থায়ী ফুটবল দর্শন গড়ে ওঠেনি।
এ কারণে অনেক সমর্থকের বিশ্বাস, শুধুমাত্র কোচ পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তারা চান কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে বড় ধরনের সংস্কার আনা হোক। তাদের আশা, এবারের ব্যর্থতা দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে।