প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে সরকারের বাজেট ঘোষণার পর বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা একটি প্রথাগত ব্যাপার। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দেশের অর্থনীতিবিদ, চিন্তক ও বিদগ্ধজনের এসব আলোচনা-পর্যালোচনা থেকে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত মন্ত্রণালয় অথবা কর্তৃপক্ষ উপকৃত হন এবং বাজেটে কোনো ভ্রান্তি, দুর্বলতা, বৈষম্য কিংবা জনগণের ওপর কোনো অহেতুক চাপ বা অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝা থাকলে তা সংসদে বাজেট পাশের আগেই সংশোধন করতে পারেন। সংসদ সদস্যরাও বাজেট অধিবেশনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করতে পারেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। ১১ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেট প্রণয়নের জন্য যথেষ্ট সময় না পেলেও জনকল্যাণমুখী, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সহায়ক একটি বাজেট উপহার দিতে সরকারের সদিচ্ছা প্রশংসানীয়। তবে বৈশ্বিক অভিঘাত তথা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তথা বাজেটকে বিপর্যস্ত করতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এবারের বাজেটের আকার জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
আরো পড়ুন
মোদি ও ট্রাম্পের নেতৃত্বের ধরনে দারুণ মিল, আগামী বছরের শুরুতে ভারত সফরে আসছেন ট্রাম্প
বাজেটের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। বাজেটের অর্থায়নের জন্য রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব ২৫ হাজার কোটি টাকা, করবহির্ভূত রাজস্ব (নন-ট্যাক্স রেভিনিউ) ৬৬ হাজার কোটি টাকা এবং অনুদান ধরা হয়েছে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ঘাটতি পূরণের জন্য অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ শতাংশের কম হলে তা সহনীয়, তবে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ রাজস্ব আয় না হলে ঘাটতির পরিমাণ বাড়তে পারে, এমনকি ৫ শতাংশও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান।
আসন্ন বাজেট বাস্তবানের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পণ্য বাজারে স্থিতিশীলতা আনয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল বাস্তবায়ন ও অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীতকরণ ও মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী কিছু দীর্ঘমেয়াদি ভিশনের কথাও উল্লেখ করেছেন। যেমন ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণ, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীতকরণ। একই সময়ের মধ্যে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে এবং দেশের মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। প্রকাশ থাকে যে, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট বিনিয়োগ মাত্র জিডিপির ৩০ শতাংশের নিচে।
আরো পড়ুন
চকরিয়ায় গাড়ি-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ২
পর্যালোচনা
অর্থ বরাদ্দের দিক থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা ও সমাজকল্যাণ খাতকে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬২ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪৫ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। বরাদ্দ বৃদ্ধির হার ৩৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই বরাদ্দ বৃদ্ধির কারণ বিভিন্ন খাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্ড বিতরণ। এ ছাড়া চালু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ ও বর্ধিত হারে অর্থায়ন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে সঠিক ব্যক্তিদের হাতে সরকারি সুবিধা পোঁছে—অর্থাৎ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় মনোবৃত্তি কাজ না করে।
শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, এ খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ সংকুচিত হয়েছে। কৃষিভিত্তিক ৫টি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেট বরাদ্দের ৪.৯৯ শতাংশ। কৃষি খাতের বরাদ্দ কমানো ভালো লক্ষণ নয়। উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য মোট বাজেটের কমবেশি ১০ শতাংশ অর্থ কৃষি খাতে বরাদ্দ করা উচিত। স্বাস্থ্যসেবা খাতের দুটি বিভাগে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি ভালো উদ্যোগ। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এটি প্রয়োজন। তবে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ যা-ই হোক, বাজেট বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। সে জন্য প্রথম দিকেই মন্ত্রণালয়ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, বছরের কোন কোয়ার্টারে কত ব্যয় করা হবে। অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অধিক ব্যয়ের প্রবণতা অপচয় ও দুর্নীতির সম্ভাবনা টেনে আনে। এ ছাড়া, অনেক মন্ত্রণালয় বরাদ্দকৃত অর্থ সম্পূর্ণ খরচ করতে পারে না। এটিও এক ধরনের অপচয়।
আরো পড়ুন
মায়ের পরিচয় কেন গোপন রাখেন কিম জং উন?
এবার বাজেটের অর্থায়নের প্রধান উৎস রাজস্ব বাজেট নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রতিবছরই রাজস্ব আহরণের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আহরণ করে। কিন্তু বিগত প্রায় এক যুগ যাবত কোনো বছরই এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে পারে না।
এনবিআরের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চালু অর্থবছরে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হতে পারে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে। এনবিআর এর বর্তমান নীতি কাঠামো, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আগামী অর্থবছর ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ প্রায় অসম্ভব। তবে এনবিআর এর গতানুগতিক কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন অন্তত প্রতিটি জেলায় কর, ভ্যাট ও কাস্টমস অফিস সম্প্রসারণ, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এনবিআর অটোমেশনের জন্য বিগত প্রায় ৫০ বছরে ২০টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা, স্বচ্ছতার অভাব, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন তথা এনবিআর এর নিজস্ব কর্মচারী-কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে অনীহা ও সীমাবদ্ধতা প্রকল্পগুলোর কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আনতে পারেনি। সে জন্য অটোমেশনে এনবিআর এর নিজস্ব জনবল অধিক হারে সম্পৃক্ত করতে হবে। এনবিআর এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর বাড়াতে হলে সব পর্যায়ে অটোমেশন অপরিহার্য। এর মাধ্যমে কর ফাঁকি ও দুর্নীতি রোধ হবে।
আরো পড়ুন
জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু
দ্বিতীয়ত, দেশের জনগণের মধ্যে কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন কর আদায়কারী কর্মকর্তা ও করদাতাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। জনগণের করভীতি দূর করতে হলে কর্মকর্তাদের দ্বারা করদাতাদের হয়রানি দূর করার প্রশাসনিক পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, রাজস্ব বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে করজাল সম্প্রসারণ। অধিক সংখ্যক করদাতা বাড়ানোর জন্য কর জরিপের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক-চাকরিজীবীদের আয় অটোমেশন তথা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান এবং কর অফিসের সঙ্গে সংযুক্তিসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা আনয়ন অপরিহার্য। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে রাজস্ব অফিসের সঙ্গে চাকরি ও ব্যবসা সংযুক্ত রয়েছে। ফলে কর আদায়ে কোনো অসুবিধা হয় না।
চতুর্থত—রাজস্ব সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিধি-বিধান পরিপালন ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
আরো পড়ুন
রূপগঞ্জে উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি, জনতার আস্থায় এমপি দিপু
জনসাধারণের ওপর থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং বাজেট ঘোষণার পর যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকে, সে জন্য চাল, গম, ভোজ্য তেল, চিনি, মাছ-মাংস, পেঁয়াজ, আদা, মসলাসহ ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে করহার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। শিশুখাদ্যের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং মসলার ক্ষেত্রে আরডি ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ (শূন্য) শতাংশ করা হয়েছে। বাজেট ঘোষণার পর দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়েনি। তবে শুল্কছাড়ের সুবিধা ব্যবসায়ীরাই ভোগ করবে, জনগণের ভোগ্যপণ্যের মূল্য কমার কোনো লক্ষণ নেই। আরো বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্য যেমন— মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এসি, ওয়াশিং মেশিন, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানি ও দেশীয় বিক্রয় ও রপ্তানিতে শুল্ক অব্যাহতি ২০৩৪ সাল পর্যন্ত বহাল রাখা হয়ছে। এ ছাড়া ফ্লোট গ্লাস আমদানিতে ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উপকরণ আমদানিতে যাবতীয় শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস খাতে আমদানি ও উৎপাদনের জন্য শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে পর্যাপ্ত শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে দেশীয় গাড়ি উৎপাদনে পূর্বে প্রদত্ত সুবিধাই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদিত গাড়ি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। একইভাবে কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস আমদানিতে শুল্ক কমানোর ফলে এসবের দেশীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আরো পড়ুন
মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ কাটাছেঁড়া করা কি জায়েজ?
তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পসহ সকল প্রকার রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এনবিআর কর্তৃক বন্ড অডিট করা হবে না। অনেকের মতে বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পখাতে যে সুবিধা সরকার দিয়েছে, তাতে তাদের লাভের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, জনগণ এক সুফল পাক বা না-ই পাক। বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানীকৃত কাপড়, কাগজ, অন্যান্য কাঁচামাল ইত্যাদি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রয় করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এনবিআর কর্তৃক সম্পাদিত বন্ড অডিট অনেকটা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। অডিট বন্ধ করে দেওয়ার ফলে অসাধু ব্যবসায়ীদের সে ভয় আর থাকবে না। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার আরো বৃদ্ধির সম্ভবনা দেখা দেবে।
দেশীয় কম্পানির করপোরেট করসহ বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সুবিধা পাঁচ বছর বা ততোধিক সময় অপরিবর্তনীয় রাখার ব্যবস্থা ব্যবসা-বাণিজ্যে ও বিনিয়োগে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের কর প্রদানের স্বচ্চতাও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ও সরবরাহে উৎসে কর্তিত কর অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এবারের বাজেটে উৎসে কর্তিত করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের করের বোঝা কম হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
আরো পড়ুন
বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা চালুর খবরে কলকাতার ব্যবসায়ীদের মিষ্টি বিতরণ
এ ছাড়া তরুণ, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয় ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসএমই খাতের পুরুষ উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ এবং নারী ও প্রতিবন্ধীদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে। এসবই ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ। কিডনি ডায়ালিসিস সেবা ও ক্যান্সারের ওষুধ প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ।
তবে এবারের বাজেটে মধ্যবিত্ত ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়বে। আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার করা হয়েছে, যা গত বছর বাজেট প্রণয়নের সময়ই নির্ধারণ করা হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার এ সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করলে নিম্ন আয়ের করদাতাদের করভার কিছুটা লাঘব হতো। অপরপক্ষে নিম্নতম করহার ৫ শতাংশ উঠিয়ে দেওয়া এবং ১০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন স্ল্যাব এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যক্তি করদাতাদের করভার ১৫-১৭ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। ব্যক্তিশ্রেণির কর নির্ধারণে নিজ জমিতে বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ কর নির্ধারণ জমির মালিক ও নির্মাণকারী ডেভেলপারদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের মতে, এবারের বাজেটে তারা ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আমদানীকৃত স্ক্র্যাপের ওপর শুল্কবৃদ্ধির ফলে রডের মূল্য বাড়ছে, টাইলস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ইত্যাদির ওপরও অতিরিক্ত ডিউটি বসানো রয়েছে। উপরন্তু কলকারখানায় ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ছে। তার ওপর নির্মিত ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপ জমির মালিক ও ডেভেলপার উভয়ের করের বোঝা বাড়াবে। ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধি পেলে ক্রেতা পাওয়া দুষ্কর হবে। রিহ্যাব সরকারকে উল্লিখিত করারোপ বাতিল করার জন্য অনুরোধ করেছে।
আরো পড়ুন
১৩২ শতক জমির লাউ-কুমড়াগাছ কেটে দিল দুর্বৃত্তরা
প্রস্তাবিত বাজেটে ১০ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বিনিয়োগকৃত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ হারে করারোপ পেনশনার, ক্ষুদ্র ও মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কারীদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা হিসেবে দেখা দেবে। যদিও সরকার বলছে, এটি অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচিত হবে এবং পরবর্তী সময়ে সমন্বয় করে কর নির্ধারণ করা যাবে। ব্যাংক হিসাবের সুদ, সঞ্চয়পত্র বা অন্যান্য বিনিয়োগের মুনাফা থেকে কর কেটে রাখা অনেকের মতে এনবিআরের একটি অনৈতিক কাজ। কর আদায় বৃদ্ধির জন্য এ সহজ কাজটির বিকল্প হিসেবে করজাল বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ, কর অব্যাহতির সুবিধা বন্ধ করা ইত্যাদি পদক্ষেপের ফলে অনেক বেশি রাজস্ব বাড়বে, যা এনবিআরের গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন এবং গতিশীল করার জন্য কর প্রদান ও রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা উঠিয়ে দিয়ে এনবিআর সারা বছর কর প্রদানের নিয়ম চালু করেছে। প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশেষ প্রণোদনা ও আর্থিক ছাড় এবং তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে বিলম্বের মাসুল ও জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে করদাতারা বিলম্ব না করে যথাসময়ে কর প্রদানে উৎসাহিত হবেন।
এবারের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের একটি কর কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কাঠামো অনুযায়ী ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করমুক্ত আয়সীমা আগামী ২ বছর বলবৎ থাকবে। ২০২৮-২৯ কর বর্ষ থেকে ২ বছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা হবে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ সালের জন্য করমুক্ত আয়সীসা হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া কর আদায়কে প্রগ্রেসিভ হারে করার জন্য ২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে ৩৫ শতাংশের আর একটি উচ্চ স্ল্যাব সৃষ্টি করা হয়েছে। ৫ বছরের কর কাঠামোর পূর্বাভাষ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হতে পারে।
বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতন্ত্রায়ণের জন্য এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে।
আরো পড়ুন
মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ কাটাছেঁড়া করা কি জায়েজ?
এগুলো হচ্ছে— (১) সবার জন্য উন্নয়ন (২) মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা (৩) সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা (৪) বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি (৫) ব্যবসা সহজীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ (৬) আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা (৭) জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা (৮) তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ (৯) পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা (১০) দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সে লক্ষ্যে বাজেটের প্রতিপাদ্যই ছিল, ‘গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’। তবে রূঢ় বাস্তবতা হলো— ভঙ্গুর ব্যাংক খাত, দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতি, বেসামাল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির কতিপয় দুর্বল দিক। যেমন—বর্ধিত হারে ঋণের সুদ প্রদান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষিতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রভাবে আমদানীকৃত দ্রব্যাদির উচ্চমূল্য। এসব মাথায় রেখে অর্থনীতির ‘ভঙ্গুর’ দশা দূর করার জন্য সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং অপচয় রোধ করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। তবেই বার্ষিক বাজেট উন্নয়নের কার্যকর নিয়ামক হিসেবে পরিগণিত হবে।
লেখক : সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত