প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার এমন এক ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি বারবার তীব্র যৌন উত্তেজনা, যৌন কল্পনা বা যৌন আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন এমন ব্যক্তি, বস্তু, পরিস্থিতি বা কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে, যা প্রচলিত যৌন আচরণের সীমার বাইরে অবস্থান করে। তবে সব ধরনের অপ্রচলিত যৌন আগ্রহকে মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কোনো প্যারাফিলিয়া তখনই প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার হিসেবে বিবেচিত হয়, যখন তা ব্যক্তির নিজের জীবনে উল্লেখযোগ্য মানসিক কষ্ট, উদ্বেগ বা কার্যকারিতার সমস্যা সৃষ্টি করে অথবা অন্যের সম্মতি, অধিকার ও নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।
এ প্রসঙ্গে অ্যালেন জে. ফ্রান্সেস উল্লেখ করেন, ‘কোনো প্যারাফিলিয়া নিজেই মানসিক ব্যাধি নয়; এটি তখনই প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারে পরিণত হয়, যখন তা ব্যক্তির জন্য মানসিক কষ্ট, কার্যকারিতার সমস্যা বা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’ এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক মনোরোগবিদ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে, যেখানে অপ্রচলিত যৌন আগ্রহ এবং মানসিক ব্যাধির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা হয়।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমাজে গণমাধ্যম মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও সামাজিক ধারণা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্যারাফিলিক আচরণ বা এ-সম্পর্কিত ঘটনা আলোচিত হতে দেখা যায়। ফলে প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার শুধু মনোবিজ্ঞান বা মনোরোগবিদ্যার বিষয় নয়; এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও আইনগত আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের ধারণা
প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যার মধ্যে ভয়্যারিস্টিক ডিসঅর্ডার, এক্সহিবিশনিস্টিক ডিসঅর্ডার, ফ্রোটারিস্টিক ডিসঅর্ডার, সেক্সুয়াল ম্যাসোকিজম ডিসঅর্ডার, সেক্সুয়াল স্যাডিজম ডিসঅর্ডার, পেডোফিলিক ডিসঅর্ডার, ফেটিশিস্টিক ডিসঅর্ডার এবং ট্রান্সভেস্টিক ডিসঅর্ডার উল্লেখযোগ্য। এসব অবস্থার মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে অন্যের সম্মতি ব্যতীত যৌন আচরণ বা যৌন আগ্রহ প্রকাশ পায়, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব মানসিক কষ্ট বা সামাজিক অকার্যকারিতাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্যারাফিলিয়া এবং প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার এক নয়। কোনো অপ্রচলিত যৌন আগ্রহ যদি সম্মতিপূর্ণ হয়, কারও ক্ষতি না করে এবং ব্যক্তির জীবনে উল্লেখযোগ্য সমস্যা সৃষ্টি না করে, তবে তা সাধারণত মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচিত হয় না। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে এই পার্থক্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গণমাধ্যমে প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের উপস্থাপন
গণমাধ্যমের বিভিন্ন আধেয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার-সংশ্লিষ্ট আচরণ প্রায়শই যৌন অপরাধ, যৌন হয়রানি, শিশু নির্যাতন, গোপনে ছবি বা ভিডিও ধারণ এবং অন্যান্য সম্মতিহীন কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়। সংবাদমাধ্যমে এসব ঘটনা সাধারণত অপরাধমূলক আচরণ হিসেবে প্রচারিত হয়, যা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও অনেক সময় বিষয়টির মনস্তাত্ত্বিক ও চিকিৎসাগত দিকগুলো আড়ালে থেকে যায়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন, গোপনে ভিডিও ধারণ, জনসমাগমে যৌন হয়রানি কিংবা অনলাইন যৌন অপরাধের ঘটনাগুলো নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে অপরাধের বিবরণ গুরুত্ব পেলেও সংশ্লিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্যগত কারণ, ঝুঁকি উপাদান এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিষয়টি সম্পর্কে আংশিক ধারণা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে চলচ্চিত্র, নাটক বা ওয়েব কনটেন্টে কখনও কখনও ভয়্যারিজম, ফেটিশিজম বা অন্যান্য অপ্রচলিত যৌন আচরণকে রহস্য, রোমাঞ্চ বা বিনোদনের উপাদান হিসেবে দেখানো হয়। এর ফলে দর্শকদের মধ্যে বিষয়টি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ ধারণা তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারকে কেবল বিকৃত আচরণ বা অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করে, ফলে মানসিক স্বাস্থ্যগত ব্যাখ্যা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
সামাজিক ধারণা ও প্রভাব
গণমাধ্যমে প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের উপস্থাপন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যখন বিষয়টি কেবল অপরাধ বা নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তখন সমাজে এ-সম্পর্কিত ব্যক্তিদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব ও সামাজিক কলঙ্ক বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে অনেক ব্যক্তি সামাজিক লজ্জা, ভয় বা বৈষম্যের আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। গণমাধ্যম যৌন সহিংসতা, শিশু সুরক্ষা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সম্মতির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি এসব বিষয়ে আইনগত ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও গণমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সঠিক ও তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনা জনসাধারণকে বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্পর্কে সচেতন করতে সহায়তা করে এবং ভুল ধারণা দূর করতে ভূমিকা রাখে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এ ধরনের বিষয় নিয়ে জনআলোচনা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে অনেক সময় যাচাইবিহীন তথ্য, অতিরঞ্জিত উপস্থাপন বা ভুল ব্যাখ্যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে তথ্যনির্ভর, মানবিক এবং নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা।
চিকিৎসা ও সচেতনতা
প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় সাধারণত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানীর তত্ত্বাবধানে সাইকোথেরাপি, বিশেষ করে Cognitive Behavioral Therapy (CBT), ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজন অনুসারে ওষুধ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনামূলক পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ক্ষতিকর আচরণ প্রতিরোধ করা, মানসিক কষ্ট কমানো এবং ব্যক্তি ও সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সঠিক তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে গণমাধ্যম প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে যৌন শিক্ষা, সম্মতির গুরুত্ব এবং নিরাপদ সামাজিক আচরণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সমাপনী বক্তব্য
প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, যার সঙ্গে ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং আইনগত বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গণমাধ্যমের বিভিন্ন আধেয়তে এর উপস্থাপন জনসাধারণের ধারণা, মনোভাব এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বিষয়টিকে কেবল অপরাধ বা সামাজিক বিচ্যুতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক ও চিকিৎসাগত দিকগুলো আড়াল হয়ে যেতে পারে।
প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার সম্পর্কে গণমাধ্যমে তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল এবং মানবিক উপস্থাপন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে উৎসাহ সৃষ্টি হবে এবং সমাজে বিদ্যমান ভুল ধারণা ও কলঙ্ক হ্রাস পাবে। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সচেতন সমাজ গঠনে এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ গণমাধ্যম চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: সালমা আহমেদ
শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়











