দেশের অর্থনীতি যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, ডলার ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, ঠিক তখনই সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন নতুন করে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—দেশের সম্পদ কি নীরবে বিদেশে চলে যাচ্ছে? আর সেই পাচারকারীরা কি শেষ পর্যন্ত আড়ালেই থেকে যাবে?
২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্র্যাংক। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই আমানত বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। বৈশ্বিকভাবে যখন সুইস ব্যাংকে বিদেশি আমানত কমছে, তখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই উল্টো প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নও উত্থাপন করছে বটে।
সুইস ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের ধনকুবের, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক, কর ফাঁকিদাতা এবং অর্থ পাচারকারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সুইজারল্যান্ড তার ব্যাংকিং গোপনীয়তার নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে, তবু আমানতকারীদের পরিচয় এখনো কঠোরভাবে সুরক্ষিত। ফলে সুইস ব্যাংকে থাকা অর্থের মালিক কারা—সেই প্রশ্নের উত্তর সাধারণত জনসমক্ষে আসে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো স্পর্শকাতর। কারণ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশি ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে পারেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো বিশেষ অনুমোদন কাউকে দেওয়া হয়নি। ফলে সুইস ব্যাংকে জমা থাকা এই বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কোথা থেকে এলো?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রধান কয়েকটি পথ বহুদিন ধরেই পরিচিত। আমদানিতে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো, রপ্তানিতে কম মূল্য দেখানো, হুন্ডি, ভিওআইপি ব্যবসা, বিদেশে ঘুষ ও কমিশন লেনদেন, এমনকি নগদ ডলার পাচার—সব মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বছরের পর বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব পদ্ধতির অনেকগুলোই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনে সংঘটিত হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মইনুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, স্বৈরশাসনের পতনের পরও অর্থ পাচার বন্ধ হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতায় তা আরো জটিল রূপ নিয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বিপরীতে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুযোগও বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অর্থ পাচার কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডেরও একটি রূপ। কারণ যে অর্থ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ হতে পারত, শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারত কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারত, সেই অর্থ বিদেশে চলে গিয়ে অন্য দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকার যখন বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, ঠিক সেই সময়েও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে পাচারকারীরা শুধু সক্রিয়ই নয়, তারা এখনো নিজেদের নিরাপদ মনে করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সিপিডির নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্রে যে তথ্য উঠে এসেছে তা আরো ভয়াবহ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। সংখ্যাটি এতটাই বিশাল যে তা দেশের গত কয়েক বছরের সম্মিলিত জাতীয় বাজেটকেও ছাড়িয়ে যায়। এই অর্থ দিয়ে কত কিছু করা যেত?
অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘অপর্চুনিটি কস্ট’ বা হারানো সম্ভাবনার মূল্য। এই অর্থ দিয়ে অসংখ্য পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। লাখো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারত। দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত আমূল পরিবর্তিত হতে পারত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অর্থের একটি বড় অংশ আজ বিদেশি ব্যাংক, বিলাসবহুল সম্পত্তি এবং অফশোর কম্পানির পেছনে লুকিয়ে আছে।
এখানে আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে অর্থ পাচারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার পরিবর্তনের আশঙ্কা এবং জবাবদিহির ভয় অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি ও কালোটাকার মালিককে বিদেশে অর্থ সরিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। ২০২৫ সালও ছিল এমন একটি সময়, যখন নির্বাচনী রাজনীতির নানা আলোচনা ও অনিশ্চয়তা বিরাজমান ছিল। ফলে অর্থ পাচারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে এই কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কেবল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করলে ভুল হবে। প্রকৃত সমস্যা আরো গভীরে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও বাস্তবে বড় অর্থ পাচারকারীদের বিচারের নজির খুবই সীমিত। অনেক সময় ছোটখাটো দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শত শতকোটি টাকা বিদেশে পাচারকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়—ক্ষমতা ও প্রভাব থাকলে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সমস্যার মোকাবেলায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং দক্ষিণ কোরিয়া বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সফলতাও এসেছে। মালয়েশিয়ার কুখ্যাত 1MDB কেলেঙ্কারির অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। নাইজেরিয়া সাবেক সামরিক শাসক সানি আবাচার পাচার করা শত শত মিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশও চাইলে পারে। কিন্তু এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ তদন্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অপরিহার্য।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বলছে, পাচার রোধ ও অর্থ ফেরাতে কাজ চলছে। বিভিন্ন দেশে পাচারকারীদের সম্পদ জব্দ করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু জনগণ এখন শুধু উদ্যোগ নয়, ফলাফল দেখতে চায়। কারা এই অর্থ পাচার করেছে? কত টাকা দেশে ফিরেছে? কতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে? কতজন সাজা পেয়েছে? এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত জনমনে সন্দেহ থেকেই যাবে।
সুইস ব্যাংকে থাকা ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ফ্র্যাংক হয়তো সমগ্র পাচারকৃত অর্থের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। কারণ বর্তমান বিশ্বে অর্থ পাচারের গন্তব্য শুধু সুইজারল্যান্ড নয়; দুবাই, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং বিভিন্ন ট্যাক্স হ্যাভেনও সমানভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত চিত্র হয়তো প্রকাশিত সংখ্যার চেয়েও অনেক বড়।
একটি দেশের অর্থনীতি শুধু বাজেট, প্রবৃদ্ধি কিংবা রিজার্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে জনগণের আস্থা, সুশাসন এবং আইনের শাসনের ওপর। যখন সাধারণ মানুষ কর দেয়, ব্যাংকে সঞ্চয় রাখে, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠায়—তখন তারা ধরে নেয় রাষ্ট্র তাদের অর্থ নিরাপদ রাখবে। কিন্তু যদি সেই রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই অর্থ পাচারের মহোৎসব চলে, তাহলে জনগণের আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল সুইস ব্যাংকে কত টাকা আছে, তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—যারা দেশের সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে, তাদের কি কখনো জবাবদিহির মুখোমুখি করা যাবে? নাকি তারা চিরকাল আইনের নাগালের বাইরে থেকেই যাবে?জাতি সেই উত্তর জানতে চায়। কারণ অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অর্থ উদ্ধারের লড়াই নয়; এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই, রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষার লড়াই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার সুরক্ষার লড়াই। এখানে আমি বলতে চাই, সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় যত বড়ই হোক, তার চেয়েও বড় হওয়া উচিত রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সংকল্প। অন্যথায় পাচারকারীরা শুধু আড়ালেই থাকবে না, ভবিষ্যতের আরো অনেক পাচারকারীর জন্য পথও তৈরি করে যাবে। সুতরাং সর্বাগ্রে পাচারকারীদের চিহ্নিত করে জাতির সামনে তাদের পরিচয় উন্মোচন করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক






এখন দেশে শিক্ষার ব্যাপারে আগের আগ্রহ নেই। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের শিক্ষায়। এর কারণটাও ওই দারিদ্র্যই। মানুষ দেখতে পাচ্ছে লেখাপড়া শিখে লাভ হচ্ছে না। চাকরি হচ্ছে না। উপার্জনের আশা নেই। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রসমাজের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার ব্যাপারে অনীহা এবং ঠিক বিপরীতে সন্ত্রাসের ব্যাপারে আগ্রহ ওই হতাশারই দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ বটে।