ঊনবিংশ শতকের বিশ্বখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক ও চিত্রশিল্পী ভিক্টর হুগোর কাব্যগ্রন্থ ‘ওডস এট বেলাডেস’-এর প্রকাশের ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমধর্মী কবিতা ও সংগীতালেখ্য ‘হুগো থ্রু বেঙ্গলি মিস্টিক্স’।
ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের নুভেল ভ্যাগ মিলনায়তনে আয়োজিত এই বিশেষ পরিবেশনা দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ব্রিটেনভিত্তিক দক্ষিণ এশীয় ধ্রুপদী শিল্পসংস্থা ‘সৌধ’-এর পরিবেশনায় ভিক্টর হুগোর কবিতার সঙ্গে বাংলার মরমি সংগীতের এক অনন্য মেলবন্ধন উপস্থাপন করা হয়। কবিতা, সংগীত, আলোক-প্রক্ষেপণ ও দৃশ্য-ভাষ্যের সমন্বয়ে নির্মিত এই আয়োজন দর্শকদের জন্য ছিল এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা।
অনুষ্ঠান শেষে একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক এবং বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘ঢাকায় এই মাপের অনুষ্ঠান খুব কম উপভোগ করেছি। ভিক্টর হুগোকে পুনর্পাঠের ক্ষেত্রে এরকম অপূর্ব পরিবেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।’
বাংলাদেশে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের পরিচালক ফ্রাঁসোয়া শাম্ব্রুও আয়োজনটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এরকম সম্মোহনী অভিসার বাংলাদেশে আমি পরিচালক থাকাকালে কিছু দেখেছি বলে মনে পড়ে না। ভিক্টর হুগোর কবিতা দিয়ে প্রকারান্তরে বাংলার মরমী সঙ্গীতের সৌন্দর্য আবিষ্কার করতে পেরে আমি অভিভূত বোধ করছি। সৌধকে আমি আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখছি যেন বছরের বিভিন্ন সময় আমাদের এই ভেন্যুতে এরকম আরও নতুন নতুন শিল্প-প্রকল্প মঞ্চায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে।’
কবি ও সাংবাদিক জুনান নাশিত বলেন, ‘ঢাকায় এই মাপের অনুষ্ঠান দেখতে পারা রীতিমতো সৌভাগ্যের। এই সুযোগগুলো আমাদের জন্য খুব সচরাচর আসে না। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেছি প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত—কী সঙ্গীত, কী হুগোর হৃদয়স্পর্শী কবিতা! কিংবা দুই ঐতিহ্যের সম্মিলনের ধারণাটুকুও।’
সৌধের পরিচালক টি এম কায়সার জানান, ঢাকার দর্শকদের অভূতপূর্ব সাড়া তাদের অনুপ্রাণিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্যে এই অসামান্য অভিজ্ঞতা খুব তৃপ্তির, বিশেষত যখন আমরা বৃটেনের গন্ডী পার হয়ে দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ বা প্রতীচ্যের অন্যান্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি আমাদের বিচিত্র শিল্পপ্রকল্প দিয়ে। পিনপতন নীরবতায় কানায় কানায় পূর্ণ অডিটরিয়ামে নগরীর স্বনামধন্য কবি, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী, বুদ্ধিজীবী, নাট্য, নৃত্য ও অভিনয়শিল্পী, একাডেমিক, আইনজীবী এবং শিল্পপিপাসু দর্শকেরা আমাদের এই পরিবেশনা আদ্যোপান্ত উপভোগ করেছেন। আমাদের কাজ নিয়ে যে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন, তা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।’
তিনি আরো বলেন, ‘ব্রিটেনে আমাদের কাজ নিয়ে ঢাকার শিল্পবোদ্ধাদের মধ্যে যে কৌতূহল লক্ষ্য করেছি, তা-ও ভীষণ আনন্দের। প্রায় অর্ধেকেরও বেশি দর্শক স্থান-সংকুলানের অভাবে হলে প্রবেশ করতে না পেরে ক্যাফেতে বসে অপেক্ষা করেছেন শুধু আমাদের কাজ নিয়ে তাদের ভালোবাসার কথা জানাতে। এটুকুই মনে করিয়ে দেয়, আমাদের প্রচেষ্টা হয়তো একটি দৃশ্যমান অর্থ তৈরি করছে।’
টি এম আহমেদ কায়সারের পরিচালনায় আয়োজিত এই পরিবেশনায় সংগীত পরিবেশন করেন তরুণ ব্যাঞ্জোবাদক সাব্বির শাহ, ইতালীয় জ্যাজশিল্পী মার্থা, চিত্রশিল্পী তারেক আমিন এবং সরোদবাদক রুমন তারা।
ভিক্টর হুগোর কবিতা পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনাসিব কামাল। আলোক-প্রক্ষেপণ, কবিতা ও সংগীতের দৃশ্য-ভাষ্য নির্মাণে ছিলেন আলোকচিত্রী পাবলো খালেদ। নেপথ্য ব্যবস্থাপনা ও ভিডিও ডকুমেন্টেশনের দায়িত্ব পালন করেন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃত্তিকা কামাল ও উজান।
উল্লেখ্য, গত ১৫ বছর ধরে ব্রিটেনভিত্তিক শিল্পসংস্থা ‘সৌধ’ রয়্যাল অ্যালবার্ট হল, সাউথব্যাংক সেন্টার, হাউস অব কমন্স, স্কটিশ পার্লামেন্ট, ওয়েলশ পার্লামেন্টসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্বনামধন্য শিল্প ও একাডেমিক ভেন্যুতে দক্ষিণ এশীয় ধ্রুপদী শিল্পকে বিশ্বের নানা শিল্পধারার সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটিয়ে পরিবেশনা করে আসছে।



.jpeg)



