রাজধানীর অন্যতম উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। দেড় বছর আগেও এ উদ্যানে ঢুকলেই চোখে পড়ত মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের অবাধ আনাগোনা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এমনকি দূর-দূরান্ত থেকেও এখানে অনেকে আসত মাদক সেবনের উদ্দেশ্যে। তবে সেই দৃশ্যপট এখন অনেকটাই বদলে গেছে। পুলিশের কঠোর নজরদারি, নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানের ফলে এখানে কমে এসেছে মাদকের দৌরাত্ম্য।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ধারাবাহিক অভিযানের ফলে বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক কার্যক্রম প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, চলতি বছরের গত তিন মাসে (মার্চ, এপ্রিল ও মে) সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে মাদক সেবন ও বিক্রির কারণে ৫৩৯ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে ১১৭ জন, এপ্রিল মাসে ১৭৬ জন এবং মে মাসে ২৪৬ জন।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একটি বড় উন্মুক্ত জনসমাগমের স্থান।
করপোরেট চাকরিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে আসত মাদক সেবনের জন্য। আগে উদ্যানে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যেত গাঁজা। ইয়াবার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। মাঝেমধ্যে ইনজেকশনজাতীয় কিছু মাদকও পাওয়া গেলেও এর পরিমাণ ছিল সীমিত।
কর্মকর্তারা আরো বলেন, উদ্যানে সক্রিয় মাদক বিক্রেতাদের অধিকাংশই ছিল ভাসমান প্রকৃতির। স্থায়ী কোনো ঠিকানা না থাকায় সুযোগ পেলেই তারা মাদক বিক্রির চেষ্টা করত। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ১০ থেকে ২০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হলেও অতীতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তবে গত দেড় বছর ধরে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। এই সময়ে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদক নির্মূলকে লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তারা জানান, একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল ২৪ ঘণ্টা উদ্যানে দায়িত্ব পালন করে। আগে গ্রেপ্তার হওয়া অনেক মাদক ব্যবসায়ী জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ত। কিন্তু ধারাবাহিক অভিযানের ফলে তারা বুঝতে পেরেছে যে আগের মতো এখানে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া অস্থায়ী টংঘর উচ্ছেদ করায় তাদের অবস্থানও কমে গেছে। ফলে উদ্যানে মাদক ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এ উদ্যানে ইউনিফর্মধারী পুলিশ ছাড়াও সাদা পোশাকে প্রায়ই অভিযান চালানো হয়। মাদকবিরোধী অভিযানে শাহবাগ থানা পুলিশ চলতি বছরের ১৩ মে একটি অভিনব কৌশলও অবলম্বন করে। ওইদিন রাত ৯টার দিকে মাদকসেবী ও কারবারিদের বিচরণ ঠেকাতে ছদ্মবেশে গিটার বাজিয়ে গান গাওয়ার আসর জমায়। একপর্যায়ে সেখানে মাদকসেবী ও কারবারিরা জড়ো হলে অবৈধ মাদকদ্রব্য গাঁজাসহ সাতজনকে হাতেনাতে আটক করে। পরে রমনা বিভাগের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের (সংক্ষিপ্ত বিচার আদালত) আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে।
এ বিষয়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আলামিন বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে মাদকমুক্ত রাখতে আমরা নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছি। গত দেড় বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার ফলে এখানে মাদক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। একসময় দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে মাদক সেবনের উদ্দেশ্যে উদ্যানে আসত। তবে বর্তমানে কঠোর নজরদারি ও অভিযানের কারণে সেই পরিস্থিতির অনেকখানি পরিবর্তন হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, মাদক বিক্রেতাদের অধিকাংশই ভাসমান প্রকৃতির হলেও আমরা তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে সাধারণ মানুষের জন্য একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও মাদকমুক্ত বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
পুলিশ জানিয়েছে, আগে মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কিছু ব্যক্তি ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ত। তবে বর্তমানে মাদক নিয়ন্ত্রণে আসায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড কমেছে। ইভটিজিংয়ের ঘটনাও এখন খুবই সীমিত। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
মাইকিং, জনসচেতনতামূলক বক্তব্য এবং বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে সবাইকে উদ্যানে ঘুরতে আসার আহ্বান জানিয়ে মাদক থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান শান্ত বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক সেবন ও বিক্রি কমেছে। তবে, আমরা চাই এ উদ্যানের পরিবেশ পার্শ্ববর্তী রমনা পার্কের মতো হোক। রমনা পার্কে যদি সুন্দর পরিবেশ থাকে তাহলে এখানে সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে সমস্যা কোথায়? সব শ্রেণির মানুষ যাতে এখানে ঘুরতে আসতে পারে সেটির ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
শাহবাগ থানার ওসি (তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভাসমান লোকজনের মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক কেনাবেচা হয়। অভিযান চালানোয় এখানে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমে গেছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রয়েছে। আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক নিয়ন্ত্রণে আমাদের নিয়মিত ফুট পেট্রোল কার্যক্রম চালু রয়েছে। এখানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশি নজরদারি থাকে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিশেষ টিম দায়িত্ব পালন করে এবং তারা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্যরা প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করে।
এ ছাড়া কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে আমরা আরও উৎসাহিত করেছি। তাদের সহযোগিতায় উদ্যানে আগত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় এবং সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে দ্রুত অপারেশন পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, কোনো অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা বাস্তবে খুবই কঠিন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি মাদক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করতে। শতভাগ সফল হতে পারব কি না, তা সময়ই বলবে। তবে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, যতটা সম্ভব মাদক নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কাউকে যাতে মাদক গ্রহণের সুযোগ না দেওয়া হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।