হাফিজুর ইসলাম মহানগরী খুলনার একটি বেসরকারি এতিমখানার শিক্ষার্থী। ১২ বছর বয়সী শিশুটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবাকে হারায়। পরে তার আশ্রয় হয় এমিতখানায়। তার ভাষ্য, ‘বাসার কথা মনে হলে কষ্ট লাগে। অনেক সময় ইচ্ছে না হলেও কষ্ট করে এতিমখানার খাবার খেতে হয়। এখানে নেই খেলাধুলার ব্যবস্থা।’
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযাযী, খুলনার সরকারি-বেসরকারি এতিমখানার শিশুদের জন্য মিলছে না সুষম খাবার। এতিমখানার প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু প্রধানত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ করছে। পুষ্টির এই চরম অসামঞ্জস্যতার কারণে এতিমখানার শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে সুষম খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরাও। তাদের শর্করাগ্রহণের হার ২৪ শতাংশ।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ডিসিপ্লিন ও খুলনা সিটি করপোরেশন উইমেন্স কলেজের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিহা মাহাজাবিন।
গবেষকরা বলছেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য শুধু শর্করা নয়, খাবার তালিকায় প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করা জরুরি। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদেরও ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বন্ধ করতে হবে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এতিমখানার প্রায় ৮৯.৬ শতাংশ শিশুই প্রধানত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার যেমন ভাত গ্রহণ করে। আমিষ পাওয়ার হার ৮ শতাংশ। অপরদিকে মধ্যবিত্ত পরিবারে ৬০ শতাংশ শিশু পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করলেও শর্করা গ্রহণ করছে ২৪ শতাংশ। ফলে এতিমখানার শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতিমখানার ২২.৪ শতাংশ শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় এবং ৫৩.৬ শতাংশ শিশু মাঝারি ধরনের পুষ্টিহীনতার শিকার। তাদের হাঁড়ের গঠন বা বুদ্ধি বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন বা আমিষ জোটে মাত্র ৮ শতাংশের ভাগ্যে। সব মিলিয়ে পুষ্টিহীনতার শিকার ৭৬ শতাংশ এতিমখানার শিশু। এছাড়া মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৩.৬ শতাংশ শিশু তীব্র ও ৩২ শতাংশ শিশু মাঝারি পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এসব পরিবারের ৫২.৮ শতাংশ শিশু স্বাভাবিক পুষ্টির অধিকারী হলেও ১.৬ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় আক্রান্ত।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এতিম শিশুদের জন্য খুলনায় চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলো হলো সরকারি শিশু পরিবার বালক, সরকারি শিশু পরিবার বালিকা, সরকারি ছোটমনি নিবাস এবং সমন্বিত শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে মোট ৫০০টি। এসব শিশুদের প্রত্যেকের জন্য প্রতিমাসে বরাদ্দ পাঁচ হাজার টাকা, যার মধ্যে শিক্ষা খাতে এক হাজার টাকা। বাকি টাকা তিন বেলা খাবারের জন্য ব্যয় হয়।
এ ছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ৭০টির বেশি বেসরকারি এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং রয়েছে।
গবেষণার জন্য ১২৫ জন এতিম, ১২৫ জন মধ্যবিত্ত পরিবারের স্কুলগামী ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের সাক্ষাৎকার, শারীরিক পরিমাপ করা হয়। এতে দেখা যায়, এতিমখানায় আসা শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি (৫০.৪ শতাংশ) মাত্র তিন থেকে ছয় বছর বয়সেই সেখানে আশ্রয় নেয়। তাদের ৩১ শতাংশের বেশি এক কক্ষে ৭ থেকে ১০ জন, ২৪ শতাংশের বেশি এক কক্ষে ১৫ জন গাদগাদি করে বসবাস করে।
এতিমখানার ৪০ শতাংশ শিশুই অসুস্থতার সময় ভালো চিকিৎসা সুবিধা পায় না, ৭৯ শতাংশ শিশু অসুস্থ অবস্থায় কোনো বিশেষ খাবার বা বাড়তি যত্ন পায় না। এছাড়া তারা খেলাধুলা বা বিনোদন বঞ্চিত এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়।
গবেষণায় মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পরিবারের শিশুরা ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবারের চেয়ে বেকারি পণ্য ও অস্বাস্থ্যকর ফাস্টফুডের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এসব শিশু।
গবেষকদলের প্রধান তোহরা সাফা বলেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে শুধু শর্করা নয়, খাবার তালিকায় প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে তাদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে এতিমখানাগুলোতে পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা ও স্নেহপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদেরও ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বন্ধ করতে হবে।
খুলনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীন শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রত্যেক শিশুর খাবারের জন্য চার হাজার টাকাসহ মাসে মোট বরাদ্দ পাঁচ হাজার টাকা। এর মাধ্যমে সাধ্য অনুাযায়ী তাদের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেছি। বাড়লে শিশুদের পুষ্টি চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।’