মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত একটি প্রাচীন জনপদ শালবাড়ী। নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার এই গ্রামে রয়েছে একটি কুমারপাড়া। কয়েক শ বছর ধরে সেখানে বসতি তাদের। বসতির বয়স যত, মৃৎপণ্য প্রস্তুতের বয়স তত।
একটা সময় ছিল, শালবাড়ীর কুমারপাড়া মুখর থাকতো কুমারদের কর্মচাঞ্চল্যে। তবে সেই দিন আর নেই। কালের বিবর্তনে চাহিদা কমে গেছে এ শিল্পের। তাই বাঁচার তাগিদে মৃৎশিল্পী বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন, চলে গেছেন অন্য পেশায়। কেউ কেউ ধরে রাখলেও তারা নানা সমস্যায় জর্জরিত।
মৃৎশিল্পীরা জানান, কালের বিবর্তনে প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতায় এই শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। তাদের অনেকে বংশ পরম্পরায় এ পেশায় নিয়োজিত। তাদের হাতের ছোঁয়ায় নিমিষেই তৈরি হয় সুন্দর সব মাটির পণ্য। দৃষ্টিনন্দন ফুলদানি, তৈজষপত্র, সরা, মটকা, সুরাই, পেয়াালা, পশু-পাখি, মাটির ব্যাংক ইত্যাদি। তবে এর আগের সেই জৌলুস আর নেই।
সম্প্রতি সরেজমিন নিয়ামতপুরের শ্রীমন্তপুর ইউনিয়নের মানিকপাটন শালবাড়ীর পালপাড়ায় দেখা যায়, বাড়িতে বাড়িতেকাঠের তৈরি বিশেষ চাকা বা চাক। চাকে পা চালিয়ে মৃৎশিল্পীরা মাটি দিয়ে তৈরি করছেন পুতুল, ফুলের টব, হাঁড়ি পাতিলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।
পাড়ার মৃৎশিল্পী নিপেন চন্দ্র পাল বলেন, ছোটবেলা থেকে বাপ-দাদাকে এ কাজ করতে দেখেছি। এ ব্যবসার মাধ্যমেই সংসার চলতো। কিন্তু এখন সংসার আর চলে না। কোনো রকম দিন চলে যায়। তিনি বলেন, মাটি, বালু, খড় কিনতে হয়। এসব উপকরণের দাম এখন অনেক বেশি। তাই অধিকাংশ সময় দইয়ের পাতিলই তৈরি করে চলছি। বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে এই পেশায় থেকে সংসার চালানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
একই পাড়ায় ধীরেন চন্দ্র পাল বলেন, ‘চৈত্রের শুরুতে কাজের খুব ব্যস্ততা থাকে আমাদের। বাকি সময় টিলেঢালা। তবে আগে যেমন হাতি, ঘোড়া, পুতুলসহ বাহারি জিনিসপত্র বানাতাম, এখন তা আর বানানো হয় না। খরচ বেশি, বেচাবিক্রিও নেই। তাই এখন আমরা শুধু দইয়ের পাতিলই বেশি তৈরি করি। মাঝে মধ্যে অর্ডার পেলে অন্য জিনিসপত্র তৈরি করি।’
মৃৎশিল্পী স্বপ্না বলেন, আমার বাবার বাড়িতেও এই মাটির কাজ হয়। শ্বশুরবাড়িতে এসেও এই কাজই করছি। আগে বেচাকেনা বেশি হতো, এখন আর হয় না। আগে আমি নিজেই হাঁট-বাজারে মাটির তৈরি জিনিস বিক্রি করতাম। এখন আর চাহিদা না থাকায় যাওয়া হয় না। এখন বাড়িতেই দইয়ের হাঁড়ি তৈরি করি। এ দিয়েই কোনোরকম দিন চালাচ্ছি।
নিয়ামতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. মুর্শিদা খাতুন বলেন, আমাদের অনেক পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী রয়েছে। কুমার সম্প্র্রদায় সেগুলোর একটি। প্লাস্টিকের এই যুগে তাদের উৎপাদন কমে গেছে। কেননা, মাটির পণ্যের প্রতি আধুনিক প্রজন্মের মানুষের আগ্রহ দিন দিন কমছে। তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে, ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সুযোগ থাকলে স্থানীয়ভাবে আমি অবশ্যই তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।




