নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ পুইয়ানের বিরুদ্ধে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত নয় এমন ফিল্ড ট্রিপের বিল উত্তোলন এবং শিক্ষার্থীদের নম্বর পরিবর্তনের (মার্ক টেম্পারিং) অভিযোগ উঠেছে। একই বিভাগের শিক্ষক তার স্ত্রী মীম্মা তাবাসসুমের বিরুদ্ধেও নম্বর মূল্যায়ন, শ্রেণিকক্ষে আক্রমণাত্মক আচরণ এবং মানসিক হয়রানিসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের বর্ষ-২, টার্ম-২-এর ফিল্ড ট্রিপের অনুমতি চেয়ে রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন করা হয়। সে সময় বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. মামুন মিয়ার অনুপস্থিতিতে তাঁর পক্ষে আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেন বর্তমান বিভাগীয় চেয়ারম্যান ড. নাজমা বেগম। একই নথিতে তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. মামুন মিয়ার স্বাক্ষরও পাওয়া যায়।
তবে আবেদনপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট টার্মের পরিবর্তে বর্ষ-১, টার্ম-২-এর সিলেবাস সংযুক্ত করা হয়। ওই সিলেবাসে হাতে লেখা ছিল, ‘এই ট্যুর সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত’। কিন্তু বিভাগীয় সূত্র ও পরবর্তী একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের বর্ষ-২, টার্ম-২-এর সিলেবাসে কোনো ফিল্ড ট্রিপের বিধান ছিল না। ফলে ওই সফরের বিপরীতে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ ছিল না।
ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার তামজীদ হোসাইন চৌধুরী বলেন, চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত নথি হলে আমরা সাধারণত সংযুক্তি আলাদাভাবে যাচাই করি না। এক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে।
তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান মো. মামুন মিয়ার দাবি, তার স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি এমন কিছু দেখলে কখনোই ভুল সিলেবাস সংযুক্ত করতে দিতাম না।
বর্তমান বিভাগীয় চেয়ারম্যান ড. নাজমা বেগম বলেন, আমি চেয়ারম্যানের পক্ষে স্বাক্ষর করেছি তার জানার মধ্যেই। হাতে লেখা সংযুক্তি থাকলে আমি স্বাক্ষর করতাম না।
ওই অনুমোদনের ভিত্তিতেই প্রশাসন ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ শিক্ষা সফরের অনুমতি দেয়। পরে ২২ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি সফরটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে ৫ মার্চ বিভাগের একাডেমিক কমিটি সিদ্ধান্ত দেয়, যেহেতু ফিল্ড ট্রিপটি সিলেবাসভুক্ত নয়, তাই এ বাবদ কোনো বিল করা যাবে না। এরপর ১০ মার্চ ১৩ হাজার ৭৪৯ টাকার বিল দাখিল করেন সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ, যা ১৬ মার্চ অনুমোদিত হয়।
একই সফরে অংশ নিয়েও ড. নাজমা বেগম কোনো বিল করেননি। তিনি বলেন, সিলেবাস ও একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমার আর্থিক সুবিধার সুযোগ ছিল না, তাই আমি বিল দিইনি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে মো. ইফতেখার পারভেজ বলেন, প্রশাসনের চিঠির ভিত্তিতেই বিল করেছি। সিলেবাসে ট্যুর নেই জানতাম, তবে এতে বিল করা যাবে না—এটা জানা ছিল না।
এদিকে প্রতিবেদকের হাতে আসা নথিতে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ভাইভা পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের নম্বর পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন শিক্ষার্থীর নম্বর কেটে নতুনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যার ফলে তাদের গ্রেড উন্নীত হয়।
এ বিষয়ে মো. ইফতেখার পারভেজ বলেন, পরীক্ষার শুরুতে দেওয়া নম্বর পরে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সংশোধন করা হয়েছে। এতে অনিয়ম হয়নি।
তিনি আরো বলেন, পরীক্ষা কমিটির প্রধান হিসেবে মূল নম্বরপত্র আমার কাছেই থাকে, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা যায়।
আরো অভিযোগ রয়েছে, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের বর্ষ-৩, টার্ম-১ এর ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ভাইভা পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের পরিবর্তে ৮৫ নম্বর স্কেলে মূল্যায়ন করা হয়, যা লিখিত প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বৈষম্য তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পরীক্ষা কমিটির বহিস্থ সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, ভাইভা পরীক্ষায় ৮৫ নম্বর স্কেলেই মূল্যায়ন করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে মো. ইফতেখার পারভেজ বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নম্বরের পার্থক্য কমানোর উদ্দেশ্যেই কমিটির সিদ্ধান্তে এ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।
অন্যদিকে একই বিভাগের শিক্ষক ও তার স্ত্রী মীম্মা তাবাসসুমের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নম্বর পরিবর্তন, শ্রেণিকক্ষে আক্রমণাত্মক আচরণ এবং মানসিক হয়রানিসহ ১০ দফা অভিযোগে লিখিত আবেদন দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, একই পরিবারের দুই শিক্ষক একাডেমিক কমিটিতে থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়।
একাধিক শিক্ষার্থী জানান, বিভাগের ভেতরে নম্বর পরিবর্তনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পূর্বে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে মূল্যায়নসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে একই পরিবারের একাধিক শিক্ষককে একসঙ্গে দায়িত্ব না দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বাড়বে।






