• ই-পেপার

মসজিদের অর্থ বরাদ্দে হাসনাতের ই-টেন্ডার নৈরাজ্য

সংসদে সংবিধান সংস্কার না হলে জনগণের কাছেই যাব : বিরোধীদলীয় নেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সংসদে সংবিধান সংস্কার না হলে জনগণের কাছেই যাব : বিরোধীদলীয় নেতা
জাতীয় সংসদের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী মতবিনিময়সভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কারের সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে যে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন না করায় দেশে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর না করে কেবল সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আজ বুধবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী মতবিনিময়সভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেছিল। দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো একটি সংস্কার সনদে একমত হয়। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল। জনগণ যে রায় দেবে, তা মেনে নেওয়ার অঙ্গীকারও ছিল। সেই রায়ের ভিত্তিতে একটি সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত ছিল।

বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের সদস্যরা দুই ধরনের শপথ নিলেও সরকারি দলের সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। সরকারের যুক্তি ছিল, বিষয়টি সংবিধানে নেই। সংবিধানে আগে অনেক কিছুই ছিল না। কিন্তু জাতীয় প্রয়োজনেই সেসব বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
 
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনও সংবিধানের বিধানে ছিল না। অতীতের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গণভোটও সংবিধানে উল্লেখ ছিল না। তারপরও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেই সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। গণভোটে প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু সেই রায় কার্যকর না করে সরকার নতুন করে সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করা হলেও কার্যকর আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে নোটিশের মাধ্যমে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত বা রুলিং আসেনি। তাই সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী দল। জনগণের দাবি নিয়ে আন্দোলন চলবে।

বাজেটের নানা দিক তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমানোর কথা বলা হয়েছে, জনগণ বাজারে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়। দ্রব্যমূল্য না কমলে বুঝব সিন্ডিকেটের স্বার্থে ভ্যাট-ট্যাক্স কমানো হয়েছে। তিনি বলেন, দলীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করা উচিত নয়। জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইন করতে হবে। যেসব সংস্কার দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় দেশ বারবার সংকটে পড়বে।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘নির্বাচনের সময় দেশবাসীর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারি সুযোগ-সুবিধা সীমিত রাখার চেষ্টা করছি। তবে কেউ যদি আইনসিদ্ধ সুযোগ নিতে চান, সেটিকে অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়। নির্বাচনের সময় দেশবাসীর সামনে বলেছিলাম, সরকারি সুযোগ-সুবিধা যতটা না নিলে না হয় আমরা চেষ্টা করব। কিন্তু কেউ যদি এটা নিতে চায়, এখানে কোনো অপরাধ নেই। নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল, দলের কেউ নির্বাচিত হলে এমপি, মন্ত্রী বা অন্য কোনো দায়িত্বে থাকলেও বিনা ট্যাক্সে গাড়ি কিনবেন না এবং সরকারি প্লটের সুবিধা নেবেন না। কিন্তু কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সরকারি ফ্ল্যাট ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। কিছু মহল ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিষয়গুলো নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং ‘জল ঘোলা’ করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।’

ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থে সংসদে জোরালো অবস্থান নিয়েছি। বিদেশগামী কর্মীদের ভোগান্তি ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে। প্রবাসীদের পক্ষে আমরা সব সময় কথা বলেছি এবং বলব। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর খরচ কমিয়ে আনার দাবিও আমরা তুলেছি। আমি বলেছি ৮৫ হাজার টাকায় লোক পাঠানো সম্ভব হওয়া উচিত। এই বক্তব্যের কারণে একটি সিন্ডিকেট ক্ষুব্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, আমি কেন বললাম মালয়েশিয়ায় ৮৫ হাজার টাকায় লোক পাঠাতে হবে, এ নিয়ে একটি গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু আমরা চাই, সাধারণ মানুষ কম খরচে বিদেশে যেতে পারুক। যারা বিদেশগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে, সেই দালাল ও সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’ প্রবাসীদের হয়রানি ও শোষণের সুযোগ বন্ধের দাবি জানান তিনি।

রামিসার শোকাহত মায়ের চিকিৎসায় পাশে থাকার আশ্বাস বিএনপির

নিজস্ব প্রতিবেদক
রামিসার শোকাহত মায়ের চিকিৎসায় পাশে থাকার আশ্বাস বিএনপির

ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার শিকার রামিসার শোকাহত মায়ের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।

বুধবার (১ জুলাই) রাজধানীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে গিয়ে রামিসার মায়ের সঙ্গে দেখা করে তার পাশে  থাকার আশ্বাস দেন। এ সময় তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং রামিসার পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কন্যাশোকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া রামিসার মা গত ২৩ জুন রফিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি হন। মানসিক আঘাতের পাশাপাশি তিনি পরিপাকতন্ত্র, স্নায়বিক সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। হাসপাতালে ভর্তির পর তার এমআরআই, আল্ট্রাসনোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

চিকিৎসকদের মতে, তার মানসিক অবস্থার উন্নয়নে ইতোমধ্যে দুই দফা কাউন্সেলিং করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে।

রফিকুল ইসলামকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রামিসার মা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বারবার বলেন, ‘আমি এখনো প্রতিদিন রামিসার ডাক আমার কানে শুনতে পাই।’ মেয়েকে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণার এই আর্তনাদে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

এ সময় রামিসার বাবা চিকিৎসকদের উদ্দেশে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘আপনারা আমার রামিসার মাকে সুস্থ করে ফিরিয়ে দিন।’

চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চলমান চিকিৎসায় রামিসার মায়ের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এখনো তার বেশ কয়েকটি শারীরিক ও মানসিক জটিলতা রয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পরিবারের অন্য কেউ রামিসার ছোট বোনের দেখভাল করার মতো না থাকায় পরিবারের অনুরোধে বুধবার তাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় পাঠানো হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদে তার চিকিৎসা ও মানসিক পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এ সময় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম রামিসার পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস এবং শোকাহত মায়ের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।

নাগরিক সমস্যার সমাধানে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে : জামায়াত আমির

অনলাইন ডেস্ক
নাগরিক সমস্যার সমাধানে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে : জামায়াত আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘নাগরিক সমস্যার সমাধানে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

বুধবার (১ জুলাই) রাজধানীর শেওরাপাড়ায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সমস্যা সমাধান অভিযান শেষে তিনি এ কথা বলেন।

জামায়াত আমির বলেন, ‘পানি, গ্যাস ও জলাবদ্ধতার মতো অনেক সমস্যার পেছনে নাগরিকদের অসচেতনতাও দায়ী। নিজের গার্বেজটা ড্রেনে নিয়ে আমরা ফেলে দিই। সরকার তো প্রতিদিন ড্রেন পরিষ্কার করবে না। সরকার পরিষ্কার করে দেবে, নাগরিকদের সেটা রক্ষা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার, বিরোধীদল ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে পুলিশকে সহযোগিতা এবং পরিবার থেকে সন্তানদের চলাফেরা ও সঙ্গী সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।’

‘শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়, জামায়াতে ইসলামীর বিচারও হতে হবে’

অনলাইন ডেস্ক
‘শুধু ক্ষমা চাওয়া নয়, জামায়াতে ইসলামীর বিচারও হতে হবে’

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য একাধিকবার প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার ইঙ্গিত দিলেও দলগতভাবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অনুশোচনা প্রকাশ’ বা ‘ক্ষমা প্রার্থনা’ করেনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান এবং হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগে দলটির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনপরিসরে বিতর্ক রয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল।’ এর জবাবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমরা অপরাধ করিনি, ক্ষমা চাইব কেন?’

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন দলের নেতারা মনে করছেন, জামায়াতের অতীতের দায়, ক্ষমা প্রার্থনা, বিচার এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—সবকিছুই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। কেউ বলছেন, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা জরুরি; কেউ বলছেন, শুধু ক্ষমা নয়, বিচারও হতে হবে; আবার কেউ মনে করছেন, দলটির নামই তাদের ঐতিহাসিক দায় বহন করছে।

জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপি নিয়ে সমালোচনার আগে আপনাদের নিজেদের দিকে একবার ফিরে তাকানো দরকার। এজন্য তাকানো দরকার যে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য একবারও তো ক্ষমা প্রার্থনা করলেন না। জাতির সামনে আপনাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত ছিল। এটা করলে কিন্তু আজকের এই সমস্যা হয় না।’

তিনি বলেন, ‘আপনাদের নেতা প্রফেসর গোলাম আজম তখন বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে আমরা ভুল করিনি। আমার মনে হয় এখনো সময় আছে। আপনারা এখনো ভেবে দেখতে পারেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনাদের ধারণাটা খুব পরিষ্কার করে আমাদের জানানো উচিত, বাংলাদেশকে জানানো উচিত বলে আমি মনে করি। আমি এর বেশি যেতে চাই না। কারণ বারবার আপনারা এই কথাগুলোই বলতে থাকেন।’

তার ভাষ্য, ‘১৯৭১ সম্পর্কে আপনাদের ধারণা খুব পরিষ্কার করে আপনারা বলেন না, বলেননি। আমি আজ পর্যন্ত শুনিনি। এটা কেউ শোনেনি। এই কথাটা আমরা এজন্য বলছি যে, আজ যদি আপনারা এটা স্বীকার করে নেন, তাহলে আপনাদের জন্য রাজনীতি অনেক সহজ হয়ে যাবে।’

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ইস্যুতে বিএনপির মহাসচিবের বক্তব্যের সমালোচনা করে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও এগারো দলীয় জোটের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলেন।’

তার মতে, ‘অতীতে বিভাজনের রাজনীতির কারণে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। আবার বর্তমান সরকার সেই বিভাজনের রাজনীতি শুরু করেছে। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য জামায়াত ক্ষমা চায়নি। ফ্যাসিবাদীরা যে সুরে কথা বলেছে, সেটি বাংলাদেশের জনগণ জুলাই আন্দোলনের সময় রিজেক্ট (বাতিল) করে দিয়েছে। পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ হবে না।’

হামিদুর রহমান আযাদের বলেন, ‘আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলেন। আমরা অপরাধ করি নাই, ক্ষমা চাইবো কেন? সেই হিসেবে আপনার বাবাও অপরাধী, এই অভিযোগ আছে। সুতরাং আপনাদের কথা সতর্কভাবে বলা উচিত।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা বলেন, ‘জামায়াত ইনিয়ে-বিনিয়ে বিভিন্ন সময় বক্তব্য দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে দলের পক্ষ থেকে একাত্তরের ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি।’

তার ভাষ্য, ‘পাকিস্তানের হানাদারদের তারা রাজনৈতিক সহায়ক ছিল, সামরিক সহায়ক ছিল এবং হত্যাকাণ্ডেও তাদের সহায়ক ভূমিকার একটা প্রামাণিক ইতিহাস বা দলিলপত্র আছে, মানুষ জানে। সুনির্দিষ্টভাবে এই অপরাধের সহায়তার ব্যাপারে এবং গণহত্যার সহায়ক হিসেবে বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তাদের যে অবস্থান, এটা যে ভুল ছিল, অন্যায় ছিল, ফলে তার জন্য যে ক্ষমা প্রার্থনা করা—এটার কোনো “যদি-কিন্তু” দেওয়া যাবে না। নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।’

সাইফুল হক মনে করেন, শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করলেই বিষয়টির সমাপ্তি হবে না। তার মতে, এরপর কীভাবে দলটি প্রায়শ্চিত্ত করবে, সেটিও তাদের নির্ধারণ করতে হবে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের প্রশ্ন যেমন উঠেছে, তেমনি জামায়াতেরও দল হিসেবে বিচারের প্রশ্ন রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানুষের বিচারের মুখোমুখিও তাদের হতে হবে।

তার ভাষায়, ‘তাদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একাত্তরকে ধারণ করা, লালন করার একটা বিষয় আছে। এটা কেবল একটা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন না। জামায়াতের এই বিচারের প্রশ্নটা কোনো শোধ-প্রতিশোধের বিষয় না। এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন।’

বর্তমান নেতৃত্বের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের অনেক নেতা ব্যক্তিগতভাবে ওই সময়ের অপরাধে যুক্ত ছিলেন না। তবে তাদের বহু আগেই দলীয়ভাবে এ বিষয়ে পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, জামায়াতের ক্ষেত্রে শুধু ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন তুলে বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর ও আলশামস বাহিনীর মাধ্যমে যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার সঙ্গে জামায়াতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাই শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না, বিচারও চলমান রাখতে হবে। জামায়াত যদি রাজনৈতিকভাবে এই যুক্তিতে একমত হয় যে পাকিস্তানকে রাখার পক্ষে যে সংগ্রাম করেছিলাম, এইটা আমাদের ভুল ছিল—এই রাজনৈতিক উপলব্ধি হলে তখন ভুল স্বীকারের প্রশ্ন আসবে। তখন কিভাবে বলবে না বলবে সরকার এবং রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে।’

তিনি বলেন, ‘যে মনেই করে না হত্যা করেছে, জোর-জুলুম করেছে, তাহলে শুধু শুধু ক্ষমা চাইলে তো হবে না।’

রুহিন হোসেন প্রিন্স আরও বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলে ‘উইথ দেয়ার অল অক্সিলারি ফোর্স’ উল্লেখ ছিল, যার মধ্যে আলবদর ও আলশামস অন্তর্ভুক্ত। তার মতে, সেই বিবেচনায় জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশের রাজনীতি করার অধিকার নেই।

তিনি বলেন, জনগণ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত রাজনৈতিকভাবে এই শক্তিকে মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করা।

রাজনীতি বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জামায়াত নামটিই দলটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দায়।

তিনি বলেন, ‘জামায়াত নামটা তো ওই যে পাকিস্তানপন্থীদের পক্ষ নিয়েছে সেইরকম ইতিহাস। জামায়াত নামটা যতদিন থাকবে ততদিন তাদের এই দায় বহন করে যেতেই হবে।যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেকের বিচার হয়েছে, অনেকের শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু দল হিসেবে অতীতের দায় থেকে মুক্তি পেতে চাইলে নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে।’

তার ভাষায়, ‘তাদের তো রি-ইনভেন্ট করতে হবে নিজেদের। তারা যদি একাত্তরের দায়মুক্ত হতে চায়, জামায়াত নাম যতদিন থাকবে একাত্তরের সেই দায় তারা এড়াতে পারবে না। তাদেরকে নতুন কোনো নামে আবির্ভূত হতে হবে। তাদের শুধু নাম না, তাদের কর্মসূচিও তাদের জন্য যেটা ওই যে ধর্মীয় ওগুলো তাদের জন্য এক শ্রেণির কাছে গ্রহণযোগ্য না। তবে রাজনীতি তো বিভিন্ন দল বিভিন্ন মতবাদ থাকতে পারে। কিন্তু জামায়াতের বেলায় জামায়াত নামই তাদের জন্য দায় আমি মনে করি।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার কারণে জামায়াত সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে বলে মনে করেন কবি নজরুল কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াতের আমিরকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমাদের ক্ষমা করে দিন, আমাদের একটি সুযোগ দিন।’ কিন্তু তার মতে, ক্ষমা চাইতে হলে আগে স্পষ্টভাবে ভুল স্বীকার করতে হয়।

সামিয়া বলেন, ‘আমি আজ পর্যন্ত কোনো জামায়াতের পক্ষ থেকে অকপটে বলতে দেখিনি বা শুনিনি যে, ১৯৭১ সালে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভুল ছিল বা তারা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থককে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস, শহীদের সংখ্যা বা যুদ্ধকালীন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। এতে মানুষের মনে ধারণা তৈরি হয় যে দলটি এখনো অতীতের অবস্থান থেকে স্পষ্টভাবে সরে আসেনি।

তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমা চাওয়ার প্রথম শর্ত হলো সত্য স্বীকার করা। আর সত্য স্বীকার না করে শুধু “ক্ষমা করে দিন” বলা রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত অনুশোচনা নয়।’