মানুষ সামাজিক জীব। তার পক্ষে একা জীবনের সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। পারস্পরিক সহযোগিতা, অংশীদারি ও সম্মিলিত উদ্যোগ মানুষের পথচলাকে সহজ করে। ইসলাম এই প্রয়োজনকে শুধু স্বীকৃতিই দেয়নি, বরং তা ন্যায়, আল্লাহভীতি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় প্রচলিত ‘সমবায় সমিতি’ (Cooperative Society) শব্দটি না থাকলেও এর মৌলিক দর্শন তথা পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়ভিত্তিক অংশীদারি, সম্পদের সুষম ব্যবহার ও সামাজিক কল্যাণ কোরআন-সুন্নাহ দ্বারা সুপ্রমাণিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো, কিন্তু পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
এই আয়াত ইসলামী সমবায়ের মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। তা হলো যেকোনো যৌথ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হতে হবে কল্যাণ, ন্যায় ও আল্লাহভীতি; অন্যায়, সুদ, প্রতারণা বা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো কাজে সহযোগিতা বৈধ নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম জাতিকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সহযোগিতামূলক সমাজ গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটি সুদৃঢ় অট্টালিকার মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮১)
অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতায় থাকেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, পারস্পরিক সহযোগিতা ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর সেখানে সহযোগিতানির্ভর একটি সমাজ বিনির্মাণ করেছিলেন। মদিনার আনসার ও মুহাজির সাহাবিরা পরস্পরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন। পারস্পরিক সহযোগিতায় মদিনার মুসলিম সমাজ অল্প দিনেই হিজরতের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সামলে স্বনির্ভর সমাজে পরিণত হয়েছিল।
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়ের ধারণার সঙ্গে ‘শিরকত’ (অংশীদারি), ‘মুশারাকা’ ও ‘মুদারাবা’র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে একাধিক ব্যক্তি বৈধ পুঁজিতে অংশীদার হয়ে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে এবং তারা নিজেদের ভেতর ন্যায়সংগতভাবে লাভ-লোকসান ভাগাভাগি করতে পারে। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে ইসলাম সুদনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে শ্রম ও সহযোগিতা নির্ভর অর্থনীতির দিকে পথনির্দেশ করেছে। ইসলাম এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা বলে, যেখানে সুদভিত্তিক শোষণের পরিবর্তে অংশীদারি ও ঝুঁকি ভাগাভাগির নীতি প্রতিষ্ঠিত।
ইসলামী সমবায়ের বৈশিষ্ট্য
ইসলামের দৃষ্টিতে একটি আদর্শ সমবায় সমিতির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। তা হলো
১. কল্যাণ চিন্তা : ইসলামী সমবায়ের উদ্দেশ্য হবে সদস্যদের আর্থ-সামাজিক কল্যাণ, শুধু মুনাফা অর্জন নয়। কেননা কোরআনের নির্দেশনা অনুসারে মুসলিম সমাজের সব সহযোগিতা হবে কল্যাণনির্ভর। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো; কিন্তু পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
২. হালাল উৎস ও বিনিয়োগ : ইসলামী সমবায়ের অর্থের উৎস হবে হালাল এবং তা বিনিয়োগও হবে সম্পূর্ণ হালাল খাতে। সুদ, ঘুষ, জুয়া, প্রতারণা বা হারাম ব্যবসার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা থাকা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কোরো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬৮)
৩. আমানতদারিতা : সমবায় পরিচালনায় আমানত রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও গ্রাহক উভয়ের আমানত রক্ষা করা জরুরি। ইসলাম যেকোনো আর্থিক লেনদেনে আমানতদারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শিক্ষা দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, আমানত যথাযথভাবে তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)
৪. শুরা নীতি অনুসরণ : ইসলাম সম্মিলিত কাজে শুরা নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেয়। এতে সমবায়ের বিনিয়োগ ঝুঁকি কমে যায়, তেমনি স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটে। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, ‘তাদের কাজ পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।’ (সুরা : আশ-শুরা, আয়াত : ৩৮)
৫. হিসাব সংরক্ষণ : লিখিতভাবে হিসাব সংরক্ষণ করা না হলে সমবায়ের স্বচ্ছতা রক্ষা করা যায় না। ইসলাম আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে লিখিতভাবে হিসাব সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়; শুধু তাই নয়, ন্যায়সংগতভাবে তা লেখার নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা যখন একে অন্যের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের কারবার করো তখন তা লিখে রাখো। তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায্যভাবে লিখে দেয়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)
বর্তমান সময়ে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি উন্নয়ন, ক্ষুদ্র সঞ্চয় গড়ে তোলা এবং বেকারত্ব কমাতে ইসলামী নীতিনিষ্ঠ সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সুদমুক্ত সমবায়ভিত্তিক অর্থায়ন মানুষের আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে। একই সঙ্গে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সংহতি শক্তিশালী হয়, যা ইসলামের সামগ্রিক সামাজিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী আদর্শের সমবায় শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং ন্যায়, আমানতদারিতা, জবাবদিহি ও সদস্যদের পারস্পরিক আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি কল্যাণমুখী ব্যবস্থা। ইসলাম সমবায়ের এমন একটি মডেল উপস্থাপন করে, যার ভিত্তি প্রতিযোগিতা নয়; বরং সহযোগিতা। এর লক্ষ্য ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে ইসলামের নীতি, আদর্শ ও শিক্ষা বিসর্জন দেওয়ায় বর্তমান সমাজের অনেক সমবায় উদ্যোগে সফল হচ্ছে না এবং তা সমাজের উপকার করার পরিবর্তে তাতে ক্ষত তৈরি করছে, বিশেষত সুদনির্ভর সমবায় সদস্যদের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয় এবং তারা দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক সংকটে পড়ে। এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া হিসাব, প্রতারণা কিংবা সদস্যদের আমানতের অপব্যবহারের অভিযোগও কম নয়। ইসলামী অর্থনীতিতে সুদ, অসততা ও প্রতারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।




