• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৮ জুন ২০২৬

রাতে ছোট শিশুদের অতিরিক্ত কান্না থামাতে যা করবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
রাতে ছোট শিশুদের অতিরিক্ত কান্না থামাতে যা করবেন
সংগৃহীত ছবি

রাতে ছোট বাচ্চা অতিরিক্ত কান্না করা এটি অনেক পিতা-মাতার জন্য চিন্তার বিষয়। সাধারণভাবে প্রতিটি শিশুই রাতে কাঁদে। তাই এতে বেশি দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। যদি বাচ্চা অতিরিক্ত কান্না করে এবং তাতে কোনো অসুস্থতার আশঙ্কা হয়, তাহলে প্রথমত, কোনো ভালো চিকিৎসককে দেখিয়ে চিকিৎসা করানো উচিত।

তবে এই কান্না দেহগত বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ দুটি কারণেই হতে পারে। সম্ভবনাময় কিছু কারণ যেমন, ক্ষুধা বা বুকের দুধ না পাওয়া, পেটব্যথা / গ্যাস / কোষ্ঠকাঠিন্য, গরম বা ঠান্ডা লাগা, পিপাসা লাগা, ডায়াপার ভেজা থাকা, দাত উঠার ব্যথা, অস্বস্তি লাগা-এই সব দেহগত কারণের দিকে সর্বপ্রথম খেয়াল রাখতে হবে। এরপর যদি কোনো দৃশ্যমান কারণ না পাওয়া যায়, তাহলে অদৃশ্যগত দিক বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন, জ্বিন ও শয়তানী কুপ্রভাব। কেননা জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন রাতের আধার নেমে আসবে অথবা বলেছেন, যখন সন্ধ্যা হয়ে যাবে তখন তোমরা তোমাদের শিশুদের (ঘরে) আটকিয়ে রাখবে। কেননা এ সময় শয়তানেরা ছড়িয়ে পড়ে। আর যখন রাতের কিছু অংশ অতিবাহিত হয়ে যাবে তখন তাদের ছেড়ে দিতে পার। তোমরা ঘরের দরজা বন্ধ করবে এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। কেননা শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩০৪)
এ হাদিস থেকে বুঝা যায়, সন্ধ্যার সময় থেকে কিছু সময় পর্যন্ত জ্বিনেরা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা ছোট বাচ্চাদের বেশি ক্ষতি করতে পারে। এজন্য সন্ধার সময় আজানের পরপর কিছু সময়ের জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা এবং শিশুদের বাইরে বের হতে না দেয়া। অপর এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এমন কোন নবজাতক নেই যাকে শয়তান খোঁচা না দেয়। যাকে শয়তান খোঁচায় সে চিৎকার করতে শুরু করে। শুধু মরিয়ম তনয় এবং তাঁর মাতা ছাড়া। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৬৬)

এক্ষেত্রে করণীয় কিছু আমল:
১. সন্ধ্যার আগে দরজা-জানালা বন্ধ করা।
২. সন্ধ্যার সময় (মাগরিব) শিশুকে বাইরে না নেওয়া।
৩. রাতে ঘুমানোর সময় কিছু দোয়া ও আমল করা:

ক. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা, প্রতিদিন রাতে-বিশেষ করে শিশুকে ঘুম পাড়ানোর আগে পড়ে বাচ্চার গায়ে ফুঁ দেয়া।
খ. রাসুল (সা.) নিজের নাতি হাসান ও হুসাইনকে এই দুআটি পড়ে ফুঁ দিতেন,

أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ


উচ্চারণ : উয়িজু বিকালিমাতিল্লাহিত তা-ম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়ামিন কুল্লি আইনিন লাম্মাতিন।
অর্থ : ‘আমি তোমাদের দু’জনকে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের আশ্রয়ে দিচ্ছি-প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং সকল অনিষ্টকারী বদনজর থেকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৭১)

গ. সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে বাচ্চাকে ফুঁ দেয়া।
ঘ. রাতে ঘুমানোর আগে (সম্ভব হলে) পুরো ঘরে সুরা বাকারার রেকর্ড চালিয়ে রাখা।
ঙ. বাচ্চার নাম রাখার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা: ভালো ও অর্থপূর্ণ ইসলামি নাম রাখা জরুরী। কেননা নামের প্রভাব শিশুর মানসিকতা ও আত্মগঠনে খুবই প্রভাবক। বিশেষ করে ঘুমানোর পূর্বে নিজের রুমকে বন্ধ করে নেয়া। আয়াতুল কুরসি ও তার পরের দুই আয়াত পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে সজোরে তিনটি তালি দিন। ইনশাআল্লাহ বাচ্চাসহ সবাই রবের জিম্মায় নিরাপদ থাকবেন।

মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ কাটাছেঁড়া করা কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ কাটাছেঁড়া করা কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তার সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। মানুষের দেহ শুধু কিছু অস্থি, মাংস ও রক্তের সমষ্টি নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার এক মহামূল্যবান আমানত। জীবিত অবস্থায় যেমন মানুষের জীবন, দেহ ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা ফরজ, তেমনি মৃত্যুর পরও তার মরদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামী শরিয়তের অবিচ্ছেদ্য নির্দেশ।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো অ্যানাটমি শিক্ষা, যেখানে মানবদেহের গঠন বোঝার জন্য মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করানো হয়। কিন্তু একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এভাবে মৃত মানুষের দেহ কাটাছেঁড়া করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি? যদি এটি বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে তার করণীয় কী?

প্রথমত : ইসলামে মানুষের মর্যাদা
মানুষকে আল্লাহ তাআলা সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে বিশেষ সম্মান দান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৭০)
এই আয়াত প্রমাণ করে, মানুষের মর্যাদা শুধু জীবিত অবস্থার জন্য নয়; বরং তার মানবিক সত্তার জন্য। তাই মৃত্যুর পরও তার মরদেহকে অবমাননা করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয়ত : মৃতদেহের সম্মান জীবিতের মতোই
রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত ব্যক্তির মর্যাদাকে জীবিত মানুষের মর্যাদার সমপর্যায়ে বিবেচনা করেছেন। আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির হাড় ভেঙে ফেলা জীবিত অবস্থায় তার হাড় ভেঙে ফেলার মতোই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬১৬)

তৃতীয়ত : অঙ্গহানি নিষিদ্ধ
যুদ্ধক্ষেত্রেও ইসলামে মৃতদেহ বিকৃত বা অঙ্গহানি করা নিষিদ্ধ। মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মহানবী (সা.) অঙ্গহানি করতে নিষেধ করেছেন।’ (তাহাবি, হাদিস : ৫০২৪)
যদি শত্রুর মৃতদেহ বিকৃত করা নিষিদ্ধ হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের দেহ কাটাছেঁড়া করা কতটা গুরুতর বিষয়—তা সহজেই অনুমেয়।

বিখ্যাত ফিকহ বিশ্বকোষ ‘আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়্যাহ’(২৬/১০২)-এ বলা হয়েছে—ফোকাহায়ে কেরাম একমত যে মানুষের চুল বিক্রি করা বা তা থেকে উপকার গ্রহণ করা জায়েজ নয়। কারণ মানুষ সম্মানিত; তাই তার কোনো অংশকে অবমাননা করা বৈধ নয়। এখানে মানুষের একটি ক্ষুদ্র অংশ—চুল—সম্পর্কেও সম্মান রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হলেও মৃত মানুষের দেহ কেটে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করা, হাড় ভাঙা বা দেহ বিকৃত করা মূলত শরিয়তের দৃষ্টিতে উচিত নয়। কারণ এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। তবে যদি মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর জন্য এটি বাধ্যতামূলক হয়, এবং যদি কোনো দেশে এমন ব্যবস্থা থাকে যে মৃতদেহ কাটাছেঁড়া ছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা সম্পন্ন করা সম্ভব নয় এবং শিক্ষার্থী বাস্তবিকই বাধ্য হয়, তাহলে তার করণীয় হলো—সে নিজের পক্ষ থেকে এ কাজকে বৈধ মনে করবে না, নিয়মিত ইস্তিগফার করবে এবং প্রয়োজনে ন্যূনতম সীমায় অংশগ্রহণ করবে। (হিদায়াহ, ৬/৪২৫, দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতার, ৫/৫৮, ফাতহুল কাদির, ৬/৪২৫-৪২৬, বাদায়েউস সানাই, ৬/১৪২, মাজমাউল আনহার, ৩/৮৫-৮৬)

সম্ভাব্য শরিয়তসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা
চিকিৎসা শিক্ষা অব্যাহত রাখার জন্য নিম্নোক্ত বিকল্পগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে—

১. উন্নতমানের কৃত্রিম মানবদেহ বা থ্রিডি অ্যানাটমিক্যাল মডেল ব্যবহার করা।
২. ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, ডিজিটাল অ্যানাটমি ও ত্রিমাত্রিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া।
৩. প্রাণীর দেহ (যেখানে শিক্ষাগতভাবে উপযোগী) ব্যবহার করা।
৪. অস্ত্রোপচারের সময় পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষা গ্রহণ করা।
৫. বৈধ শিক্ষামূলক ভিডিও, থ্রিডি অ্যানিমেশন ও সিমুলেশন ব্যবহার করা।

এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বের অনেক মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানে ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই জীবিত মানুষের মতো মৃত মানুষের মরদেহও সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তার দাবিদার। অতএব উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, চিকিৎসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে মৃতদেহ কাটাছেঁড়া বৈধ নয়। তবে যদি কোনো মুসলিম শিক্ষার্থী এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্য হয়ে পড়েন, যেখানে এর কোনো বাস্তব বিকল্প নেই, তাহলে তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত এতে জড়াবেন না এবং শরিয়তসম্মত বিকল্প প্রতিষ্ঠার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

উল্লেখ্য : সমকালীন কিছু আলেম চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপরিহার্য প্রয়োজন, জনকল্যাণ এবং নির্দিষ্ট শর্ত (যেমন অনুমোদিত দেহ, মর্যাদা রক্ষা, প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম না করা ইত্যাদি) সাপেক্ষে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদকে বৈধ বলেছেন। 
 

ব্যক্তিগত বিদ্বেষ যেভাবে জুলুমে রূপ নেয়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
ব্যক্তিগত বিদ্বেষ যেভাবে জুলুমে রূপ নেয়
সংগৃহীত ছবি

আমাদের সমাজে বা পরিবারে কলহ তৈরি হওয়ার পেছনে যে সমস্যাগুলো কাজ করে, তার মধ্যে অন্যতম বড় সমস্যা হলো সামান্য কষ্ট পেলেই অন্যের সব অবদান ভুলে যাওয়া। কারো একটি কথা কিংবা একটি ভুলকে বড় করে দেখে তার সারা জীবনের সব অবদানকে অস্বীকার করে বসা। 

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা হয় যে, যে ব্যক্তিটি আমাদের অসংখ্যবার উপকার করেছে, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে, আন্তরিক পরামর্শ দিয়েছে, দুঃসময়ে সাহায্য করেছে, কোনো একদিন তার একটি আচরণ আমাদের মন খারাপ করে দিলে আমরা তার সব অবদান ভুলে যাই। এমনকি তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে শুরু করি। ফলে তার ভালো গুণগুলো জেনেশুনে আড়াল করি এবং সুযোগ পেলেই তার দোষত্রুটি অন্যের কাছে তুলে ধরি।

বিদ্বেষ আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে বিকৃত করে দেয় যে প্রতিপক্ষের কোনো গুণই আমাদের চোখে পড়ে না, বরং তার গুণগুলোকেও শয়তান বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে আমাদের সামনে ত্রুটি হিসেবে উপস্থাপন করে।

আমরাও শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সর্বত্র তার ত্রুটি ছড়াতে থাকি। এমনকি যার পেছনে আমরা এসব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকি, বেইনসাফপূর্ণ আচরণ করি, বেশির ভাগ সময় দেখা যায় সে আমাদের আত্মীয়, বন্ধু বা কাছের মানুষই হয়।

অথচ মহান আল্লাহ শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ করার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও।

কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৮)
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শত্রুর ক্ষেত্রেও সুবিচার করতে হয়। অতএব আপনজন, প্রতিবেশী, সহকর্মী বা বন্ধুদের একটি ভুলের কারণে তাদের সব ভালো দিক অস্বীকার করা, তাদের সব ভুলকে ভুল হিসেবে প্রচার করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।

মানুষের মধ্যে ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কারণ মহান আল্লাহ মানবজাতিকে দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৮)

দুর্বলতার মানেই হলো মানুষের ভুল হয়ে যাওয়া, সীমাবদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক। তাই একজন মানুষের একটি ত্রুটিকে সামনে এনে তার সব গুণকে অন্ধকারে ফেলে দেওয়া, তার সারা জীবনের অবদানগুলো ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।

প্রতিটি মানুষের মধ্যেই দোষ-গুণ থাকবে, এর মধ্যেই নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে চলতে হবে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীর প্রতি বিদ্বেষ-ঘৃণা পোষণ করবে না; (কারণ) তার কোনো চরিত্র অভ্যাসকে অপছন্দ করলে তার অন্য কোনোটি (চরিত্র-অভ্যাস) সে পছন্দ করবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৫৪০)

এই হাদিসটি স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে হলেও অন্য মানুষের প্রতি একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিরও শিক্ষা দেয়। একজন মানুষের মধ্যে যেমন ত্রুটি থাকতে পারে, তেমনি অসংখ্য গুণও থাকতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। তাই নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সেই গুণগুলোও স্মরণ করতে হবে। তার অবদানগুলোর কথা স্মরণ করলে বিদ্বেষ অনেকাংশে কমে যাবে ইনশাআল্লাহ।

তা ছাড়া মানুষের অবদান মনে রেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও ঈমানের অংশ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। অথবা যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও অকৃতজ্ঞ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮১১)

অতএব কারো কাছ থেকে পাওয়া দু-একটি কষ্টের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তার শত শত উপকার ভুলে যাওয়া কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। এটা নিছক হিংসা ও ক্ষোভ। যা মানুষকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা অপবাদ দিতে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যের চরিত্র ও সফলতা হরণের মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত করে।

অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে কারো ওপর অপবাদ দেওয়া তো দূরের কথা, তার মধ্যে বাস্তবে কোনো দোষ থাকলেও তা ব্যাপকভাবে প্রচার করার ব্যাপারে অনুৎসাহ দিয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫৪৪)

এটি অবশ্য সেই ক্ষেত্রে, যেখানে কারো গোপন পাপ ঢেকে রাখলে সমাজের ক্ষতি বা অন্যের অধিকার নষ্ট হয় না। কিন্তু শত্রুতার জেরে মানুষের ব্যক্তিগত দুর্বলতা, ভুল বা অতীতের ত্রুটি প্রচার করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।

এমনকি কাউকে হেয় করার জন্য তার দোষত্রুটি অনুসন্ধান করাও নিষেধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাক। ধারণা বড় মিথ্যা ব্যাপার। তোমরা দোষ তালাশ কোরো না, গোয়েন্দাগিরি কোরো না, পরস্পর হিংসা পোষণ কোরো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ কোরো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না; বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।’  (বুখারি, হাদিস : ৬০৬৪)

অন্য হাদিসে আরো কঠোর ভাষায় মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে সেসব লোক, যারা শুধু মুখে ঈমান এনেছে কিন্তু অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের গিবত করবে না ও দোষত্রুটি তালাশ করবে না। কারণ যারা তাদের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে আল্লাহও তাদের দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ কারো দোষত্রুটি তালাশ করলে তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপদস্থ করে ছাড়বেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৮০)

মহানবী (সা.) এসব কাজ কতটা অপছন্দ করলে বলেছেন যে, যারা মুখে ঈমান এনেছে, কিন্তু তা অন্তরে প্রবেশ করেনি! বোঝা গেল, অন্যের দোষচর্চা করে বেড়ানো, অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করা ঈমানবিরোধী কাজ।

অন্যের বিনাশ কামনা কখনোই ঈমানের পরিচয় হতে পারে না। বরং যারা অন্যের কল্যাণ চায়, তারাই মুমিন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩)

অর্থাৎ একজন মুমিনের অন্তরে মানুষের জন্য শুভ কামনা থাকবে। কারো মধ্যে সত্যিই যদি দোষত্রুটি থাকে, সে ওই লোকটার অপমান চাইবে না, বরং সে চাইবে যে লোকটা সংশোধিত হোক। তাকে সংশোধন করার প্রয়াসে নেওয়া পদক্ষেপগুলো হবে গঠনমূলক ও কল্যাণকামী মনোভাব নিয়ে।

জীবনে চলার পথে আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা সহকর্মীর সঙ্গে মনোমালিন্য হতেই পারে। তাই বলে তাদের সব অবদান ভুলে গিয়ে তাদের ক্ষতি করার জন্য আদাজল খেয়ে নেমে পড়া মুসলমানের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং এ রকম পরিস্থিতিতে রাগ সংবরণ করে ক্ষমা করে দেওয়া ঈমানের দাবি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩৪)

মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ সবার অন্তরের খবর জানেন। মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ, কথাবার্তা, কাজকর্ম ফেরেশতারা লিখে রাখেন। কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে নিজ নিজ কর্মের হিসাব দিতে হবে।

মহান আল্লাহ সবাইকে অতিরিক্ত রাগ, ক্ষোভ, হিংসার বশবর্তী হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক ঘৃণ্য কাজ করা থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যে তিন শ্রেণির মানুষ বিশেষ সম্মানের অধিকারী

মুফতি দিদার হুসাইন
যে তিন শ্রেণির মানুষ বিশেষ সম্মানের অধিকারী
সংগৃহীত ছবি

ইসলামে মানুষের সম্মান শুধু সামাজিক শিষ্টাচার নয়; বরং এটি ঈমান ও আল্লাহভীতিরই প্রতিফলন। পবিত্র হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহকে সম্মান করার একটি অংশ হলো, বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করা, কোরআন ধারণকারীকে সম্মান করা এবং ন্যায়পরায়ণ শাসককে সম্মান করা। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৪৩)

এ হাদিসে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে, এই তিন শ্রেণির মানুষকে সম্মান করা মূলত আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই অংশ। নিম্নে এই তিন শ্রেণির বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে তুলে ধরা হলো—

বয়োজ্যেষ্ঠ মুসলিম : পবিত্র হাদিসে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্মান করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হাদিসের ভাষ্য মতে, আল্লাহ তাআলার প্রতি ভক্তি-সম্মান প্রদর্শনের দাবি হলো মজলিস-বৈঠকে প্রবীণ ও বয়স্ক মুসলিমদের সম্মানজনক স্থানে বসানো, তাঁদের প্রতি ভক্তিপূর্ণ আচরণ করা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাঁদের যথাযথ সেবাযত্ন করা। যেমন—হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে দেওয়া, যানবাহনে উঠতে সাহায্য করা, অজু-ইস্তিঞ্জায় সহজতার প্রতি লক্ষ রাখা ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে আমাদের ছোটদের দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (তিরমিজি, হাদিস : ১৯২০, আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)

এটি প্রমাণ করে যে বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা ইসলামী চরিত্রের মৌলিক একটা অংশ।

বর্তমান সমাজের অনেক জায়গায় দেখা যায়, তরুণরা বড়দের কথা শোনে না, অসম্মানজনক আচরণ করে এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয় না। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বড়দের প্রতি সেই আগের মতো শ্রদ্ধাবোধ অনেকটাই কমে গেছে। ফলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে।

আলেম তথা কোরআনধারী ব্যক্তি : যাঁরা মহাগ্রন্থ আল কোরআনের জ্ঞান ধারণ করেন ও তা প্রচার করেন, মহান আল্লাহর দরবারে তাঁদের বিশেষ সম্মান রয়েছে। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে (আলেমগণ), তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করেন।’ (সুরা : আল-মুজাদালা, আয়াত : ১১)

হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কোরআন শেখে এবং শেখায়। (বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)

অন্য হাদিসে এসেছে, আলেমরা নবীগণের উত্তরাধিকারী। (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৮২)

আলেমদের সম্মান করা মানে দ্বিনের আলোকে সম্মান করা। কারণ তাঁরা নবীদের উত্তরাধিকারী। আলেমদের অবমাননা করা মূলত ইলম ও শরিয়তের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করা।

বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে আলেম ও কোরআনধারী ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় না। কেউ কেউ দ্বিনি জ্ঞানকে ছোট করে দেখে বা সামাজিকভাবে তাঁদের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। অথচ সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশনার মূল ভিত্তিই তাঁরা। এই অবমূল্যায়ন সমাজে দ্বিনি চেতনা দুর্বল করে দিচ্ছে।

ন্যায়পরায়ণ শাসক : যে শাসক জনসাধারণের মধ্যে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে, নিজেও কারো প্রতি জুলুম করে না, জনগণকেও পারস্পরিক জুলুম-নিপীড়ন থেকে বিরত রাখে, আল্লাহ তাআলার কাছে তার মর্যাদা অপরিসীম। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাঁর ছায়ায় স্থান দেবেন, তাদের মধ্যে অন্যতম এক শ্রেণি হলো, ন্যায়পরায়ণ শাসক। (বুখারি, হাদিস : ৬৮০৬)

অন্য হাদিসে এসেছে : আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য বেশি উপকারী। (আল মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৫৭৮৭)

যে সমাজ বয়োজ্যেষ্ঠ, আলেম ও ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্বকে সম্মান করতে শেখে, সে সমাজেই নৈতিকতা, স্থিতি ও বরকত প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যেখানে এ সম্মান লোপ পায়, সেখানে নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা আমাদের ইসলামের সঠিক বুঝ দান করুন।