• ই-পেপার

গ্রাফিক ডিজাইনকে পেশা বানিয়ে উপার্জনের বিধান

মৃত্যু এমন নির্মম যাত্রা : আমলই যার একমাত্র সঙ্গী

মুফতি ওমর বিন নাছির
মৃত্যু এমন নির্মম যাত্রা : আমলই যার একমাত্র সঙ্গী
সংগৃহীত ছবি

মানুষ এই পৃথিবীতে নানা সম্পর্ক, স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পদের মোহে জীবন অতিবাহিত করে। কেউ পরিবার-পরিজনের সুখের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে, কেউ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে, আবার কেউ সম্মান ও মর্যাদার পেছনে ছুটে চলে। কিন্তু জীবনের এক চরম ও অবশ্যম্ভাবী সত্য হলো—মৃত্যু। যে মৃত্যুর হাত থেকে কোনো মানুষ, রাজা-বাদশাহ, ধনী-গরিব কিংবা শক্তিশালী ব্যক্তি রক্ষা পাবে না।

মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের সব দুনিয়াবি সম্পর্ক ও অর্জনের প্রকৃত মূল্য প্রকাশ পায়। তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই পৃথিবীতে যার জন্য মানুষ এত ব্যস্ত ছিল, তার অধিকাংশই মৃত্যুর পরে আর কোনো কাজে আসে না। এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরেছেন মহানবী (সা.)। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বস্তু মৃত ব্যক্তির পিছু পিছু (কবর পর্যন্ত) যায়—তার পরিবার-পরিজন, তার ধন-সম্পত্তি এবং তার কৃতকর্ম। তারপর দুইটি বস্তু ফিরে আসে—তার পরিবার-পরিজন এবং তার ধন-সম্পত্তি; আর একটি বস্তু তার সঙ্গেই থেকে যায়, আর তা হলো তার কৃতকর্ম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫১৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৬০)

ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের নির্মম বাস্তবতা
পরিবার মানুষের জীবনের সবচেয়ে আপন আশ্রয়। পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য মানুষ কত ত্যাগই না করে! কিন্তু মৃত্যুর পর এই প্রিয়জনদের ভালোবাসারও একটি সীমা আছে। তারা মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাবে, জানাজা পড়বে এবং কবর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। কিন্তু কবরের মাটিতে শুইয়ে দেওয়ার পর সবাই ফিরে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা : ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে তখন কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সন্তান পাশে থাকবে না। মানুষ একাই তার রবের মুখোমুখি হবে।

ধন-সম্পদের অসারতা
পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ সম্পদ অর্জনের জন্য জীবন ব্যয় করে। কখনো বৈধভাবে, কখনো অবৈধভাবে সম্পদ সঞ্চয় করে। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সম্পদের কোনো অংশই তার সঙ্গে যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের আমার নিকটবর্তী করতে পারবে না; বরং যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তারাই সফল হবে।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩৭)

কাফনের কাপড়ে কোনো পকেট থাকে না। মানুষ তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ, জমি, বাড়ি, ব্যবসা কিংবা ব্যাংক-ব্যালান্সের কিছুই সঙ্গে নিতে পারে না। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এগুলো উত্তরাধিকারীদের হাতে চলে যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ বলে, আমার সম্পদ, আমার সম্পদ। অথচ তার সম্পদ বলতে সে যা খেয়েছে ও শেষ করেছে, যা পরেছে ও পুরোনো করেছে, অথবা যা দান করেছে এবং তা নিজের জন্য সংরক্ষণ করেছে—এগুলোই তার প্রকৃত সম্পদ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৫৮)

একমাত্র চিরস্থায়ী সঙ্গী—আমল
কবরের অন্ধকারে, হাশরের ময়দানে এবং আল্লাহর আদালতে মানুষের একমাত্র সঙ্গী হবে তার আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তা-ও দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)

যদি মানুষের আমল হয় নামাজ, রোজা, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, মানুষের উপকার, সততা ও তাকওয়া—তবে সেই আমল কবরকে আলোকিত করবে এবং আখিরাতে মুক্তির কারণ হবে। অন্যদিকে জুলুম, মিথ্যা, সুদ, ঘুষ, হারাম উপার্জন, গিবত, অপবাদ ও অন্যায় কাজ যদি জীবনের সঙ্গী হয়, তবে সেই আমলই কবর ও আখিরাতের শাস্তির কারণ হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি সে-ই, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৯)

কোরআনের আলোকে পরকালের প্রস্তুতি
মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আখিরাতের সফলতা। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন চিন্তা করে, সে আগামী দিনের জন্য কী প্রেরণ করেছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজকের প্রতিটি কাজই আগামী জীবনের জন্য পুঁজি।

মৃত্যু এমন এক সত্য, যা প্রতিটি মানুষের দুয়ারে একদিন কড়া নাড়বে। সেই দিন আমাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব কিংবা ধন-সম্পদ কেউই আমাদের সঙ্গে থাকবে না। কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে একমাত্র সঙ্গী হবে আমাদের আমল। তাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ হলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে ডুবে না গিয়ে এমন আমল করা, যা মৃত্যুর পরও তার জন্য নূর, শান্তি এবং জান্নাতের পথপ্রদর্শক হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নেক আমলের মাধ্যমে কবর ও আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন। 

হাদিসের বাণী

আখিরাতে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট যেভাবে ভুলিয়ে দেয়া হবে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আখিরাতে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট যেভাবে ভুলিয়ে দেয়া হবে
সংগৃহীত ছবি

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন জাহান্নামিদের থেকে একজনকে উপস্থিত করা হবে, যে দুনিয়াতে সবচেয়ে সুখী ছিল। তখন তাকে জাহান্নামের মধ্যে ঢুকানো হবে, এরপর বলা হবে, হে বনি আদম, তুমি কি কখনো কল্যাণকর জিনিস দেখেছ? তোমার কাছে কখনো কি সুখের আসবাবপত্র এসেছে? সে বলবে, হে আমার রব, ওয়াল্লাহি! না। আর জান্নাতিদের থেকে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, যে জগতে সবচেয়ে দুঃখী ছিল। তাকে জান্নাতে একবার প্রবেশ করানোর পর বলা হবে, হে বনি আদম, তুমি কি দুনিয়াতে কখনো দুঃখ পেয়েছ? তোমার ওপর কি কোনো বিপদাপদ এসেছিল? সে বলবে, না, ওয়াল্লাহি! আমি দুনিয়াতে কোনো দুঃখ ও মুসিবতে পড়িনি এবং কোনো দুঃখ দেখিনি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭০৮৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৩১১২)

শিক্ষা ও বিধান

১. দুনিয়ার সুখ-দুঃখ ক্ষণস্থায়ী। মানুষ দুনিয়াতে যত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই ভোগ করুক, যদি তার শেষ পরিণতি জাহান্নাম হয়, তবে জাহান্নামের সামান্য শাস্তিও তার সমস্ত সুখকে ভুলিয়ে দেবে। অন্যদিকে, একজন মুমিন দুনিয়াতে যত কষ্টই ভোগ করুক, যদি তার গন্তব্য জান্নাত হয়, তবে জান্নাতের সামান্য নেয়ামতই তার সব দুঃখ-কষ্ট মুছে দেবে।

২. আখিরাতই প্রকৃত জীবন। তাই আসল সফলতা বা ব্যর্থতা দুনিয়ার অবস্থার ওপর নির্ভর করে না; বরং আখিরাতের পরিণতির ওপর নির্ভর করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আখিরাতের জীবনই হলো প্রকৃত জীবন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৪)

৩. আজ যারা দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, অপমান, নির্যাতন বা নানা বিপদে আক্রান্ত, তাদের জন্য এই হাদিস বিশাল সান্ত্বনার উৎস। কেননা একজন মুমিন যদি ঈমান ও তাকওয়ার ওপর অবিচল থাকে, তবে জান্নাতের এক মুহূর্তের সুখই তার জীবনের সব কষ্টকে তুচ্ছ করে দেবে।

৪. দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে প্রতারিত হওয়া উচিত নয়। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু মানুষ দুনিয়াতে অত্যন্ত সুখী, ধনী ও ক্ষমতাবান। কিন্তু বাহ্যিক সফলতা আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। যদি তারা ঈমান ও নেক আমল ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তবে তাদের দুনিয়ার সমস্ত সুখ কোনো উপকারে আসবে না।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, দুনিয়া চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং এটি আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। দুনিয়ার সুখ দেখে অহংকার করা এবং দুঃখ দেখে হতাশ হওয়া কোনোটিই মুমিনের কাজ নয়। কারণ জান্নাতের এক মুহূর্তের নেয়ামত পৃথিবীর সব কষ্টকে মুছে দেয়, আর জাহান্নামের এক মুহূর্তের শাস্তি পৃথিবীর সব সুখকে বিস্মৃত করে দেয়। তাই একজন বুদ্ধিমান মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাত লাভের জন্য আমল করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতমুখী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জুমার দিন যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিন যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মুসলমানদের জন্য জুমার দিন হচ্ছে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। হাদিসে জুমার দিনে করণীয় বেশকিছু আমলের কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ আমল হলো আল্লাহ তাআলার কাছে একাগ্রচিত্তে দোয়া করা। কারণ এটি দোয়া কবুলের দিন। এই দিনের দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসুল (সা.) হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন’। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪০০) 

তবে কোনো হাদিসে এসেছে, ‘সেই সময়টি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কর।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮) 
বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, জুমার দিন আসরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়। (জাদুল মাআদ, ২/৩৯৪)

তাই জুমার দিন বিশেষ করে আসর নামাজের পর দোয়া করা উচিত। যেকোনো দোয়াই করা যায়। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া তুলে ধরা হলো।

১. দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণ লাভের দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনইয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াকিনা আজাবান্নার।’ 
অর্থ : ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০১‍)


২. উত্তম জীবন যাপনের দোয়া

اَللَّهُمَّ اِنِّى أَسْألُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى 

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুক্বা ওয়াল আফাফা ওয়াল গেনা।’ 
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হেদায়াত কামনা করি এবং আপনার ভয় তথা তাকওয়া কামনা করি এবং আপনার কাছে নৈতিক পবিত্রতা কামনা করি এবং সম্পদ তথা সামর্থ্য ও সচ্ছলতা কামনা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২১, তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৮৯) 

৩. মা-বাবাসহ সকল মুমিনের জন্য দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ 

উচ্চারণ : ‘রব্বানাগ-ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।’ 

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে আপনি সেই দিন ক্ষমা করে দিবেন; যেই দিন হিসাব কায়েম করা হবে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উল্লেখিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার তাওফিক দান করুন। বিশেষ করে দোয়া কবুলের সময়গুলোতে বেশি বেশি পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যেভাবে জুমার নামাজের সূচনা হয়েছিল

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যেভাবে জুমার নামাজের সূচনা হয়েছিল
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের একটি মহান বিধান হলো জুমার নামাজ। এটি মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদ, সাপ্তাহিক মহাসমাবেশ এবং ঈমানি চেতনা নবায়নের এক অনন্য উপলক্ষ। প্রতি সপ্তাহে একদিন মুসলমানরা সব ব্যস্ততা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দুনিয়াবি কাজকর্ম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে আল্লাহর ঘরে সমবেত হয়। খুতবা শ্রবণ করে, নামাজ আদায় করে এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। কিন্তু এই মহিমান্বিত ইবাদতের সূচনা কীভাবে হয়েছিল? ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা এক চমৎকার ও শিক্ষণীয় অধ্যায় দেখতে পাই।

‘জুমা’ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য
আরবি ‘জুমুআহ’ (الجمعة) শব্দের অর্থ হলো—একত্র হওয়া, সমবেত হওয়া বা সংঘবদ্ধ হওয়া। যেহেতু এ দিনে মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য একত্রিত হয়, তাই দিনটির নাম রাখা হয়েছে ‘ইয়াওমুল জুমুআহ’ বা জুমার দিন। জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে এর শুদ্ধ উচ্চারণ ‘জুমুআহ’, যদিও ইমাম আ‘মাশ (রহ.) ‘জুমআহ’ উচ্চারণকেও গ্রহণ করেছেন। বাংলা ভাষায় প্রচলিত রূপ হলো ‘জুমা’। তবে নামের পার্থক্য থাকলেও এর মর্যাদা ও তাৎপর্য একই। (তাফসিরে রুহুল মাআনি : ১৪/৯৯, দরসে তিরমিজি : ২/১৯২)

জাহেলি যুগে শুক্রবারের নাম
ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবরা শুক্রবারকে ‘ইয়াওমুল আরুবা’ নামে চিনত। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর অন্যতম পূর্বপুরুষ কাব ইবনে লুয়াই সর্বপ্রথম এ দিনের নাম পরিবর্তন করে ‘ইয়াওমুল জুমুআহ’ রাখেন। তিনি প্রতি শুক্রবার কুরাইশদের সমবেত করতেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন। এ ঘটনা ঘটেছিল মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাবের প্রায় পাঁচ শত ষাট বছর পূর্বে। সেই সময় থেকেই দিনটি সমাবেশ ও সম্মিলনের দিনের পরিচয় লাভ করে। আর কাআব ইবনে লুয়াই ছিলেন মহানবী (সা.)-এর পূর্বপুরুষদের অন্যতম। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, পৃ : ১৩৭১)

জুমার গুরুত্ব
ইসলামে জুমার মর্যাদা এতই মহান যে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরার নামই রেখেছেন ‘সুরা জুমুআহ’। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’(সুরা : জুমুআহ, আয়াত : ৯)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, জুমা শুধু একটি নামাজ নয়; বরং এটি আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত একটি মহান ইবাদত।

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা
হিজরতের পর মহানবী (সা.) প্রথমে কুবা এলাকায় কয়েক দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে বনি সালেম ইবনে আউফ গোত্রের উপত্যকায় পৌঁছলে জোহরের সময় হয়ে যায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। মহানবী (সা.) সেখানে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে জুমার খুতবা প্রদান করেন এবং জুমার নামাজ আদায় করেন। ইতিহাসে এটিই মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা হিসেবে স্বীকৃত। আর এই ঘটনাই ইসলামী ইতিহাসে জুমার নামাজের বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য হয়। এরপর থেকে মুসলমানদের জন্য জুমার নামাজ একটি ফরজ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়। (দরসে তিরমিজি : ২/১৯২, মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫১৪৪)

মদিনায় জুমার প্রাথমিক চর্চা
মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পূর্বেই সেখানে বসবাসকারী আনসার সাহাবিরা সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিনে একত্রিত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করেন। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বর্ণনা করেন, আনসারগণ আলোচনা করলেন—ইহুদিদের জন্য শনিবার এবং খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার নির্ধারিত রয়েছে, যেদিন তারা সমবেত হয়। অতএব মুসলমানদেরও একটি নির্দিষ্ট দিন থাকা উচিত, যেদিন সবাই একত্র হয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে।

এভাবে জুমার নামাজ ইসলামের অন্যতম মহান নিদর্শন এবং মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক সমাবেশ হয়ে উঠে। এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাসে। আনসার সাহাবিদের আগ্রহ, তাদের ঐক্যবদ্ধ চিন্তা এবং সর্বোপরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে বনি সালেম গোত্রের উপত্যকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমার মাধ্যমে এ মহান ইবাদতের যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে কোটি কোটি মুসলমান প্রতি শুক্রবার আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মসজিদে সমবেত হচ্ছেন।

জুমা আমাদের শেখায়—ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, আল্লাহর স্মরণ এবং ইসলামের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত জুমার মর্যাদা উপলব্ধি করা, এর আদব ও সুন্নতসমূহ যথাযথভাবে পালন করা এবং এই বরকতময় দিনকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার মর্যাদা উপলব্ধি করে যথাযথভাবে তা আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।