• ই-পেপার

নগদবিহীন অর্থনীতি এবং বাস্তবতা

  • নিরঞ্জন রায়

ডিজিটাল যুগে মানুষের অস্থিরতা ও মনোজগতের পরিবর্তন

ড. শাহরীনা আখতার

ডিজিটাল যুগে মানুষের অস্থিরতা ও মনোজগতের পরিবর্তন

আজকের পৃথিবীকে অনেকে ‘হাইপারকানেক্টেড ওয়ার্ল্ড’ বা ‘অতিসংযুক্ত বিশ্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তথ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের অভূতপূর্ব বিস্তার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তার ভেতরে তৈরি করেছে এক নতুন ধরনের মানসিক চাপ ও অস্থিরতা। ইতিহাসে পরিবর্তন সব সময় ছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো এত দ্রুত, এত ধারাবাহিক এবং এত সর্বব্যাপী পরিবর্তন আগে কখনো দেখা যায়নি। এই পরিবর্তনের ভেতরে মানুষ ক্রমেই নিজের মনোজগতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে—এটিই আজকের সবচেয়ে বড় সামাজিক বাস্তবতা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার গত দুই দশকে প্রায় ২৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ ও অনিদ্রাজনিত সমস্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগে এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, উন্নয়ন কি সত্যি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাচ্ছে, নাকি তা নতুন সংকট তৈরি করছে?

প্রযুক্তি বিপ্লব ও মনোযোগের সংকট : স্মার্টফোন, সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আজ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গড়ে একজন মানুষ দিনে চার থেকে ছয় ঘণ্টা সময় মোবাইল বা ডিজিটাল স্ক্রিনে ব্যয় করছে—এমন তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এই ধারাবাহিক তথ্যপ্রবাহ, নোটিফিকেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্ট মানুষের মনোযোগের স্বাভাবিক গঠনকে বদলে দিচ্ছে।

স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, মস্তিষ্ক স্বল্পমেয়াদি ‘ডোপামিন রিওয়ার্ড’ অর্থাৎ দ্রুত আনন্দের প্রতি ক্রমেই বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা, গভীরভাবে চিন্তা করা বা ধৈর্য ধরে কোনো কাজ সম্পন্ন করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। একে অনেক গবেষক ‘অ্যাটেনশন ফ্র্যাগমেন্টেশন’ বা খণ্ডিত মনোযোগ সংকট হিসেবে উল্লেখ করছেন। ফলে আমরা একদিকে তথ্য বেশি জানছি, কিন্তু গভীরভাবে বোঝার ক্ষমতা হারাচ্ছি। এই দ্বন্দ্বই আধুনিক মানুষের মানসিক অস্থিরতার একটি মৌলিক উৎস।

সামাজিক মাধ্যম ও তুলনার অদৃশ্য চাপ : সামাজিক মাধ্যম আজ শুধু যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি এক ধরনের ‘সামাজিক প্রদর্শন মঞ্চ’। এখানে মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সফল বা আকর্ষণীয় অংশটিই উপস্থাপন করে। কিন্তু দর্শক সেই সাজানো বাস্তবতার সঙ্গে নিজের অসম্পূর্ণ বাস্তবতাকে তুলনা করতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার আত্মসম্মানবোধ কমিয়ে দিতে পারে এবং এফওএমও (ফিয়ার অব মিসিং আউট) বা পিছিয়ে পড়ার ভয় তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যেখানে মানুষ নিজের জীবনকে ‘কম সফল’ মনে করতে শুরু করে। এই তুলনার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হতাশার জন্ম দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চাপ অনেক সময় ব্যবহারকারী নিজেও সরাসরি বুঝতে পারেন না, কিন্তু তাঁর আচরণ ও মানসিক অবস্থায় এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শিক্ষা, প্রতিযোগিতা ও শৈশবের চাপ : বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ফলাফলনির্ভরতা। পরীক্ষার নম্বর, গ্রেড এবং র‌্যাংকিংকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। ইউনেসকো ও বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা শিশুদের সৃজনশীলতা ও মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শৈশব থেকেই যখন সাফল্যের মানদণ্ড শুধু ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন শেখার আনন্দ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। শিশু শেখে ‘চাপের মধ্যে সাফল্য অর্জন’ করতে, কিন্তু ‘অন্বেষণের মাধ্যমে শেখা’ কমে যায়। এই মানসিক কাঠামো পরবর্তী সময়ে কর্মজীবনেও অস্থিরতা ও অতিরিক্ত চাপ গ্রহণের প্রবণতা তৈরি করে। ফলে শিক্ষা আর শুধু জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র থাকে না, এটি এক ধরনের মানসিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।

তথ্যের অতিভার ও সিদ্ধান্তহীনতা : বর্তমান যুগকে তথ্যের যুগ বলা হলেও এর একটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের অতিভার। প্রতিদিন মানুষ অসংখ্য সংবাদ, মতামত, ভিডিও ও বিশ্লেষণের মুখোমুখি হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত তথ্য মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হয়, মানসিক ক্লান্তি অনুভব করে এবং এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে থাকে।

বাস্তব জীবনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীর। ফলে সেটি অনেক সময় বিরক্তিকর মনে হয়। এই মানসিক পরিবর্তনের কারণে ভার্চুয়ালজগৎ যত বেশি আকর্ষণীয় হচ্ছে, বাস্তব জীবন তত বেশি জটিল ও অসহনীয় মনে হচ্ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা মানুষের ভেতরে এক ধরনের স্থায়ী অসন্তোষ তৈরি করছে, যা আধুনিক অস্থিরতার আরেকটি বড় কারণ।

অস্থিরতা একক নয়, জটিল বাস্তবতা : মানুষের এই অস্থিরতা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। এটি প্রযুক্তি, শিক্ষা, সামাজিক কাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং জীবনযাত্রার সমন্বিত ফলাফল। আধুনিক সভ্যতা যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি মানসিক ভারসাম্যের ওপর নতুন চাপও সৃষ্টি করেছে। তবে এই বাস্তবতা অপরিবর্তনীয় নয়। গবেষণায় দেখা যায়, ডিজিটাল ডিটক্স, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, মনোযোগ প্রশিক্ষণ এবং সচেতন প্রযুক্তি ব্যবহার মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। প্রযুক্তি বা আধুনিকতা নয়, বরং আমরা কিভাবে এর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছি, সেটিই নির্ধারণ করবে আমাদের মানসিক ভবিষ্যৎ। আজকের মানুষ তাই শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং নিজের মানসিক স্থিতিরও রক্ষক। এই দায়িত্ব যত দ্রুত আমরা বুঝতে পারব, ততই অস্থির সময়ের ভেতরেও কিছুটা স্থিরতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে করণীয় ও নীতিগত সুপারিশ : সাম্প্রতিক স্নায়ুবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল আচরণ বিষয়ক গবেষণায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় জীবনযাত্রাভিত্তিক আচরণগত পরিবর্তন সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, দৈনন্দিন স্ক্রিন ব্যবহার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমাতে পারলে মাত্র দু-তিন সপ্তাহের মধ্যেই উদ্বেগজনিত চাপ এবং ঘুমের মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়।

মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা আমাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণা বলছে, নিয়মিত মনোযোগ অনুশীলন বা ধ্যানজাতীয় অভ্যাস এই অংশের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অল্প সময়, প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট নিঃশব্দে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দিলে মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। এ ছাড়া প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে অন্তত দুই ঘণ্টা প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটালে শরীরের কর্টিসল নামক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে মানসিক চাপ হ্রাস পায় এবং আবেগীয় স্থিতিশীলতা বাড়ে।

ঘুমের নিয়মানুবর্তিতা বা নির্দিষ্ট সময়সূচি মানসিক সুস্থতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যাদের ঘুম-জাগরণের একটি স্থির রুটিন থাকে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রেও এখন বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং মনোযোগ স্বাস্থ্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে ‘ডিজিটাল বিরতি’ বা নির্দিষ্ট সময় পর পর পর্দা থেকে দূরে থাকা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

সব মিলিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে, মানসিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের উপায় আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যেই নিহিত। সচেতন জীবনযাপন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর ও সহকারী অধ্যাপক ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে অক্টোবর বিপ্লব : ইতিহাসের ফিরে ফিরে আসা...

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে অক্টোবর বিপ্লব : ইতিহাসের ফিরে ফিরে আসা...

ইতিহাস সোজা পথে হাঁটে না কখনো, বরং চক্রাকারে ঘোরে, ঘড়ির কাঁটার মতোই একসময় ফিরে আসে ঠিক একই বিন্দুতে। নির্মমভাবে ফিরে আসে একই সত্যে—শোষিতের অধিকারের লড়াই শাসকের সিংহাসন নাড়িয়ে দেয়। বারবার...একাদশ শতাব্দীর বাংলার কৈবর্ত বিদ্রোহ আর বিংশ শতাব্দীর রুশ অক্টোবর বিপ্লব এই অমোঘ সত্যের জ্বলন্ত প্রমাণ। দুই ঘটনার মাঝে ৯০০ বছরের ব্যবধান, কিন্তু শোষণের কৌশল আর প্রতিরোধের আগুন একই।

কৈবর্তভূমি ১০৭১ : বৌদ্ধ পাল রাজা দ্বিতীয় মহিপালের শাসন ছিল লোভ ও অযোগ্যতার চরম উদাহরণ। খরায় খাজনা কম আসছে, রাজকোষ ফাঁকা। সমাধান কী? উর্বর বাংলার কৈবর্তদের ওপর খাজনা দ্বিগুণ করে চাপিয়ে দেওয়া! এই অঞ্চল ছিল উপমহাদেশের শস্যভাণ্ডার। শাসকরা বারবার এখানে লুটপাট করেছে, আর প্রান্তিক কৈবর্তরা হয়েছে শোষণের প্রধান শিকার।

রাজা দ্বিতীয় মহিপালের আরোপিত বাড়তি এই কর আদায়ে অনাগ্রহী ছিলেন স্থানীয় ভূস্বামীরা! দ্বিতীয় মহিপাল ভূস্বামীদের শিক্ষা দিতে জোর করে খাজনা আদায়ে বরকন্দাজদের পাঠান। অত্যাচার শুধু লুটপাটে সীমাবদ্ধ থাকেনি—হত্যা, অগ্নিসংযোগ, এমনকি নারী নির্যাতনের ঘটনাও বেড়ে যায়। প্রান্তিক বলেই হয়তো বা, কৈবর্ত রমণীদের সঙ্গে বারাঙ্গনার মতোই আচরণ করে পাল বাহিনী, ঠিক পাকিস্তানি বাহিনীর মতোই! এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন দিব্য। সপরিবারে গড়ে উঠল প্রতিরোধ!

দিব্যরই ভ্রাতুষ্পুত্র ভীম এই প্রতিরোধকে সত্যিকারের বিপ্লবে রূপ দিলেন। ভীম ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ মঠের বিশাল করমুক্ত জমি ছিনিয়ে নিয়ে কৈবর্তদের মধ্যে বিতরণ করলেন। রামশরণ শর্মা একে মধ্যযুগীয় ভারতের অন্যতম প্রথম সত্যিকারের ভূমি সংস্কার বলেছেন। রমেশচন্দ্র মজুমদারও স্বীকার করেছেন—এ ছিল স্থানীয় জনগণের স্বার্থে জমির মালিকানার পরিবর্তন। ভীম কোনো আদর্শের বুলি আওড়াননি। তিনি সরাসরি ব্রাহ্মণ আর বৌদ্ধ মঠের নিজস্ব জমি দিয়েছিলেন প্রান্তিক মানুষকে। আর সেই জমির আকাঙ্ক্ষায় কৃষক, জেলে, মাঝি—সব প্রান্তিক শোষিত মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

অবস্থা বেগতিক দেখে রাজা দ্বিতীয় মহিপাল এই বিদ্রোহ দমনে বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। প্রশিক্ষিত এই বিশাল পাল বাহিনীর বিরুদ্ধে সংখ্যায় ছোট হলেও কৈবর্ত বাহিনী অসাধারণ সাহস দেখায়। কৈবর্তদের কাছে লড়াইটা ছিল অস্তিত্বের লড়াই—১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধেরই মতো! অতঃপর কয়েক দশকের জন্য স্বাধীন কৈবর্তভূমি। কার্ল মার্ক্সের জন্মের শত শত বছর আগে বাংলাদেশে গঠিত হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের দেশ কৈবর্তভূমি। প্রথম প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্র!

পেট্রোগ্রাদ ১৯১৭ : ভ্লাদিমির লেনিন কৈবর্ত বিদ্রোহের কথা জানতেন কি না, জানা যায় না, কিন্তু তিনি ঠিক একই অস্ত্র ব্যবহার করলেন। ১৯১৭ সালের ৮ নভেম্বর ‘ল্যান্ড ডিক্রিজারি করে জমিদারি প্রথা ধ্বংস করে কৃষকদের হাতে জমি তুলে দিলেন। স্লোগান ছিল সহজ, কিন্তু আকর্ষক—শান্তি, জমি, রুটি। ভীমের বল্লম আর লেনিনের রাইফেলের মধ্যে শুধু যুগের ফারাক। কিন্তু কৌশল অভিন্ন—জমির মালিকানা হলো ক্ষমতা দখলের চাবিকাঠি। কিন্তু লেনিনের পরবর্তী ইতিহাস এক বড় বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকল মাত্র ৭৪ বছর।

লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিনেরকোলেক্টিভাইজািসয়া’র নামে কৃষকদের সেই জমি আবার কেড়ে নেওয়া হলো। লেনিনের ডিক্রি পুরোপুরি টিকেছিল মাত্র ১৩ বছর! অথচ মার্ক্স না পড়া অশিক্ষিত ভীম লিখিত দলিল রাখতে না পারলেও যত দিন স্বাধীন কৈবর্তভূমি টিকেছিল, তত দিন টিকেছিল প্রান্তিক কৈবর্তের ভূমির মালিকানা! এই দুই বিপ্লব প্রমাণ করে—শাসকশ্রেণি যতবার শোষকে পরিণত হয়, শাসিতের অধিকার ক্ষুণ্ন করে; ততবারই জনগণের মধ্যে নতুন দিব্য, নতুন ভীম বা নতুন লেনিন জন্ম নেয়। কখনো কখনো কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, কখনো বা ভেনেজুয়েলার হুগো শাভেজ...শুধু অধিকার আদায়ের লড়াইটা থামে না। কখনোই!

লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক

 

পূর্বমুখী কূটনীতি : জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন থেকে নতুন দিগন্ত

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার

পূর্বমুখী কূটনীতি : জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন থেকে নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য গৃহীত হয়, আবার কিছু সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনীতি ছিল দ্বিতীয় ধরনের একটি রাষ্ট্রদর্শনের অংশ। এটি শুধু চীন বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের একটি নীতি ছিল না, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একমুখী নির্ভরশীলতার গণ্ডি থেকে বের করে এনে একটি বহুমাত্রিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর কূটনৈতিক কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। আজ যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শ্রমবাজার ও কৌশলগত অংশীদারির নতুন দিগন্ত উন্মোচনের চেষ্টা করছেন, তখন সেই সফরকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বিচার করলে দেখা যায়—বাংলাদেশের পূর্বমুখী কূটনীতির যে বীজ জিয়াউর রহমান রোপণ করেছিলেন, বর্তমান সময়ে তা নতুন বাস্তবতার আলোকে আরো বিস্তৃত রূপ লাভ করছে।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান সব সময়ই তাকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দুই মেরুকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় বিভক্ত। এমন বাস্তবতায় একটি নবীন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই চ্যালেঞ্জকে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি আবেগের পরিবর্তে বাস্তববাদ, জাতীয় স্বার্থ এবং কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। হ্যান্স জে মরগেনথাও (১৯৪৮) যেমন বলেছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূলভিত্তি হলো জাতীয় স্বার্থ; কেনেথ ওয়াল্টজ (১৯৭৯) দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অরাজক চরিত্র রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে বাধ্য করে। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রদর্শন এই বাস্তববাদী তত্ত্বগুলোর সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তাঁর উপলব্ধি ছিল—বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ নয়। ফলে তিনি একই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব, মুসলিম বিশ্ব এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি, মাল্টিভেক্টর ফরেন পলিসি এবং স্ট্র্যাটিজিক ডাইভার্সিভিকেশন বলা হয়। এভলিন গুহ (২০০৫)-এর হেজিং স্ট্র্যাটেজি ধারণা অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখে। জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনীতি ছিল এই নীতির একটি অগ্রগামী প্রয়োগ।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীন ভবিষ্যতে একটি প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তিতে পরিণত হবে। ডেং শিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনাকালে চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের যে উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেন, তা শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি স্থাপন করেছিল। আজ বাংলাদেশের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে চীনের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি অনেকাংশেই সেই সময়ে নির্মিত হয়।

পূর্বমুখী কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং আসিয়ান অঞ্চলের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান সামনে রেখে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে এই উদীয়মান অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজারে পরিণত হয় এবং বিনিয়োগ ও শিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প সহযোগিতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে, তা পূর্বমুখী কূটনীতির ধারাবাহিকতাকেই নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রদর্শনের আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’-এর ধারণা। আর্নস্ট বি. হাস (১৯৫৮)-এর নিও-ফাংশনালিজম তত্ত্ব অনুসারে অর্থনৈতিক, কারিগরি ও সামাজিক সহযোগিতা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে। হাস এই প্রক্রিয়াকে স্পিলওভার ইফেক্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো যদি কৃষি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগে একসঙ্গে কাজ করে, তবে আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নের নতুন ভিত্তি গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি বহুপক্ষীয় কাঠামো কল্পনা করেছিলেন, যেখানে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোও সম্মিলিতভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক হবে সহযোগিতানির্ভর, একক প্রভাবনির্ভর নয়।

বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রবার্ট কিওহান ও জোসেফ নেই (১৯৭৭)-এর কমপ্লেক্স ইন্টারডিপেনডেন্ট তত্ত্ব আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁদের মতে, আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরের আলোচ্য বিষয়গুলো—বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শ্রমবাজার, শিক্ষা ও বাণিজ্য এই তত্ত্বেরই বাস্তব প্রতিফলন।

এই সফরের একটি বড় অর্জন হলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার প্রচেষ্টা। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, শিল্প বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

এ ছাড়া এই সফর বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকেও আরো সুদৃঢ় করেছে। বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের মধ্যে বাংলাদেশকে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শনের মূল শিক্ষা—জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই সফর সেই নীতিরই একটি বাস্তব প্রতিফলন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো আঞ্চলিক সংযোগ, উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ। মালয়েশিয়া ও চীন এই চারটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত করেছে। সঠিক কূটনৈতিক কৌশল, উন্নত অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

পরিশেষে বলা যায়, পূর্বমুখী কূটনীতি কোনো সাময়িক কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রকৌশলের একটি মৌলিক ভিত্তি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে খালেদা জিয়া সেই ধারার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যান। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই ধারাবাহিকতাকে নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। যদি এই সফরের সম্ভাবনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমাত্রিক ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ অব্যাহত রাখে, তবে পূর্বমুখী কূটনীতি আগামী দিনের বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র, কৌশলগত অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরো মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা

 

উদ্বৃত্ত শ্রম, দ্বৈত অর্থনীতি ও বাজেটের ফাঁদ

এম এম মুসা

উদ্বৃত্ত শ্রম, দ্বৈত অর্থনীতি ও বাজেটের ফাঁদ

১৯৫৪ সালে স্যার আর্থার লুইস যখন ‘ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট উইথ আনলিমিটেড সাপ্লাইজ অব লেবার’  শিরোনামে তাঁর ঐতিহাসিক প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন, তখন বিশ্বের কেউ ভাবেননি যে ৭০ বছর পরও দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ তাঁর সেই তত্ত্বের জীবন্ত পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করতে বসলে লুইসের দ্বি-পথ কাঠামো যেন দর্পণের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়।

লুইস বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে দুটি সমান্তরাল পথ থাকে। একদিকে থাকে ‘ঐতিহ্যবাহী পথ’—কৃষি, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, গ্রামীণ শ্রম, যেখানে প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা শূন্যের কাছাকাছি, কিন্তু মানুষ টিকে থাকে। অন্যদিকে থাকে ‘আধুনিক পথ’—কারখানা, রপ্তানিমুখী শিল্প, শহরের নতুন পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা যেখানে শ্রমের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এই দুটি পথের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনাই হলো উন্নয়নের মূল রহস্য বা সূত্র।

লুইস তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হলো ‘টার্নিং পয়েন্ট’, যখন ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হয়ে যায় এবং মজুরি বাড়তে শুরু করে। এই বিন্দু অতিক্রম করলে দেশটি প্রকৃত উন্নয়নের পথে প্রবেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা এই টার্নিং পয়েন্টের সামনে এসে থমকে আছি—এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু নীতিকাঠামো সেই সুযোগ ধরতে পারছে না।

দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৮ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত। তাদের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা শিল্প বা সেবা খাতের তুলনায় চার থেকে ছয় গুণ কম। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৫.৮ শতাংশ। লুইসের ভাষায়, এই বরাদ্দ ঐতিহ্যবাহী পথ আরো দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখবে।

বাজেটে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু এই বৃদ্ধির গঠন দেখলে লুইসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর উদ্বেগ জাগায়। বরাদ্দের বেশির ভাগ চলে যাচ্ছে বিদ্যমান বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের করছাড় ও প্রণোদনায়, কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নয়।

লুইস দেখিয়েছেন যে আধুনিক পথ শুধু তখনই ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে শ্রম আকর্ষণ করতে পারে, যখন সেখানে মজুরির পার্থক্য বজায় থাকে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি শ্রম সরবরাহের গতির চেয়ে বেশি হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে মাত্র পাঁচ থেকে সাত লাখ। বাকিরা কোথায় যাচ্ছে? তারা ভিড় করছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, রিকশায়, ফুটপাতে, মৌসুমি কৃষিতে—লুইসের ঐতিহ্যবাহী পথের গভীরে।

মানবপুঁজির রূপান্তরের পূর্বশর্ত পূরণ হচ্ছে কি? লুইসের তত্ত্বে একটি প্রায়-উপেক্ষিত দিক হলো ‘সক্ষমতা-সেতু’। শুধু শ্রম স্থানান্তরিত হলেই হয় না—সেই শ্রমকে আধুনিক পথে উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকতে হয়। এই সেতু না থাকলে শহরে মানুষ আসে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ে না।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য সহজ ঋণ, ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থার হয়রানি থেকে মুক্তি—এই তিনটি বিষয় অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক খাতের দিকে টেনে আনতে পারে। বাজেটে এর প্রতিফলন কোথায়? ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য করছাড়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু তা কার্যকর করার জন্য প্রশাসনিক সক্ষমতা তৈরিতে কোনো বিনিয়োগ নেই।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স একটি অনন্য মাত্রা যোগ করেছে, যা লুইস নিজে কল্পনা করেননি। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকরা মূলত ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে আসেন এবং তাঁদের পাঠানো অর্থ পরিবারের ভোগব্যয় বাড়ায়, কিন্তু উৎপাদনশীল বিনিয়োগ সব সময় হয় না। ভোগব্যয় অন্যভাবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে, কিন্তু টেকসই রূপান্তরে দ্রুত প্রভাব রাখে না।

লুইস দেখিয়েছেন, উন্নয়নের চালিকাশক্তি হলো একটি বিনিয়োগ চক্র : আধুনিক পথ মুনাফা করে, সেই মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ হয়, আরো মুনাফা আসে। এই চক্রের গতি বাড়াতে হলে আধুনিক খাতকে মুনাফা ধরে রাখার সুযোগ দিতে হবে—সেই সঙ্গে সেই মুনাফার উৎপাদনশীল খাতে পুনর্বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের করপোরেট ট্যাক্সের কাঠামো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কিছুটা পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে, কিন্তু বড় সমস্যা রয়ে গেছে—দেশীয় মুনাফার একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে বা বিদেশে চলে যাচ্ছে। পুঁজিপাচারের এই সমস্যার বিরুদ্ধে বাজেটে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেই। লুইসের বিনিয়োগচক্র তাই সম্পূর্ণ হচ্ছে না।

নারীশ্রমের রূপান্তর : লুইসের তত্ত্বের অপূর্ণ অধ্যায়—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সাফল্য মূলত নারীশ্রমের আধুনিক পথে প্রবেশের ফসল, এটি একটি সত্যিকারের লুইসীয় রূপান্তর। ৪০ লাখের বেশি নারী শ্রমিক ঐতিহ্যবাহী পথের গৃহস্থালি ও অনানুষ্ঠানিক কাজ ছেড়ে আনুষ্ঠানিক শিল্পে এসেছেন। এই রূপান্তর শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। 

স্যার আর্থার লুইস নোবেল বক্তৃতায় সতর্ক করেছেন, ‘উন্নয়নের কোনো স্বয়ংক্রিয় পথ নেই। প্রতিটি দেশকে তার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই সিদ্ধান্তগুলো এখন নিতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটি সন্ধিক্ষণের বাজেট। দেশের সামনে সুযোগ আছে লুইসের টার্নিং পয়েন্ট অতিক্রম করার। কিন্তু সে জন্য দরকার তিনটি জিনিস : আধুনিক খাতে কর্মসংস্থান সৃজন, মানবপুঁজিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক রূপান্তর।

লুইস একবার বলেছিলেন, ‘উন্নয়নের অর্থ হলো মানুষকে সুযোগ দেওয়া।’ বাংলাদেশের বাজেট সেই সুযোগের কাঠামো তৈরি করছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে নীতিনির্ধারকদের। সংখ্যার আড়ালে যে মানুষগুলো লুকিয়ে আছেন গ্রামের মাঠে, শহরের ফুটপাতে, কারখানার সারিতে—তাঁদের জীবনের গল্পই বলবে এই বাজেট সত্যিকারের উন্নয়নের বাজেট ছিল কি না।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক