ইসলাম ও মুসলমানের চিরায়ত বাংলায় আশ্চর্যজনকভাবে বিকশিত হয়েছে মরমিধারা। ফলে বাঙালি চেতনায় জেগে ওঠে মারফতি মুর্শিদি অনুরাগ।
বাঙালির লোকসংস্কৃতি ধারার আধ্যাত্মিক নিবেদন মারফতি মুর্শিদি সুফিবাদে পরিপুষ্ট; ‘মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু’ অর্থাৎ নিজেকে চেনার মাধ্যমে স্রষ্টাকে চেনা যায়। আরবি ‘আরাফা’ থেকে ‘মারফত’ অর্থ সৃষ্টিকর্তাকে চেনার রহস্যজ্ঞান। মারফতিতে স্রষ্টার প্রশংসা, তাঁকে পাওয়ার আকুলতা এবং পার্থিব জীবনের অনিত্যতা প্রকাশ পায়।
মুর্শিদি হলো আধ্যাত্মিক ভাবধারাসমৃদ্ধ বন্দনা। ‘মুর্শিদ’ অর্থ আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। মুর্শিদি নিবেদনে গুরুভক্তি এবং স্রষ্টার প্রতি গভীর ভালোবাসা লক্ষণীয়।
মুর্শিদি ধারা মানুষের মনকে পরিশুদ্ধ করে এবং মানবপ্রেমের শিক্ষা দেয়। মুর্শিদি ভবনায় সুফি তরিকায় আধ্যাত্মিক গুরু বা মুর্শিদকে পরম প্রভুর সান্নিধ্য লাভের মাধ্যম মনে করা হয়। এতে প্রায়ই গুরুর কৃপা প্রার্থনা ও তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণের বিষয়ে : নৌকা, নদী, মাঝি এবং মানবদেহকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়। আমাদের বনজঙ্গল, নদীরপার, ভাঙাঘাট, দরগা-মাজার, পোড়োবাড়ি, গাছতলায় আর হাটুরে, মাঠুরে, কোদালি, দোকানি ও মাঝির বৈঠায় মারফতি মুর্শিদি ভাবনা ধ্বনিত হয় একতারার সুরে সুরে।
এমনই মারফতি মুর্শিদি ধারার প্রতিনিধি মেঠো বাংলার সাধককবি আব্দুল হালিম জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বড়দোয়ালি গ্রামে। সাধনার সূচনা মাত্র সাত বছর বয়সে। তিনি ১৯৫৭ সাল থেকে বেতারে সরাসরি জড়িত। তিনিই লোকবাদ্যযন্ত্র সারিন্দাকে জনপ্রিয় হিসেবে পরিচিত করেন।
অজ্ঞাত অধ্যাত্ম ক্ষমতায় ওস্তাদ ছাড়াই তিনি সুর-সাধনায় পরিপক্বতা অর্জন করেন। তাৎক্ষণিকভাবেই তিনি সংগীত রচনা করতেন। আব্দুল হালিমের সৃষ্টিসম্ভার বেশ সম্মৃদ্ধ, সংখ্যায় তা পাঁচ-ছয় হাজারের মতো। পবিত্র কোরআনের সুরা বিশ্লেষণ করেও তিনি নিবেদন করেছেন আধ্যাত্মভাবনা। দেহতত্ত্ব, দেশাত্মবোধক, শরিয়ত, মারেফত, হকিকত, তরিকত ভবনাভরা তাঁর নিবেদন। মহান আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.), বড় পীর আবদুল কাদের জিলানি, খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-কে নিয়েও রয়েছে তাঁর রচনা। তাঁরই অনন্য মূর্ছনা :
‘সে যে গভীর জলে যায়গো চলে
কিনার দিয়ে আর চলে না।
ঝিনুকে মুক্তো হলে চুপ হয়ে যায়
মুখ খোলে না।
সাপের মাথায় হইলে মণি
থাকে না তার উলটা ফণি।
সেই মণিকে রক্ষা করা তার সাধনা...
...হরিণের নাভিমূলে মেশক্ হলে হালিম কয় সে ধরা দেয় না...
...প্রেমে আল্লাহ প্রাপ্ত হলে মানুষ কারো সাথে মিশতে চায় না...।’
সাধক আব্দুল হালিমের উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্ম :
‘এশকেতে এলাহি পাবি/প্রেমরসে থাক ডুবি...’
‘অমূল্য ধন বিক্রি করে/বিনামূল্যে পাবিরে/মারেফতের দেশে যদি যাবি।’
‘জ্ঞানের আয়না ভক্তির পায়রা/মুর্শিদ রূপে ছুরাত দেখো/স্বরূপে রূপ দেখতে চাইলে/ধ্যানের ঘর কর লক্ষ্য।’
‘উজান আর ভাটির লহর/দেখিলাম কতই মকর/পাইলাম না তাহার খবর/তবু কেন তাহারে খুঁজি।’
‘ধ্যান করিলে জ্ঞান বাড়িবে ঘুচিবে মনের অন্ধকার/স্বরূপে রূপের খেলা দেখবি যদি মন আমার।’
মানুষ অনন্ত সম্ভাবনার অপূর্ব সৃষ্টি। মানুষের মধ্যেই ঘরবসতি অধ্যাত্মবোধ ও মানবপ্রেম এবং দুর্ভেদ্য অদেখা সত্ত্বা। দূর অজানা সবকিছু আঁচ করতে পারে এ সত্ত্বা। কথিত আছে—সাধক হালিমের তখন গগনচুম্বী খ্যাতি। ঘরে তাঁর অসুস্থ পিতা। একদিন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে গেলেন পিতা আব্দুল জব্বার মোড়লের কাছে। তিনি বললেন ‘আমার শরীর ভালো না। আজ না গেলে হয় না।’
কবি হালিম বললেন, ‘আব্বা না গেলে আয়োজকের বাড়িতে হামলা হয় যদি...’ তখন তাঁর পিতা তাঁকে বিদায় জানালেন। এটাই পিতা-পুত্রের শেষ কথা। গান পরিবেশন করছেন তিনি। হঠাৎ সারিন্দার তার ছিঁড়ে গেল। তাঁর আর বুঝতে বাকি রইল না তাঁর আব্বা আর নেই। বাড়ি ফিরলেন তিনি। কাছেই নজরে এলো নতুন কবর। তখনই তাঁর উচ্চারণ
‘এই দেখিলাম সোনার ছবি
আবার যাইয়া দেখি নাই,
তুমি এমন করে ছেড়ে যাইবারে দয়াল
আগে জানি নাই...!’
সাধককবি আব্দুল হালিমের অবদানের জন্য তাঁকে ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। পেয়েছেন কবি জসীমউদ্দীন গবেষক স্বর্ণপদক। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ সালে মেঠো বাংলার সাধককবি আব্দুল হালিম নশ্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর