শৈশবে তিনি স্বপ্ন দেখতেন পাইলট হবেন। উড়োজাহাজ নিয়ে নীল আকাশে উড়বেন। বাবা ছিলেন বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তা। বাবার সূত্রেই উড়োজাহাজ নিয়ে ওড়ার স্বপ্ন তাঁকে নাড়া দেয়। তবে বাস্তবে উড়োজাহাজ নিয়ে আকাশে নয়, কম্পিউটারের মাধ্যমে সুবিশাল ডিজিটাল মার্কেটে বিচরণ করছেন। আজ তিনি ৩০০ মানুষের কর্মসংস্থানের কারিগর, যাঁরা দেশের জন্য আনছেন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।
এই তরুণের নাম মো. আসাদ আল হোসেন। ‘এনিমোশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তিনি। তাঁর এত দূর আসা মোটেও সহজ ছিল না। পদে পদে পোড়াতে হয়েছে কাঠখড়।
কম্পিউটারে হাতেখড়ি শৈশবে : অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্র ছিলেন আসাদ। কম্পিউটারে হাতেখড়ি শৈশবে। যখন বাংলাদেশে কম্পিউটারের প্রচলন খুব খুব কম, তখন থেকে তিনি আইবিএম ৪৪৬ ও ম্যাকিনটোশ ব্যবহার করেছেন। বাবার কাছ থেকে ডস (DOS) কোডিং এবং গ্রাফিকসের প্রাথমিক পাঠ নেন। দেশে তখন অনলাইন স্ট্রিমিংয়ে এত সহজে ভিডিও দেখার সুযোগ ছিল না। শুধু পার পে ক্লিকের মাধ্যমে সিএনএন অনলাইন স্ট্রিমিংয়ে ভিডিও দেখা যেত।
পিতাপুত্র মিলে ওই রিয়াল মিডিয়ার কোড ভাঙতে সক্ষম হলেন। ২০০৬-০৭ সালে তাঁরা বিডিটিভি (BDTV) নামের একটি পোর্টাল তৈরি করেছিলেন, যা খুব ধীরগতির (পাঁচ-ছয় কিলোবাইট স্পিডে) ইন্টারনেটেও নিউজ বুলেটিন স্ট্রিম করতে পারত।
প্রমো প্রডিউসার : ২০০৯ সালে লন্ডন স্কুল অব কমার্স থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন আসাদ। বসে যান বিয়ের পিঁড়িতে। ভাড়া বাসায় নতুন জীবন শুরু। সংসার চালাতে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকেন চাকরি। শুরুতে ‘মিডিয়া বক্স’ নামের একটি প্রোডাকশন হাউসে কাজ করেন। তারা মূলত ডকুমেন্টারি করত। পরে অ্যাড এজেন্সিতেও কাজ করেন। চাকরি হয়েছিল বিটিভিতে, কিন্তু বেতন কম এবং শেখার সুযোগ সীমিত বলে যাননি। তত দিনে ইন্টারনেট থেকে অনেক অ্যাডভান্স সফটওয়্যারের কাজে হাত পাকিয়ে ফেলেছেন আসাদ। অনেক টিভি চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে শুনলেন, ‘তুমি যে অ্যাডভান্স লেভেলের কাজ জানো, সেই সফটওয়্যার তো আমাদের নেই!’
২০১২ সালে আসাদের পেশাগত জীবন শুরু। চ্যানেল ২৪-এ প্রমো প্রডিউসার। সেখানে তিনি আফটার ইফেক্টস ও গ্রাফিকসের মাধ্যমে চ্যানেলের ব্র্যান্ডিং ও ট্রেইলার তৈরির কাজ করতেন। দক্ষতার কারণে অল্প দিনেই বেতন দ্বিগুণ করে প্রমো বিভাগের ইনচার্জ করা হয়েছিল তাঁকে।
বার্গার ও হতাশা : আসাদের একমাত্র কন্যার বয়স তখন ছয় কি সাত মাস। একবার বেড়াতে গিয়েছিলেন ফুফাতো ভাইয়ের বাসায়। একটি টেলিকমিউনিকেশন কম্পানির বড় কর্মকর্তা ফুফাতো ভাই মেয়ের জন্য দামি বার্গারের প্যাকেট নিয়ে ফেরেন। জানালেন, প্রতিদিন কন্যার জন্য এই বার্গার আনতে হয়। একটার দাম ৩০০ টাকা, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৯ হাজার টাকা। আসাদ ভাবলেন, বড় হলে মেয়েটাও তো খেতে চাইবে। কিন্তু এত টাকা কোথায় পাবেন?
ছাঁটাই আতঙ্ক : আসাদ ২০১৪ সালের দিকে দেখলেন, অফিসে কয়েকজন সিনিয়রের চাকরি চলে যাচ্ছে। পেশাগত জীবনের এই অনিশ্চয়তা তাঁকে অস্থির করে তোলে। শুরু হয় বিকল্প আয়ের সন্ধান। চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসার চেষ্টা করেন। পাবনা থেকে পেঁয়াজ-রসুন এনে কারওয়ান বাজারে বিক্রি করেছেন। নেটের ব্যাগ, পোশাকের ব্যবসাও করলেন, কিন্তু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কিছুই হয়নি।
পথ বদলে দিল এসইও : একদিন অফিসের কম্পিউটার সার্ভারে ‘ঝঊঙ’ নামের একটি ফোল্ডার পেলেন। সেখান থেকে তিন-চারটি টিউটরিয়াল দেখলেন। সিনিয়রদের কাছ থেকে এ সম্পর্কে জেনে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আগ্রহ জন্মায় আসাদের। তখন এ নিয়ে একটি টিউটরিয়াল সম্পন্ন করেন। বছরখানেক পর ভাবলেন, পেশাদার কারো কাছ থেকে শিখতে হবে, যিনি বাস্তবেই মাসে পাঁচ থেকে ১০ হাজার ডলার আয় করেন।
তালুকদার নামের একজনের সন্ধান পেলেন। ক্লাসে গিয়ে দেখলেন, তাঁরা ভিডিও এডিটিংয়ের যত কাজ দেখাচ্ছে, প্রায় সবই পারেন আসাদ। পরে স্ত্রীর সাদিয়া আফরোজের মাধ্যমে সাড়ে তিন লাখ টাকা লোন নিয়ে ভালো মানের একটি কম্পিউটার কিনে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন বাসার একটা রুমে।
প্রথম আয় মাত্র ২০ ডলার : অফিস থেকে এসে জবের জন্য রিকোয়েস্ট বা প্রপোজাল পাঠাতেন। দুই মাস পর প্রথম কাজ পেলেন। আপওয়ার্কে তাঁর প্রথম আয় ছিল মাত্র ২০ ডলার। পেমেন্ট এলো রাত সাড়ে ৩টায়। কী যে আনন্দ!
কিছুদিন পর ৩০০ ডলারের একটি বড় কাজ পেলেন। সেদিন ছিল মামাতো বোনের গায়েহলুদ। সেখানে না গিয়ে কাজ করতে লাগলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন আফটার ইফেক্টেসের কাজে হাত দেননি, ইন্টারনেটও স্লো, তাই বেশ হিমশিম খেতে হয়েছিল। তখন পাশে বসা বন্ধুর সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তবে শেষ অবধি নির্ধারিত সময়েই কাজ জমা দিতে পেরেছিলেন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ২০১৭-১৮ সালের দিকে টিম গড়তে শুরু করলেন। শুরুতে সঙ্গে ছিলেন দেলোয়ার ও জ্যাকি নামের দুই তরুণ।
পুরোদমে ফ্রিল্যান্সিং : ২০১৮ সালে চাকরি ছেড়ে পুরোদমে ফ্রিল্যান্সিংয়ে মন দিলেন আসাদ। প্রথম মাসেই আড়াই লাখ টাকা লোকসান সিপিএ মার্কেটিংয়ে। অনেকে ঠাট্টা করে বলত, ‘চাকরি ছেড়ে এখন দোকানে বসে টাইপিং করছে!’ কিন্তু তিনি দমে যাননি। তখন মিরপুরেই একটি যেনতেন অফিস নিলেন। সেকেন্ড হ্যান্ড কম্পিউটার কিনে কাজ শুরু করলেন। শুরুতে কর্মী ছিল ১০ জন। ক্রমে অফিস বড় হলো। পরে ‘এনিমোশন’ নামের একটি স্টুডিও গড়ে তোলেন।
টার্নিং পয়েন্ট : করোনার সময় চারদিকে সবার আয়-রোজগারে মন্দা, তবে আসাদের তা ছিল ‘টার্নিং পয়েন্ট’। অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবার বাসায় কম্পিউটার পাঠিয়ে দিলেন। তখন দিনরাত খেটেছেন কম্পানির বর্তমান সিইও নূর আলম নাহিদ ওরফে লোকি। ওই সময় দুই হাতে আয় করেছেন আসাদ। ব্যবসা এতটাই ভালো হয়েছিল যে মাস দশেকের মাথায় নিজের ফ্ল্যাটের জন্য ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে সক্ষম হন। বললেন, ‘আমার স্ত্রী সাদিয়া আফরোজ, বন্ধু তুষার ও লোকি পাশে না থাকলে এত দূর আসা সম্ভব হতো না।’
কী কাজ করেন : আসাদ এবং তাঁর সহকর্মীরা মূলত আমেরিকান দর্শকদের জন্য ডকুমেন্টারি ও এডুকেশনাল কনটেন্ট তৈরি করেন। এর মধ্যে আমেরিকান বডি ক্যাম্প ফুটেজ নিয়ে কাজ অন্যতম। আমেরিকার ৫৩টি রাজ্যে প্রতিদিন যেসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, সেগুলোর ফুটেজের জন্য আবেদন করেন। প্রতিটি স্টেটের আইন আলাদা, তাই এটা ট্র্যাক করার জন্য একটি বিশাল টিম ও সফটওয়্যার রেডি করেছেন। কোথাও অপরাধ ঘটলে সেই ডকুমেন্ট নিয়ে ফুটেজের জন্য আবেদন করেন। আসাদ বলেন, ‘এক্সক্লুসিভ ফুটেজ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। আমাদের মূল কাজ হলো আনকমন ও ফ্রেশ ফুটেজ খুঁজে বের করা। কারণ আমেরিকানদের এগুলো খুব পছন্দ। ফুটেজ পাওয়ার পর সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব ন্যারেটিভ বা গল্প তৈরি করি। আমাদের এখানে স্ক্রিপ্টিং হয়, ভয়েস ওভার দিয়ে এডিটিং ও এনিমেশন করা হয়। আমরা আমাদের নিজস্ব ফিলোসফি বা জার্নালিজম অ্যাঙ্গল থেকে ভিডিওগুলোকে সুন্দর করে সাজাই। এরপর সঠিক টাইটেল ও র্যাংকিং স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করে সেগুলো আপলোড করি। এভাবেই আমাদের অনেক চ্যানেল সফলভাবে চলছে।’
মানুষের ভালোবাসাই সম্পদ : আসাদ বললেন, ‘আগে ছিলাম গার্মেন্টস শ্রমিকের মতো, যত বেশি প্রোডাকশন তত ইনকাম। কিন্তু এখন আমার নিজস্ব প্রোডাক্ট, নিজস্ব চ্যানেল ও পোর্টাল আছে। ট্রিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রিতে এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেকে আরো ডেভেলপ করা, যাতে গুগল বা ইউটিউবের এই পরিবর্তনশীল গেমের মধ্যে টিকে থাকতে পারি।’
আসাদের লক্ষ্য ছিল মেধা খাটিয়ে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। আজ তিনি সফল। তাঁর স্টুডিও ‘এনিমোশন’ বিশ্ববাজারে দাপটের সঙ্গে কাজ করছে। মিরপুরে তিনটি অফিসে কাজ করছে তিন শতাধিক মানুষ। যে তরুণ একদিন বার্গার কেনা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, আজ তিনি ৩০০ সদস্যের বিশাল পরিবারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে মানুষের ভালোবাসাই তাঁর সম্পদ।