কিছু সংযোজন-বিয়োজনের পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হয়েছে। বাজেটের আকার হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি এবং বিদেশি উৎস থেকে এক লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে নির্দিষ্টকরণ বিল ২০২৬ পাসের মাধ্যমে বাজেটের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট পাসের প্রস্তাব উপস্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। বাজেট পাসের আগে সোমবার অর্থ বিল ২০২৬ সংসদে পাস হয়। এতে সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৬৪টি সংশোধনী গ্রহণ করা হয়। সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়কর হার ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে মঙ্গলবার বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে এবং নীতি সুদ হার অপরিবর্তিত রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ‘মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট’ (এমপিএস) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির লক্ষ্য আগামী ছয় মাসে ৬.৮ শতাংশ হারে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়বে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। কিন্তু জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চলমান ষাণ্মাসিকে সাড়ে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই লক্ষ্য কোনো মাসেই অর্জিত হয়নি। আগামী ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত ৬.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এদিকে নীতি সুদ হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির মতে, টানা চার বছর কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি। ফলে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বান্ধব জাতীয় বাজেটের সুফল অনেকটাই ম্লান হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলকে স্বাগত জানিয়েছে ডিসিসিআই। সংগঠনটি বলেছে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই তহবিলের সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
কিছু সমালোচনা সত্ত্বেও বাজেটে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাসহ জনকল্যাণে বহু অঙ্গীকার রয়েছে। আমরা আশা করি, সেসব বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

