নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মারিতের ছেলে মারিউস বর্গ হইবিকে দুটি ধর্ষণের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। সোমবার অসলো জেলা আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আনা আরও কয়েকটি গুরুতর অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে।
তবে চারটি ধর্ষণের অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে। তিন বিচারকের বেঞ্চ এই রায় দেন। রায় ঘোষণার সময় ২৯ বছর বয়সী হইবি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে শুনানিতে অংশ নেন। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষ তার জন্য সাত বছর সাত মাসের কারাদণ্ড চেয়েছিল। অন্যদিকে হইবির আইনজীবীরা সর্বোচ্চ ১৮ মাসের সাজা দাবি করেন। তারা জানিয়েছেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।
যদিও মারিউস হইবি নিজে রাজপরিবারের সদস্য নন, তবুও এই মামলার প্রভাব পুরো নরওয়েজিয়ান রাজপরিবারের ওপর পড়েছে। হইবির বয়স যখন চার বছর, তখন তার মা মেটে-মারিত নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্স হাকনকে বিয়ে করেন। এরপর থেকেই তিনি রাজপরিবারের পরিবেশে বড় হন। রায় নিয়ে রাজপ্রাসাদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং এ বিষয়ে তাদের আর কোনো বক্তব্য নেই।
এদিকে ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মারিত বর্তমানে ফুসফুসের জটিল রোগে ভুগছেন। সম্প্রতি তাকে ফুসফুস প্রতিস্থাপনের অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয়েছে। মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা উল্লেখ করে হইবির আইনজীবীরা একাধিকবার তাকে কারাগার থেকে মুক্তির আবেদন করেছিলেন। রায় ঘোষণার পরও তার আইনজীবী পেতার সেকুলিচ আবার মুক্তির আবেদন জানান। কিন্তু আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালতের মতে, অতীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এক নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করার নজির রয়েছে। ফলে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি রয়েছে।
সোমবার আদালতের বিচারক জন স্ভেরদ্রুপ এফিয়েস্তাদ প্রথমে রায়ের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। পরে তিনি ১২৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করেন। বিচারের সময় হইবি চারটি ধর্ষণের অভিযোগই অস্বীকার করেছিলেন। তবে আদালত দুটি ঘটনায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। এর একটি ঘটনা ২০১৮ সালে রাজপরিবারের স্কাউগুম এস্টেটে ঘটে। অন্যটি ২০২৪ সালে অসলোর এক নারীকে কেন্দ্র করে ঘটে। এ ছাড়া তিনি তার সাবেক প্রেমিকা ও পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব নোরা হাউকল্যান্ডের ওপর নির্যাতনের অভিযোগেও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আরেক নারী সঙ্গীকে গুরুতর শারীরিক ক্ষতি করার ঘটনাও প্রমাণিত হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে অসলোর অভিজাত ফ্রগনার এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই ফ্ল্যাটে বসবাসকারী নারীকে কেন্দ্র করেও নির্যাতন ও বেপরোয়া আচরণের কয়েকটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে আরো দুটি ধর্ষণের অভিযোগ থেকে হইবি খালাস পেয়েছেন। এর একটি অভিযোগ ছিল ২০২৪ সালের নভেম্বরে অসলোর একটি হোটেলে পরিচয় হওয়া এক নারীকে ঘিরে। অন্যটি ছিল ২০২৩ সালে লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জে ছুটি কাটানোর সময় পরিচয় হওয়া এক নারীকে নিয়ে।
রায়ের পর হইবির আইনজীবী পেতার সেকুলিচ বলেন, এ ধরনের মামলায় আপিল করা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। তার সহকর্মী আইনজীবী এলেন হোলাগার আন্দেনেস বলেন, যেসব অভিযোগে খালাস দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তারা সন্তুষ্ট। তবে রায়ের অন্য কিছু অংশ নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। এরপর দুই আইনজীবী অসলোর বাইরে ইলা কারাগার ও আটক কেন্দ্রে গিয়ে হইবির সঙ্গে দেখা করেন।
এই মামলায় মোট ছয়জন নারী ভুক্তভোগী হিসেবে ছিলেন। তবে রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন মাত্র একজন। হইবিকে ধর্ষণের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করার সময় ওই নারীকে কাঁদতে দেখা যায়। রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, ২০২৪ সালের মার্চে অসলোতে একটি পার্টির পর ওই নারী ঘুমিয়ে ছিলেন অথবা এমন অবস্থায় ছিলেন যে তিনি প্রতিরোধ করতে পারেননি। এর আগে তাদের মধ্যে সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক হয়েছিল। কিন্তু ওই ঘটনার সময় তার সম্মতি ছিল না।
এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ছিল হইবির নিজের ধারণ করা ভিডিও। পুলিশ তার মোবাইল ফোনে এসব ভিডিও খুঁজে পাওয়ার পর ভুক্তভোগীরা ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন। ফেব্রুয়ারিতে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এক নারী বলেন, তিনি পুরো ঘটনার সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি আদালতকে বলেন, 'আমি কখনোই এটা ঘটতে দিতাম না।' আদালতও একমত হয় যে ওই নারীর পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না। বিচারকরা আরো বলেন, ২০১৮ সালের ঘটনার সময় ওই নারী ঘুমিয়ে ছিলেন। তার পক্ষে হইবির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না। গত বছর তিনি জানতে পারেন যে হইবি পুরো ঘটনাটি ভিডিও করেছিলেন। মামলার ষষ্ঠ নারীকে ঘিরেও কয়েকটি অপরাধে হইবিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে ছিল নির্যাতন ও বেপরোয়া আচরণ। ওই নারী অসলোর ফ্রগনার এলাকায় থাকতেন বলে তাকে ‘ফ্রগনার নারী’ নামে পরিচিত করা হয়। আদালত রায়ে চারজন নারীকে মোট ৬ লাখ ৪০ হাজার ক্রোনার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে নোরা হাউকল্যান্ডও রয়েছেন। বিচারকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মামলায় তার নাম প্রকাশ করা যাবে।
এই রায় নিয়ে নরওয়েতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণের মামলায় প্রমাণের মান অত্যন্ত কঠোর হওয়ায় অনেক সময় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না বলে মনে করেন। অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী আনিয়া এমিলি ক্রুস যৌন সহিংসতা নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি এই বিচারের কিছু অংশে উপস্থিত ছিলেন। তার মতে, নরওয়ের সমাজের একটি অংশের মধ্যে ব্যাপক হতাশা রয়েছে। কারণ তারা মনে করেন ধর্ষণের মামলায় আদালত অনেক সময় ন্যায়বিচার দিতে পারছে না। তিনি বলেন, প্রমাণ অনেক শক্তিশালী না হলে বিচার পাওয়া যায় না। তিনি বিবিসিকে বলেন, নারীদের করা বেশির ভাগ ধর্ষণের অভিযোগ পুলিশ নথিভুক্ত করে রেখে দেয়।
সোমবার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি আদালতে বলেন, যেসব ধর্ষণের মামলা আদালত পর্যন্ত পৌঁছায়, তার প্রতি তিনটির একটি খালাসে শেষ হয়। তার মতে, এমন মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারা নারীরা একা নন। একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আরো অনেক নারী যেতে বাধ্য হন।
এদিকে রাজপরিবারবিষয়ক বিশ্লেষক ক্যারোলিন ভাগলে বলেন, এই মামলার কারণে রাজপরিবারের ভাবমূর্তি যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মারিতের স্বাস্থ্য। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। খ্যাতি ও জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ পেগি সিমচিচ ব্রনের মতে, রাজপরিবার এখন একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, হইবির ঘটনা যেকোনো পরিবারের জন্যই একটি ট্র্যাজেডি। রাজপরিবার এখন একদিকে আইনগত প্রক্রিয়াকে সম্মান জানাচ্ছে, অন্যদিকে এই ঘটনার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।