চন্দ্রবিন্দু ব্যান্ডের বিখ্যাত গান— ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’। বাংলা বলতে পারলে গানটা গাইতে গাইতে গোল উদযাপন করতে পারতেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। আজ যেভাবে মাঠে প্রত্যাবর্তন করেছেন তাতে গানটি গাইতেই পারতেন ৪১ বছর বয়সী তারকা।
জোড়া গোলে স্বরূপে ফিরলেও আফসোস কিছুটা হলেও থেকে গেছে রোনালদোর। সেই আক্ষেপ হচ্ছে অনেক সুযোগ পাওয়ার পরেও হ্যাটট্রিক না পাওয়া। কখনো নিজে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। আবার কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ান উজবেকিস্তানের গোলরক্ষক আব্দুভোহিদ নেমাতভের। তার ছন্দে ফেরার রাতে অবশ্য প্রতিপক্ষের জালে গোলোৎসব করেছে পর্তুগাল। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করা পর্তুগিজরা আজ উজবেকিস্তানের জালে দিয়েছে ৫ গোল। বিপরীতে একটিও হজম করেনি তারা।
গোল পাচ্ছিলেন না বলে সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছিলেন রোনালদো। প্রথম ম্যাচে নিজের ছায়া হয়ে থাকার পর তার মাত্রা আরও বাড়ে। তবে সমালোচনার জবাব কিভাবে দিতে হয় তা ভালোই জানা রোনালদোর। মুখে নয়, মাঠেই জবাব দেন তিনি। আজ হিউস্টন স্টেডিয়ামে আরেকবার সেই কাজটাই করলেন সিআর সেভেন। একটি নয় উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল পেয়েছেন তিনি।
প্রথম গোলটি করে রেকর্ড গড়েছেন রোনালদো। বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ৬ বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। তাতে পেছনে পড়েছে লিওনেল মেসির ৫ বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড। বিপরীতে ক্যামেরুন কিংবদন্তি রজার মিলারের (৪২ বছর ৩৯ দিন) পর বিশ্বকাপে গোল করা বয়স্ক ফুটবলারের কীর্তিও গড়েছেন তিনি। ৪১ বছর ১৩৮ দিনে গোলটি করেছেন ‘সিআর সেভেন’।
২ মিনিটেই লিড নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল পর্তুগাল। তবে বক্সের মধ্যে থেকে নেওয়া ব্রুনো ফার্নান্দেজের শট প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারের শরীরে লেগে কর্নার হয়। ৪ মিনিটে গোলখরা কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তবে নুনো মেন্দেসের ক্রসটায় যথাসময়ে পা লাগাতে পারেননি পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী।
তবে ষষ্ঠ মিনিটে ঠিকই জালের দেখা পেয়েছেন রোনালদো। জোয়াও কানসেলোর ক্রসটায় বুলেট গতির শট নেন তিনি। শটের পাওয়ারে যেন সমালোচনার জবাবই ছিল। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে টানা ১০ ম্যাচ পর গোল পাওয়া রোনালদোর উদযাপনটাও ছিল দেখার মতো।
নিজের ট্রেডমার্ক উদযাপন ‘সিউ’ করার পর শরীরী ভাষাতে সমালোচনার জবাবের ইঙ্গিত দিয়েছেন রোনালদো। ‘সিআর সেভেনের’ গোলের রেশ শেষ হতে না হতেই আরেকটি গোলে মাতে পর্তুগাল। এবার বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত ফ্রি কিকে গোল করেন মেন্ডেস। তার নেওযা ১৭ মিনিটের শটটি ঠেকানোর কোনো উপায়ই ছিল না গোলরক্ষক আব্দুভোহিদ নেমাতভের।
বিপরীতে ২৯ মিনিটে ব্যবধান কমিয়েছিল আজিজ ঘানিভ। তবে বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত গোলটি করলেও পরে বাতিল হয়ে যায়। ২০ গজ দূর থেকে করা গোলের আগে তার এক সতীর্থ কানসেলোকে ফাউল করায় ভিএআরে গোলটি বাতিল হয়।
অন্যদিকে নিঁখুত শটে জোড়া গোলের দেখা পান রোনালদো। ম্যাচের ৩৯ মিনিটে ফার্নান্দেজের পাস থেকে দারুণ ফিনিশিং করেন তিনি। তাতে বিশ্বকাপে পর্তুগালের সর্বোচ্চ গোলের (১০) মালিক হন ৪১ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। এর আগে প্রথম গোলটি করে কিংবদন্তি ইউসেবিওর (৯) পাশে বসেছিলেন তিনি।
বিরতিতে যাওয়ার আগে যোগ করা সময়ে হ্যাটট্রিকের দেখাও প্রায় পেয়েছিলেন রোনালদো। তবে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক বেরিয়ে আসায় চিপটা ভালো মতো নিতে না পারায় হ্যাটট্রিকটা পাওয়া হয়নি তার। ৩-০ ব্যবধানে অবশ্য ঠিকই বিরতিতে গেছে পর্তুগাল।
বিরতির পরে ৫৮ মিনিটে হ্যাটট্রিক পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন রোনালদো। তবে গোলরক্ষক সামনে এসে বাঁধা হয়ে দাঁড়ানো তা আর পাওয়া হয়নি। ৩০ গজ দূরে ফ্রি কিক পেয়েছিল পর্তুগাল। তবে শট না নিয়ে দৌড়ে ডি বক্সে ঢুকে পড়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দেন পর্তুগালের অধিনায়ক। ফার্নান্দেজের ভলি আনমার্কড অবস্থাতে পেয়ে শটও নিলেন তিনি। কিন্তু গোলরক্ষকের পায়ে লেগে কর্নার হয়।
সেই কর্নারেই চতুর্থ গোল পায় পর্তুগাল। মিডফিল্ডার ফার্নান্দেজের কর্নার ক্লিয়ার করার সময় উজবেকিস্তানের ডিফেন্ডার আব্দুকাদির খুচানভ শট নিলেন গোলরক্ষক আব্দুভোহিদ নেমাতভের শরীরে লেগে নিজেদের জালে বল জড়িয়ে যায়।
৭৪ মিনিটে আবার বড় ভুল করে বসেছিলেন নেমাতভের। শেষে অবশ্য দুর্দান্ত সেভ দিয়ে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন তিনি। গোল কিক নেওয়ার সময় রোনালদোর শরীর বরাবর শট নিলে বল পান পর্তুগিজ তারকা। তাতে দূরের পোস্টে শটও নিলেন তিনি। তবে ঠিক কোণা বরাবর না যাওয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে রোনালদোর হ্যাটট্রিক ঠেকিয়ে দেন তিনি।
৮৪ মিনিটে আরেকবার গ্লাভস হাতে দক্ষতার পরিচয় দিলেন নেমাতভ। বক্সের বাইরে থেকে দারুণ এক শট নিয়েছিলেন ফার্নান্দেজ। গোল লাইন যখন অতিক্রম করবে ঠিক তখনই বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে বলের গতিপথ রোধ করলেন উজবেকিস্তানের গোলরক্ষক।
পর্তুগালের শেষ গোলে অবশ্য কিছু করার ছিল না নেমাতভের। ৮৭ মিনিটে বক্সের মধ্যে থেকে ডান পায়ে কোণা বরাবর শট নেন রাফায়েল লিয়াও। তাতে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫-০। যোগ করা সময়ে তো ষষ্ঠ গোল হতে হতেও বেঁচে গেছে উজবেকিস্তান। ত্রিনকাওয়ের শট অল্পের জন্য জালে জড়ায়নি।
অন্যদিকে যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটেও হ্যাটট্রিকের সুযোগ পেয়েছিলেন রোনালদো। তবে ঠিক মতো জালে রাখতে পারলেন না শটটা। সবকিছু পাওয়ার ম্যাচে তাই ছোট্ট আক্ষেপ নিয়েই মাঠ ছাড়লেন তিনি।




