• ই-পেপার

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক : সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও কিছু ব্যক্তিগত ভাবনা

জামায়াতের দ্বৈত অবস্থানে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জামায়াতের দ্বৈত অবস্থানে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকদের মতে, দলটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের ইচ্ছাই নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐকমত্যের ওপর চাপ তৈরি করেও দ্রুত ক্ষমতার দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি কৌশলের ইঙ্গিত দেয়। এমনটাই মনে করছেন তারা। এই আলোচনা মূলত উঠে এসেছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যকে ঘিরে। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, সংস্কার এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা হতে পারে। 

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্যকে অনেকে গঠনমূলক রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখেন না; বরং এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি নবগঠিত বা স্থিতিশীলতা পুনর্গঠনের পথে থাকা সরকারকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সমালোচকদের আরেকটি মত হলো—জামায়াত একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলছে, আবার অন্যদিকে সরকারের প্রতি পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। তাদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান জাতীয় পুনর্মিলন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের পরিবর্তে নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাত ও চাপের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে, যা দ্রুত রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতাকেই উৎসাহিত করে।

জামায়াতের অবস্থান নিয়ে আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তাদের তুলনামূলক নীরবতা নিয়ে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ টানা হয়। সমালোচকদের দাবি, জামায়াত নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও ইসলামী সংহতির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করলেও, এমন কিছু নীতিগত ইস্যুতে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সংযত বা নীরব, যেখানে দেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা বা শিল্পখাতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই ‘নির্বাচিত প্রতিক্রিয়া’ তাদের বক্তব্য ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি করছে বলে তারা মনে করেন।

আরেকটি সমালোচনা উঠে এসেছে নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে। বিরোধীদের অভিযোগ, এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশে দলটি সুবিধা পেয়েছে যেখানে ভিন্নমতকে প্রায়ই “ফ্যাসিস্ট” বা সংস্কারবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের মতে, এই ধরনের লেবেলিংয়ের ফলে রাজনৈতিক বিতর্কের স্বাভাবিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গঠনমূলক সমালোচনা যথাযথ আলোচনা ছাড়াই বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

কারো কারো মতে, জামায়াতের প্রভাব কেবল দলীয় কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক, শিক্ষাগত, ধর্মীয় ও নাগরিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় সমমনা ও সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমেও তা বিস্তৃত। যদিও প্রতিটি রাজনৈতিক দলই নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তবে তাদের দাবি অনুযায়ী এসব নেটওয়ার্কের সম্মিলিত প্রভাব নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে এবং কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, যাদের অনেকেই জামায়াতের আদর্শিক অবস্থানের বিরোধী হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশ এখনো ‘রাস্তার রাজনীতি’, জনচাপভিত্তিক আন্দোলন এবং ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দৃশ্যমান কিছু অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক চাপের প্রবণতার প্রভাব মোকাবিলা করছে। ধারাবাহিক সরকারগুলো এসব প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বলেও তারা মনে করেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার সুযোগ করে দিচ্ছে।

এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে জামায়াতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। দলটি বিশ্বজুড়ে মুসলিম ইস্যুতে সরব থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত ভূমিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—যা জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে—সেসব বিষয়ে তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নেওয়া হচ্ছে বলে সমালোচকদের দাবি। তাদের মতে, মুসলিম স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে আরও ধারাবাহিক ও স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশিত।

তবে এই সমালোচনাগুলো সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য নাকি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার অংশ—তা একটি চলমান বিতর্কের বিষয়। তবুও উদ্বেগের বিষয় হলো, জামায়াতসহ সকল রাজনৈতিক শক্তির বর্তমান কৌশল গণতান্ত্রিক চর্চা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্থিতিশীলতার পরিবর্তে দ্রুত ক্ষমতার প্রতিযোগিতার দিকে ঝুঁকছে কি না, সেই প্রশ্ন।
একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা একটিই—দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে সংবিধান, প্রতিষ্ঠান এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতা বাড়লে তার চাপ পড়ে পুরো রাষ্ট্র কাঠামো ও গণতান্ত্রিক অর্জনের ওপর।

ফুটবলপাগল বাংলাদেশ কেন বিশ্বফুটবলে এত পিছিয়ে?

অদিতি করিম
ফুটবলপাগল বাংলাদেশ কেন বিশ্বফুটবলে এত পিছিয়ে?

বাংলাদেশজুড়ে এখন চলছে ফুটবল উন্মাদনা। রাতভর বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার উৎসব। গোটা দেশ যেন দুই ভাগে বিভক্ত, আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। অবশ্য এর বাইরেও কয়েকটি দলের সমর্থকও নেহাতই কম নয়। এমবাপ্পের ফ্রান্স, রোনালদোর পর্তুগাল, হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড, হাকিমির মরক্কো, চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানির সমর্থক আছেন অনেক। এবারের বিশ্বকাপে দুটি ড্র করে হইচই ফেলে দেওয়া ৬ লাখ মানুষের দেশ নবাগত কেপ ভার্দের বাংলাদেশি সমর্থক নিশ্চিতভাবেই সে দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে শহর থেকে গ্রামে বড় স্কিনে খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফুটবল খেলা দেখা। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের খেলার দিন টিএসসি চত্বর যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলে রূপ নেয়। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নয়, বিভিন্ন স্তরের মানুষ খেলা দেখতে আসেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এখানে খেলা দেখতে এসে আপনি মনে করতেই পারেন হয়তো কোনো স্টেডিয়ামে খেলা দেখছেন। লিওনেল মেসির বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড করার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে এসে খেলা উপভোগ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাসের মধ্যে রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসো বলেন, ‘আমি নিজের দেশের মতো অনুভব করছি। মনে হচ্ছে, আমি আর্জেন্টিনায় আছি।’ এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করা হয়। বড় পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা সব হলে। ঢাবি ছাড়াও সারা দেশে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপ উপলক্ষে চলে জমকালো আয়োজন। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়, এখন পাঁচতারকা হোটেল থেকে বিভিন্ন ক্যাফে এবং রেস্টুরেন্টে চলছে বিশ্বকাপের বিশেষ আয়োজন। বাসাবাড়িতেও বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাত জেগে খেলা দেখার ধুম পড়েছে। তরুণ-তরুণীরা তাদের পছন্দের দলের জার্সি গায়ে খেলা উপভোগ করেন। অনেকেই পুরো বিশ্বকাপের সময় পছন্দের জার্সি পরেই থাকেন। সারা বাংলাদেশ যেন ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকায় ছেয়ে গেছে। তার ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু ফ্রান্স, জার্মান ও পর্তুগালের পতাকা দেখা যায়। কয়েকটি গ্রাম তো আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকার সাজে সাজানো হয়েছে। এই দুই দলের সমর্থকরা দলের বিজয়ে মিছিল করেন। নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে মিষ্টি বিতরণ করেন। অনেকে আবার খেলা উপলক্ষে গরু খাসি কোরবানি দিয়ে সমর্থকদের আপ্যায়ন করেন। দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি এবং উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনাও ঘটছে। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় তো চলছে ট্রল আর কমেন্টের প্রতিযোগিতা।

বিশ্বকাপ যেন আমাদের সব ভুলিয়ে দিয়েছে দেড় মাসের জন্য। আমাদের চারপাশে অভাব অনটন, অনিশ্চয়তা, হতাশা আর উৎকণ্ঠা পাশে রেখে আমরা মেতে উঠেছি বিশ্বকাপ উন্মাদনায়। বিশ কোটি মানুষের এই দেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যিনি ফুটবল পছন্দ করেন না, কিংবা বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। এদেশের মানুষ ফুটবল পাগল। এই দেশে উৎসবের উপলক্ষ খুব কম। বিশ্বকাপ ফুটবল যেন আমাদের এক মহা উৎসবের আমেজ এনে দেয়।

কিন্তু ফুটবলপাগল এই দেশটি কখনো বিশ্বকাপ খেলেনি। বিশ্বকাপ তো দূরের কথা, স্বাধীনতার পর এশিয়া কাপ ফুটবল খেলেছিল একবার ১৯৮০ সালে। এ বছর নারী ফুটবল দল নারী এশিয়া কাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ করে। সাফ ফুটবলেও আমাদের রেকর্ড ভালো না। ২০০৩ সালে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তারপর এই আসরেও আমাদের সাফল্য নেই। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১। কোটি ভক্তের এই দেশে ফুটবলের কেন এমন করুণ দশা?  ফিফার এক গবেষণায় জানা যায়, একটি দেশের ফুটবলের বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো দর্শকদের। কোনো দেশে যদি ফুটবল জনপ্রিয় হয় তাহলে সেই দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই গবেষণা কতটা সঠিক? বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনা ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের সঙ্গে তুলনীয়। কিন্তু তবুও কেন আমাদের ফুটবল রুগ্ণ, মৃতপ্রায়? বিশ্বকাপ নিয়ে এত উত্তেজনার মধ্যে আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।  বাংলাদেশের ফুটবল এখনো যে টিকে আছে সেটা দেশের বৃহত্তম শিল্প গ্রুপ বসুন্ধরার অবদান। বসুন্ধরা বাংলাদেশের ফুটবলের এখন একমাত্র ভরসা।

দুনিয়াজুড়ে দেশে দেশে ফুটবল সংস্কৃতির অভিভাবক হলো ক্লাব। সেই প্রথম থেকেই ফুটবলকে লালন-পালন, নতুন প্রতিভার বিকাশ, ধারাবাহিকতার সঙ্গে খেলোয়াড় সৃষ্টি এবং খেলাকে জনপ্রিয় করার পেছনে ফুটবলের প্রাণভোমরা ক্লাবগুলোর অবদান সব সময় স্মরণীয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, আর্সেনাল, ম্যানসিটি প্রভৃতি অ্যাকাডেমির কার্যক্রম তো ফুটবল দুনিয়ার আলোচিত এবং অনুকরণীয়।  স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ক্লাবগুলো কখনো পরিকল্পনামাফিক একদম ‘এন্ট্রি লেবেল’ থেকে খেলোয়াড় সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি। স্থানীয় রেডিমেড এবং বাফুফের অনুমোদিত খেলোয়াড়রাই ভরসা। এতে দেশের ফুটবল স্বাবলম্বী হতে পারেনি। গত ৫৩ বছরের ফুটবল মাঠের ছবি দেশের ফুটবলের সঙ্গে প্রতারণার দলিল। এই অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে বসুন্ধরা গ্রুপ। বসুন্ধরা কিংস প্রথম স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পেশাদার ফুটবল ক্লাব। যারা বিশ্বে ক্লাব ফুটবলের আদলে বাংলাদেশের ফুটবল কাঠামোকে পাল্টানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ক্লাবটি দেশের ফুটবলের প্রেক্ষাপট এবং রং পাল্টে দিয়েছে। প্রথম থেকেই হেঁটেছে ফুটবলে সংস্কারের পথ ধরে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমে ক্লাবটি দেশের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এবং এর বাইরে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশে একমাত্র ‘সত্যিকারের পেশাজীবী’ ক্লাব হিসেবে আলোচনার জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে। ঘরোয়া পেশাদার ফুটবল লড়াইয়ে সাফল্যের ক্ষেত্রে অতীতের সব ধরনের রেকর্ড ভঙ্গ করে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। আধুনিক চিন্তা-ভাবনায় উজ্জীবিত ক্লাবটি প্রথম থেকেই দেশের ক্লাব ফুটবলে নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। ক্লাবটি হতে পেরেছে অন্যান্য ক্লাবের কাছে আদর্শ। ক্লাবটি দেশের ফুটবলের প্রেক্ষাপট এবং রং পাল্টে দিয়েছে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের মানোন্নয়ন, ক্রীড়াচর্চাকে পৃষ্ঠপোষকতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পেছনে আছে গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের খেলাধুলার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং ভালোবাসা। কিন্তু বসুন্ধরার মতো অন্য কোনো শিল্প উদ্যোক্তা বা শিল্পগোষ্ঠী ফুটবলের মান উন্নয়নে এগিয়ে আসেনি। এটা দুঃখজনক। বসুন্ধরা কিংস ছাড়া অন্য ক্লাবগুলো এখনো পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করতে পারেনি। আবাহনী, মোহামেডান কিংবা ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো একসময়ের জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর নির্দিষ্ট আয়ের উৎস নেই। চাঁদা এবং ক্লাবে হাউজি খেলার টাকা দিয়ে ক্লাব কোনোরকমে চালানো যায় হয়তো কিন্তু ফুটবলের মান উন্নয়ন করা যায় না। বাংলাদেশে কমবেশি ত্রিশটির মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আছে। প্রত্যেকে যদি একটা ক্লাবের দায়িত্ব নেয়, বসুন্ধরা কিংসের আদলে ক্লাব গড়ে তোলে তাহলে আমাদের ফুটবলের সুদিন আসতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। এজন্য শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলতে হবে সরকারকে।

পাশাপাশি কৈশোর থেকে ফুটবলার গড়ে তোলার জন্য গড়ে তুলতে হবে ফুটবল একাডেমি। এই একাডেমি সারা দেশ থেকে ফুটবল প্রতিভা খুঁজে বের করবে। তাদের পরিপূর্ণ এবং সমন্বিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগামী দিনের ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলবে। এসব একাডেমি হবে ভবিষ্যতের সেরা ফুটবলার সৃষ্টির কারখানা। বর্তমানে বাংলাদেশে বসুন্ধরা ফুটবল একাডেমি এবং বিকেএসপি ছাড়া আর কোনো একাডেমি নেই। এ ধরনের একাডেমি গড়ে তুলতে না পারলে শুধু ফুটবল নয়; কোনো খেলারই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এসব একাডেমি হবে ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিভা বিকাশের মূল ভিত্তি। এ ধরনের ক্রীড়া একাডেমি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে। যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের উদ্যোগ নেবে তাদের দিতে হবে বিশেষ প্রণোদনা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

বাংলাদেশের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাফুফে (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন)। বাফুফেকে ফুটবলের মান উন্নয়নে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। বিশ্বের কোনো দেশের ফুটবল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হয়নি। ফুটবল বিকাশের একমাত্র পরীক্ষিত উপায় হলো ক্লাব ফুটবলের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।

বর্তমান ফুটবল যুগের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন চলছে। এই মেসিকে কিন্তু আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন তৈরি করেনি, করেছে বার্সেলোনা। ছোটবেলায় শারীরিক বৃদ্ধি-সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগা এক লাজুক ছেলের বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্প রূপকথাকেও হার মানায়। শৈশবে গ্রোনদোলি ও নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজে খেলার সময় তার গ্রোথ হরমোন সমস্যা ধরা পড়ে। চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পারায় মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি স্পেনে পাড়ি জমান এবং বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেন। আজকের মেসির জন্ম হয় আসলে বার্সেলোনা ক্লাবে। শুধু মেসি নন, সব ফুটবল তারকার আসল জীবন শুরু হয় ক্লাব থেকে। বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুন জীবন দিতে হলে ক্লাব ফুটবলের জাগরণ ঘটাতে হবে।  মৃতপ্রায় ফুটবলকে বাঁচিয়ে রেখেছে বসুন্ধরা কিংস। দেশের ফুটবলের জাগরণ ঘটাতে হলে বসুন্ধরার মতো আরও পরিপূর্ণ ক্লাব গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে বাফুফে এবং সরকারকে দিতে হবে সহযোগিতা। একটি পরিকল্পনার আলোকে আমাদের ফুটবলকে ঢেলে সাজাতে হবে। নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা খেলাধুলাকে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। কোটি কোটি ফুটবলভক্তের এই দেশে ফুটবল এত পিছিয়ে থাকবে, এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

অদিতি করিম, লেখক ও নাট্যকার
ই-মেইল : [email protected]

সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল জরুরি

মন্‌জুরুল ইসলাম
সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল জরুরি

চার মাস বয়সি সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে বিরোধী দল। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকারকে বেশি দিন সময় দেওয়া হবে না। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বললেও এটাই তাঁদের মনের কথা। সেভাবেই তাঁরা অগ্রসর হচ্ছেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে তাঁদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। অবশ্য দেশের জনগণ তাঁদের প্রতি ১৯৭১ সাল থেকেই সতর্ক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দল বিএনপি নেতা-কর্মীরা কতটুকু সতর্ক সেটাই দেখার। সরকার পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে দুই স্তরবিশিষ্ট দেয়াল তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। কাউকে মন্ত্রী করেছেন আবার কাউকে উপদেষ্টাও নিয়োগ দিয়েছেন। সেই দুই স্তরের দেয়াল ভেদ করেও অনেক ভুলত্রুটি ইতোমধ্যে দেশবাসীর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। অপ্রিয় সত্য এখনো অনেকে সাহস করে বলতে পারছেন না। কারণ সত্যকথনে শত্রু বাড়ে। রাজনৈতিক নেতারা যখন ক্ষমতার বাইরে থাকেন তখন তাঁদের সামনে অপ্রিয় হলেও সত্য কথা বলা যায়। তাঁরাও হাসিমুখে সেই সত্য কথাটি শুনতে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁরাই যখন ক্ষমতাবান হন তখন সত্য কথা হজম করার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। চারপাশে চাটুকারবেষ্টিত হয়ে থাকার কারণে সত্য হজম করতে পারেন না। পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক এপিএস নামক সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরদের কারণে তাঁরা অন্য কারও কথাকে গুরুত্ব দেন না। শেষ পর্যন্ত এদের কারণেই ভয়াবহ ভরাডুবি হয়। সে কারণে সরকারকে শুধু মন্ত্রী, উপদেষ্টাবেষ্টিত থাকলেই হবে না। সত্য কথা বলতে পারে, কোনটা ভুল, কোনটা সঠিক সেটা যারা বুঝতে এবং সাহস করে বলতে পারে এমন একটি সেলও গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ ইতোমধ্যে সারা দেশে মন্ত্রী-এমপিদের স্বজন ও এপিএসের সুকর্ম-কুকর্ম জনগণকে ভাবিয়ে তুলছে। তাই বিরোধী দলের হুঁশিয়ারির আগে নিজেদের হুঁশ হতে হবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু ক্ষমতা নয়, আত্মসমালোচনার সক্ষমতা। যে সরকার নিজের ভুল দেখতে পারে, সমালোচনা গ্রহণ করতে পারে এবং সময়মতো সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সেই সরকারই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন করে। অন্যদিকে ক্ষমতার চারপাশে যখন চাটুকারের বৃত্ত তৈরি হয়, তখন ভুলগুলো ধীরে ধীরে বড় বিপদে পরিণত হয়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারকে ঘিরে নানান ধরনের আলোচনা দেখা যাচ্ছে। একদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর আমিরও বলেছেন, সরকারকে বেশি সময় দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী জনগণকে সতর্ক করে বলেছেন, যারা বলে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এ দুই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার দুটি দিক সামনে নিয়ে আসে। একদিকে রয়েছে সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টির চেষ্টা, অন্যদিকে সরকারকে স্থিতিশীলভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার অপরিহার্যতা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সরকারকে সময় দেওয়া হোক বা না হোক, সরকারের ভিতরে ভুলত্রুটি থাকলে সেগুলো চিহ্নিত ও সংশোধন করা জরুরি। কারণ সরকারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ সব সময় বিরোধী দল নয়; অনেক সময় সরকারের ভিতরের দুর্বলতা, অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং সুবিধাভোগী চক্রই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, জনপ্রিয় সরকারও শেষ পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে। ক্ষমতার আশপাশে এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা নিজেদের স্বার্থে সরকারের ভাবমূর্তি ব্যবহার করে। মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠজনেরা কখনো কখনো এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, যার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তায়। বর্তমান সময়েও বিভিন্ন পর্যায়ে কোনো কোনো মন্ত্রী, এমপি ও তাঁদের স্বজন কিংবা ব্যক্তিগত সহকারীর (এপিএস) বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অভিযোগ সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আবশ্যকতা থাকলেও একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই যে এ ধরনের ঘটনা জনগণের মধ্যে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাধারণ মানুষ সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে শুধু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বা মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত দিয়ে নয়। তারা বিচার করে মাঠপর্যায়ে কী ঘটছে, ক্ষমতার আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা কী করছেন। এ কারণেই সরকারের ভিতরে একটি কার্যকর ‘ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল’ গঠন করা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। এ সেলের কাজ হবে সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, সমালোচনা ও জনগণের অসন্তোষের কারণগুলো নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা। এটি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা হবে না, কোনো রাজনৈতিক প্রচার ইউনিটও হবে না। বরং এটি হবে সত্য অনুসন্ধানী একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কাঠামো, যার প্রধান কাজ হবে সরকারের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সংশোধনের পথ দেখানো।

সাধারণত সরকারপ্রধানকে খুশি করতে তাঁর কাছে ইতিবাচক তথ্যই বেশি পৌঁছে। মাঠপর্যায়ের প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মীরা প্রায়ই সাফল্যের খবর তুলে ধরতে আগ্রহী থাকেন। কিন্তু ব্যর্থতা, অসন্তোষ বা দুর্নীতির তথ্য অনেক সময় গোপন থেকে যায়। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে বাস্তব চিত্রের পরিবর্তে একটি সাজানো চিত্র উপস্থিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। একটি ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল এ সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ সেলে প্রশাসন, অর্থনীতি, গণমাধ্যম, সমাজবিজ্ঞান ও সুশীল সমাজের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাঁরা নিয়মিতভাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রকল্পের কার্যক্রম মূল্যায়ন করবেন। কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে, কোথায় জনভোগান্তি বাড়ছে, কোথায় নীতিগত দুর্বলতা রয়েছে এসব বিষয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন জমা দেবেন। বিশেষ করে মন্ত্রী, এমপি, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও এপিএসদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু সময় দেখা যায়, কোনো মন্ত্রী বা এমপি ব্যক্তিগতভাবে সৎ হলেও তাঁর আশপাশের লোকজন প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায় করেন। ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তার, নিয়োগবাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে এপিএস হয়ে ওঠেন মন্ত্রী-এমপির চেয়ে ক্ষমতাবান। এসব কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ঘাড়েই বর্তায়।

বিশ্বের অনেক দেশেই ক্ষমতাসীনদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ নৈতিকতা কমিশন বা অভ্যন্তরীণ তদারকি কাঠামো রয়েছে। কারণ অতীতে দেখা গেছে, সরকারের ভাবমূর্তি ধ্বংস করতে অনেক সময় বিরোধীদের চেয়ে ক্ষমতার আশপাশে থাকা অসাধু ব্যক্তিরাই বেশি ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে সরকার পরিচালনার কাজে বহু উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন খাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনাকে আরও কার্যকর করা। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপদেষ্টা থাকলেই হবে না; সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্যও কিছু মানুষের প্রয়োজন। এমন মানুষ দরকার, যারা কোনো ভয় বা সংকোচ ছাড়াই সত্য কথা বলতে পারবেন। যারা শুধু সরকারের প্রশংসা করবেন না, বরং প্রয়োজনে সরকারের সিদ্ধান্তের দুর্বলতাও তুলে ধরবেন। রাজনীতিতে একটি প্রচলিত কথা আছে-ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো মানুষ সত্য বলা বন্ধ করে দেয়। শাসকের চারপাশে তখন এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে সবাই সন্তুষ্টির খবর শোনাতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রকৃত উপকার করেন সেই ব্যক্তি, যিনি সাহসের সঙ্গে ভুলগুলো চিহ্নিত করেন। কারণ ভুল জানা গেলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকে; কিন্তু ভুল আড়াল করা হলে তা একসময় সংকটে পরিণত হয়।

বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় বাস্তবতায় বাংলাদেশ নানান ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সব ক্ষেত্রেই সরকারকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো জনগণের আস্থা ধরে রাখা। আর জনগণের আস্থা ধরে রাখার অন্যতম উপায় হচ্ছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল সেই জবাবদিহিতার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। এটি সরকারের সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার জন্য নয়; বরং সমালোচনার ভিতরে থাকা সত্য খুঁজে বের করার জন্য। এতে সরকার যেমন নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হবে, তেমন অপপ্রচার ও ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সত্য বলার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের জন্যও সেটি প্রযোজ্য। যে সরকার নিজের ভুল শুনতে রাজি থাকে, সেই সরকারই শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী হয়। তাই সরকারের চারপাশে শুধু প্রশংসাকারী নয়, সত্য বলার সাহসী মানুষও থাকা দরকার। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল গঠন সেই লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় সতর্কতা, আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই। মন্ত্রী, এমপি, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের নীতিগত ও প্রশাসনিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কারণ একটি সরকারের প্রকৃত শক্তি তার ভুল না হওয়ায় নয়; বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত সংশোধন করার সক্ষমতায়। সেই সক্ষমতা অর্জনের জন্যই সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল প্রয়োজন।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]

ইতিবাচক ধারায় স্বাস্থ্য খাত : বাজেটে নতুন সম্ভাবনা

ড. মো. মিজানুর রহমান
ইতিবাচক ধারায় স্বাস্থ্য খাত : বাজেটে নতুন সম্ভাবনা
ছবি : কালের কণ্ঠ

একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি শুধু অবকাঠামো নির্মাণ, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বা শিল্প-কারখানার বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মূল ভিত্তি হলো মানবসম্পদ। এই মানবসম্পদের গুণগত মান নির্ধারণ করে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক জীবনমান। একজন সুস্থ নাগরিক যেমন ব্যক্তিগত জীবনে অধিক সক্ষম, তেমনি তিনি জাতীয় অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাই আধুনিক উন্নয়নচিন্তায় স্বাস্থ্য খাতকে আর কেবল একটি সামাজিক সেবা খাত হিসেবে দেখা হয় না; এটি দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। তবে এই অর্জনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে তুলনামূলক কম সরকারি বিনিয়োগ, সীমিত অবকাঠামো এবং জনবল ঘাটতি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অসংক্রামক রোগের বিস্তার স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার তুলনায় বিদ্যমান সক্ষমতার ব্যবধান ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা যায়। ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার এই বরাদ্দ শুধু আর্থিক সম্প্রসারণ নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতকে উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা। বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতীয় বাজেট বৃদ্ধির তুলনায় স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে জিডিপিতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের অংশ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ০১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি এখনো সীমিত, তবুও এটি দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতকে এখন আর প্রান্তিক খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং মানবসম্পদ উন্নয়নকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নতুনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই বাজেটের ইতিবাচকতা কেবল অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর কাঠামোগত দিকগুলোই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগকে পৃথকভাবে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে একদিকে সেবার সম্প্রসারণ, অন্যদিকে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের কাজ সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায়। নতুন জনবল নিয়োগের উদ্যোগ এই ঘাটতি কমাতে এবং সেবার পরিধি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষার সম্প্রসারণও এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু চিকিৎসক নয়, দক্ষ নার্স ও মিডওয়াইফ অপরিহার্য। মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক সেবা এবং প্রাথমিক চিকিৎসায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক স্বাস্থ্য সূচক উন্নয়নে সরাসরি প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা, রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস সংরক্ষণ এবং সেবার স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় ওষুধ শিল্পকে সহায়তার উদ্যোগ স্বাস্থ্য খাতকে আরও টেকসই ও সক্ষম ভিত্তি প্রদান করবে।
তবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন কেবল বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কাঠামোগত বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য খাতকে কার্যকরভাবে শক্তিশালী করতে হলে এটিকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একজন সুস্থ মানুষ কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; তিনি জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। সুস্থ নাগরিকরা যেমন বেশি কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল, তেমনি অসুস্থ জনগোষ্ঠী চিকিৎসা ব্যয় বাড়িয়ে এবং কর্মঘণ্টা কমিয়ে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ সরাসরি জাতীয় উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্য একটি মৌলিক ভিত্তি। একটি শিশু যদি অপুষ্টিতে ভোগে বা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে সুস্থ ও পুষ্টিসম্পন্ন শিশু ভবিষ্যতে দক্ষ ও উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত হয়। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতার ওপর বিনিয়োগ। বাংলাদেশ যখন উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ সুস্থ, দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই স্বাস্থ্য খাতকে সামাজিক ব্যয়ের পরিবর্তে কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা জরুরি।

তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোও উপেক্ষা করা যায় না। দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো এখনো চাহিদার তুলনায় সীমিত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ওষুধের ঘাটতি রয়েছে, যার ফলে সাধারণ রোগের ক্ষেত্রেও রোগীদের বড় শহরের ওপর নির্ভর করতে হয়। একই সঙ্গে রোগের ধরনে পরিবর্তন ঘটেছে—সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর “ডাবল বার্ডেন অব ডিজিজ” তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং পরিবেশ দূষণও নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এখনো একটি বড় সীমাবদ্ধতা, যা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাধা সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অর্থায়নের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ব্যক্তিগত ব্যয়ের উচ্চ নির্ভরতা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই জনগণকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা বৈশ্বিকভাবে অন্যতম সর্বোচ্চ হার। এই উচ্চ Out-of-Pocket (OOP) ব্যয় সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে। একটি সাধারণ অসুস্থতাও অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক সংকটে পরিণত হয়—সঞ্চয় ভাঙা, সম্পদ বিক্রি বা ঋণের বোঝা নেওয়া তাদের জন্য প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে স্বাস্থ্য সমস্যা ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের একটি প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতির সামাজিক প্রভাবও অত্যন্ত গভীর। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনেক সময় ব্যয়ের ভয়ে চিকিৎসা নিতে দেরি করে বা চিকিৎসা এড়িয়ে যায়, যার ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং পরবর্তী চিকিৎসা আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। নারী, শিশু এবং বয়স্করা এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই স্বাস্থ্য খাত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং জনগণের ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ কতটা কমছে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত। স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা, বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ছাড়া এই চাপ কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব নয়।

একটি কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। বিশ্বজুড়ে যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে উন্নত স্বাস্থ্যসূচক অর্জন করেছে, তারা এই স্তরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশেও কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মূল কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। এই স্তরগুলো যত শক্তিশালী হবে, সাধারণ রোগ, মাতৃ ও শিশুসেবা, টিকাদান এবং পুষ্টি কার্যক্রম তত বেশি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে এবং রোগীরা তুলনামূলক দ্রুত, সহজ ও কম খরচে সেবা পেতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের জন্য শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া প্রায়ই ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগকে কেবল ব্যয় হিসেবে না দেখে বরং সবচেয়ে কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এমন একটি কাঠামো, যেখানে কোনো ব্যক্তি আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয় না বা চিকিৎসা নিতে গিয়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়ে না। বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হলেও বাস্তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো মূলত ব্যক্তিগত ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা অনেক পরিবারকে উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। একটি গুরুতর অসুস্থতাই অনেক সময় একটি পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দিতে পারে।

এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রথমত সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ধাপে ধাপে একটি কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা বা সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে রোগের আর্থিক ঝুঁকি ব্যক্তি পর্যায় থেকে সমাজভিত্তিকভাবে ভাগাভাগি করা যায়। তৃতীয়ত, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে UHC কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনবল বৃদ্ধি, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে UHC অর্জনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং সুশাসনের ওপর। স্বাস্থ্য বাজেট যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, এর বাস্তব ফলাফল নির্ভর করে সঠিক ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নের ওপর। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক সময় বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয় বা কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হয় না—যা স্বাস্থ্য খাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সীমিত সক্ষমতা, জটিল ক্রয় প্রক্রিয়া এবং কোথাও কোথাও স্বচ্ছতার অভাব স্বাস্থ্য খাতের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা, যেখানে অনেক সময় বাস্তব চাহিদার পরিবর্তে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

স্বাস্থ্য খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট যে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সুশাসন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা। ফলাফলভিত্তিক বাজেটিং, ই-প্রকিউরমেন্ট, নিয়মিত অডিট এবং স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থার মতো সংস্কার ছাড়া কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি জনগণের কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত করতে পারে না। পাশাপাশি এই বিনিয়োগকে একটি এককালীন উদ্যোগ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক নীতিগত অগ্রাধিকারে পরিণত করা জরুরি, যাতে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয় এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।

অন্যদিকে, এই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন এবং গবেষণা-উদ্ভাবনে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন, যাতে তারা প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকায় সেবা দিতে আগ্রহী হন। একই সঙ্গে ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড, টেলিমেডিসিন এবং ডেটা-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে পারে। সবশেষে বলা যায়, এই বাজেট বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে, তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দক্ষ বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর—কারণ একটি জাতির অর্থনৈতিক অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার জনগণের সুস্বাস্থ্যের ওপর।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]