১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের ঘটনা কেবল একজন নবাবের পতন বা একটি কোম্পানির জয় ছিল না, বরং তা ছিল বাংলার বহুত্ববাদী সমাজকাঠামোকে চিরতরে বদলে দেওয়ার এক ঔপনিবেশিক সূচনা। পলাশীর যুদ্ধ কেবল সামরিক পরাজয় ছিল না, এটি ছিল আমাদের সমাজ, ইতিহাস লিখন ও সংস্কৃতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী ঔপনিবেশিক ক্ষত।
শনিবার (২৭ জুন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ’ (সিবিএস)-এর উদ্যোগে ‘পলাশী উত্তর বাংলা: ক্ষমতার পালাবদল এবং বিভাজনের রাজনীতির বিকাশ’ শীর্ষক এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক, চিন্তক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ-এর নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। এরপর মূল প্রবন্ধ ও আলোচনা পর্বে তিনজন গবেষক পলাশী-পরবর্তী বাংলার ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
আলোচনার প্রথম পর্বে ইতিহাস গবেষক আব্দুল্লাহ আল মামুন সমসাময়িক ফার্সি ভাষার গ্রন্থের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিজিত নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ‘খলনায়ক’ কিংবা অতি-সরলীকৃত ‘ট্রাজিক নায়ক’ বানিয়ে ঔপনিবেশিক ইতিহাস লিখনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা তাদের শাসনের বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা ও প্রোপাগান্ডা তৈরি করেছিল। লর্ড ক্লাইভ, জগত শেঠ, রায় দুর্লভ বা উমিচাঁদদের আঁতাত কেবল ব্যক্তিস্বার্থের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না, বরং তা ছিল উদীয়মান বণিক পুঁজি এবং ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক শক্তির এক গভীর রাজনৈতিক বোঝাপড়া।
দ্বিতীয় বক্তা জান্নাতে গুলশান তার আলোচনায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে স্থানান্তরের প্রশাসনিক মেকানিজম এবং এর সামাজিক-রাজনৈতিক অভিঘাত তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো ভূমি ও অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ইংরেজি শিক্ষার সুযোগকে কেন্দ্র করে কীভাবে এক পক্ষকে পৃষ্ঠপোষকতা ও অন্য পক্ষকে প্রান্তিকীকরণ করা হয়। এর ফলেই দুই প্রধান সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সৌহার্দ্য গভীর রাজনৈতিক অবিশ্বাসে রূপ নেয়।
গবেষক ইমরুল হাসান দেখান কীভাবে ঔপনিবেশিক প্রভুরা শিক্ষা, ভাষা ও চিন্তার ওপর এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য বা হেজিমনি প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা নিজস্ব ঐতিহ্যকে হীন এবং পশ্চিমা সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায়। তিনি বর্তমানের শিক্ষা কাঠামোর সঙ্গে এর যোগসূত্র টেনে বলেন, এই ক্ষমতার পালাবদল শত শত বছর ধরে বিদ্যমান সামাজিক বন্ধনকে ভেঙে হিন্দু-মুসলিম বিভেদের রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং ১৯৪৭-এর দেশভাগে এর নির্মম পরিণতি ঘটে।
সেমিনারের সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আজকের এই সেমিনার পলাশী ট্র্যাজেডির সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর এবং সমকালীন মনস্তত্ত্বে এর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত ও পেছনের রাজনীতিকে নতুন করে চিনতে ও বুঝতে সাহায্য করবে।
আলোচনা শেষে একটি প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে দর্শক ও গবেষকদের মাঝে সমকালীন রাজনৈতিক মেরুকরণের সঙ্গে ইতিহাসের এই জটিল সমীকরণের মেলবন্ধন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে আসে।





