পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রকল্পটি দ্রুত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পাবে এবং অনুমোদনের পরই এর বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে।’
শুক্রবার (১৯ জুন) বিকেলে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা রেলসেতু এলাকায় আয়োজিত এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি এবার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবো।’ ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনাও দ্রুত একনেকে পাস হয়ে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছেন। তার নেতৃত্বে খুব শিগগিরই এ প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান হবে। আমি তিস্তাপাড়ের মানুষের পাশে আছি এবং থাকবো। আমার দায়িত্বের জায়গা থেকে তিস্তাবাসীর স্বার্থে যা যা করা প্রয়োজন, তা করা হবে।’
মন্ত্রী জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখেছেন যে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। শুধু নদীতে ড্রেজিং কিংবা তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; নদীতে সারা বছর পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদীতে অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হয়ে ভয়াবহ ভাঙন সৃষ্টি করে। এতে নদীতীরবর্তী হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে নদীতে পানি থাকে না বললেই চলে। ফলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ কারিগরি সমীক্ষা পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ্যানি বলেন, ‘হাজার হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পর যদি নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। তাই আমরা এমন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চাই, যা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুকনা মৌসুমে কীভাবে তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা যায়, কীভাবে খাল ও শাখা-প্রশাখা দিয়ে পানি সরবরাহ করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় এবং মাছ চাষসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করা যায়-এসব বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।’
মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও বাস্তবভিত্তিক সমীক্ষা সম্পন্ন করেই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
তিনি বলেন, ‘এ কারণেই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, বুয়েটের প্রকৌশলী, নদী বিশেষজ্ঞসহ ২২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল আমাদের সঙ্গে রয়েছে। তারা সরেজমিনে তিস্তাপাড়ের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন।’
এ সময় মন্ত্রী আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমরা তিনজন মন্ত্রী তিস্তাপাড় পরিদর্শন করছি। এই সফরের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের মতামত, নদীর বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
পথসভায় উপস্থিত ছিলেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. একেএম শাহাবুদ্দিন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব, নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম,বুয়েটের প্রকৌশলী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
এর আগে পানিসম্পদমন্ত্রী নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা ব্যারেজ, তিস্তা সেচ খাল এবং নদীর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি নদীভাঙন, পানিপ্রবাহ, সেচব্যবস্থা ও স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগের বিভিন্ন বিষয় সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।
তিস্তা অববাহিকার লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।




