চট্টগ্রামের পটিয়ায় একই দিনে দুই নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। একজনকে কবরস্থান থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয়। অন্যজনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয় শ্বশুরবাড়ি থেকে।
এর মধ্যে কুসুমপুরা ইউনিয়নের কবরস্থান থেকে উদ্ধার হওয়া তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। তিনি সুমী আক্তার (২১)। অন্যদিকে কোলাগাঁও ইউনিয়নে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার হওয়া গৃহবধূর নাম সোনিয়া আক্তার (৩০)।
পৃথক এ দুই ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে পটিয়া থানায় দুটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পটিয়া থানার ওসি (তদন্ত) যুযুৎসু যশ চাকমা। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, পারিবারিক তথ্য, ঘটনাস্থলের আলামত ও স্বজনদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ল্যাংগার দোকানসংলগ্ন কবরস্থান থেকে অচেতন অবস্থায় এক তরুণীকে উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। পরে তাকে দ্রুত পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
প্রথমে ওই তরুণীর পরিচয় জানা না গেলেও পরে স্বজনরা তাকে সুমী আক্তার (২১) হিসেবে শনাক্ত করেন। তিনি কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর চরলক্ষ্যা এলাকার মো. আইয়ুব আলীর মেয়ে এবং মো. আব্দুল্লাহর স্ত্রী।
নিহত সুমীর চাচাতো ভাই মো. শওকত জানান, প্রায় তিন মাস আগে পাশের এলাকায় সুমীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন বলে পরিবারের দাবি। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে সুমী বাবার বাড়ি থেকে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে যান। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পর বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্ট দেখে পরিবার জানতে পারে, পটিয়ার কুসুমপুরা এলাকার একটি কবরস্থান থেকে অচেতন অবস্থায় এক তরুণীকে উদ্ধার করা হয়েছে। পরে হাসপাতালে গিয়ে তারা নিশ্চিত হন, তিনিই সুমী।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, সুমীকে উদ্ধারের সময় তার পাশ থেকে একটি বিষের বোতল পাওয়া যায়। এতে প্রথমে বিষপানের সন্দেহ তৈরি হয়। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা প্রাথমিক পরীক্ষায় বিষক্রিয়ার কোনো সুস্পষ্ট আলামত পাননি।
অন্যদিকে, একই দিন উপজেলার কোলাগাঁও ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছবির মার্কেট এলাকার আনোয়ার শাহ মাজারসংলগ্ন নিজ বাড়িতে সোনিয়া আক্তার (৩০) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায়। তিনি ওই এলাকার মো. নুর ইসলামের স্ত্রী এবং নুর মোহাম্মদের মেয়ে।
পরিবারের সদস্যদের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে কোনো এক সময় এ ঘটনা ঘটে। ওই সময় সোনিয়া সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে ছিলেন। পরে পরিবারের অন্য সদস্যরা খাবার খেতে এসে শয়নকক্ষে তাকে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঝুলতে দেখেন।
দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে মরদেহ আবার বাড়িতে নেওয়া হয়। খবর পেয়ে বিকেল ৫টার পর পটিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
একই দিনে দুই নারীর এ মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সুমী কীভাবে কর্ণফুলী থেকে পটিয়ার কুসুমপুরার কবরস্থানে পৌঁছালেন, তার পাশের বিষের বোতলটি কোথা থেকে এলো এবং তিনি আদৌ বিষপান করেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একই ভাবে কোলাগাঁওয়ের গৃহবধূ সোনিয়া আক্তারের মৃত্যুর পেছনে পারিবারিক কলহ, মানসিক চাপ নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে, সেটিও তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক বলেন, একই দিনে দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে পৃথকভাবে দুটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। কুসুমপুরা থেকে উদ্ধার হওয়া সুমী আক্তারের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে কোলাগাঁওয়ের সোনিয়া আক্তারের মৃত্যুর ঘটনাও তদন্তাধীন রয়েছে।
তিনি আরো জানান, দুই ঘটনাতেই পরিবারের সদস্য, স্থানীয় লোকজন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। কোনো ধরনের অসঙ্গতি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আত্মহত্যা কিংবা অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুটি মরদেহই চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। শুক্রবার ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।




