• ই-পেপার

আরো কমল সোনার দাম, ভরি কত?

সিটি গ্রুপের ঋণ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যাংকাররা

অনলাইন ডেস্ক
সিটি গ্রুপের ঋণ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যাংকাররা

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ‘সিটি’ গ্রুপের ঋণ সংকট এখন ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। একসময়ের নির্ভরযোগ্য করপোরেট গ্রাহক হিসেবে বিবেচিত গ্রুপটি বর্তমানে প্রায় ২৪ হাজার ৭৭৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে চাপে রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে- এ পরিস্থিতির জন্য করা দায়ী? অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় দায় ব্যাংকারদের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত ও তদারকি না করা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন,  দেশ যে গ্যাসের অভাবসহ ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়তে যাচ্ছে, সে লক্ষণ দৃশ্যমান হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। দেশে উত্তোলিত গ্যাসে শিল্প-কারখানা সচল রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে সরকার। তারও আগে থেকে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল পেট্রোবাংলা। অথচ গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত না করেই ২০২০ সাল-পরবর্তী সময়ে এক সঙ্গে ছয়টি বৃহৎ শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছে ‘সিটি গ্রুপ’। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে তোলা এ শিল্প-কারখানাগুলোই মূলত গ্রুপটিকে বিপদে ফেলেছে। আর ঝুঁকি পর্যালোচনা না করে কেবল সুনামের ওপর ভিত্তি করে গ্রুপটিকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়ে বিপদ ডেকে এনেছে ব্যাংকগুলো। আর এক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন দেশের ভালো ব্যাংক ও ভালো ব্যাংকার হিসেবে পরিচিত শীর্ষ নির্বাহীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও গ্রুপটিতে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে সিটি গ্রুপের মোট ঋণ স্থিতি ছিল ২৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি মোট ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এ ঋণ নেওয়া হয়েছে। গ্রুপটিকে ঋণ দেওয়া শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে বহুজাতিক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি) ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো ব্যাংক। আর দেশের বেসরকারি খাতের সেরা ব্যাংকগুলোও গ্রুপটিকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), ইউসিবি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার মতো বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যাংকাররা দেশের ‘সেরা ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত।

এর মধ্যে এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. মাহবুব উর রহমান। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০২০ সালের মার্চ থেকে বহুজাতিক ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীর পদে রয়েছেন তিনি। আর ২০১৭ সাল থেকে টানা নয় বছর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেছেন নাসের এজাজ বিজয়। সম্প্রতি তিনি এ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

JJ

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক পিএলসির এমডি ও সিইও পদে রয়েছেন মাসরুর আরেফিন। ২০১৯ সাল থেকে এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আর ২০০৭ থেকে টানা ১৮ বছর ইস্টার্ন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেছেন আলী রেজা ইফতেখার। চলতি বছর তিনি ব্যাংকটি থেকে অবসরে গেছেন। আরেক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার সেলিম আর এফ হোসেন ২০১৫ সাল থেকে টানা ১০ বছর ব্র্যাক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেন। গত বছর তিনি ব্যাংকটি থেকে পদত্যাগ করেন। আর ২০২১ সাল-পরবর্তী সময়ে প্রাইম ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন হাসান ও. রশীদ।

সম্প্রতি তিনি ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি পদে যোগদান করেছেন। দেশের জ্যেষ্ঠ শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে আছেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। ২০১৯ সাল থেকে এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এর আগে ব্র্যাক ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

বিপুল বিনিয়োগের পরও স্থাপিত শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ না পেয়ে সিটি গ্রুপ বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়েছে। ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্রুপটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চেয়ে আবেদন জানিয়েছে। শিল্প গ্রুপটির বিপদে পাশে দাঁড়াতে একতাবদ্ধ হয়েছেন অর্থায়নকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা। গত ১৮ জুন একসঙ্গে সিটি গ্রুপের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা। সেখানে সিটি গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠনে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

এক্ষেত্রে শীর্ষ নির্বাহীদের বক্তব্য হলো দীর্ঘদিনের উজ্জ্বল ভাবমূর্তির কারণে ব্যাংকগুলো সিটি গ্রুপকে ঋণ দিয়েছে। এখন গ্রুপটি খেলাপি হয়ে গেলে দেশি-বিদেশি ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিপদে পড়বে। এর মধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) মতো বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। যে ভালো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এখন ২ শতাংশ বা তার আশপাশে, সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হলে সেটি ৫-৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো নিজেদের স্বার্থেই সিটি গ্রুপের পাশে দাঁড়াতে চায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও ইতিবাচক সায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ও অতিরিক্ত বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২০ সাল-পরবর্তী সময়ে সিটি গ্রুপকে অতিরিক্ত ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম সারির কিছু ব্যাংকের অতি উৎসাহ ছিল। তারা জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বিবেচনায় না নিয়েই গ্রুপটিকে ঋণ দিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত বিনিয়োগ সম্ভাবনা নয়, বরং সিটি গ্রুপের নামের ওপরই ঋণ দেওয়া হয়েছে। শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর নাম দেখে ছোট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পথে হেঁটেছে। আর গ্রুপটিও একসঙ্গে অনেকগুলো শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে বিপদে জড়িয়েছে।

সিটি গ্রুপের কাছে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। এর মধ্যে এইচএসবিসির ঋণের স্থিতি এখন ২ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। আর গ্রুপটির কাছে ২ হাজার ৭২ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। বহুজাতিক এ দুটি ব্যাংকই এখন সিটি গ্রুপের ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে। এ ব্যাংক দুটির খেলাপি ঋণের হার এখন যৎসামান্য। সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হলে দুটি ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণে উল্লম্ফন ঘটবে।

বিদেশি এ দুটি ব্যাংকের পাশাপাশি সিটি গ্রুপের কাছে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ঋণ রয়েছে ৪৬৫ কোটি টাকার। আর ব্যাংক আলফালাহ-এর ৮৪ কোটি, হাবিব ব্যাংকের ৩৫ কোটি ও উরি ব্যাংকের ২৯ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে গ্রুপটির কাছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে এডিবির ১১৩ কোটি, আইএফসির ১০১ কোটি ও আইসিডির ৩০৩ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।

সিটি গ্রুপের বিপদে দেশে কার্যরত এ বিদেশি ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরেও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। গ্রুপটির ঋণ আদায় নিয়ে এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো বৈশ্বিক জায়ান্ট ব্যাংকগুলোর আঞ্চলিক কার্যালয় উদ্বিগ্ন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে আভাস মিলেছে। প্রায় নয় বছর দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি নাসের এজাজ বিজয় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদ ছেড়েছেন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ব্যাংকটির সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি।

নাসের এজাজ বিজয়ের পদত্যাগের পর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সিইওর দায়িত্ব পালন করছেন মো. এনামুল হক। সিটি গ্রুপের ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৯০৫ সাল থেকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশে ব্যবসা করছে। আর সিটি গ্রুপের সঙ্গেও আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বহুদিনের। আমরা গ্রুপটিকে ভালো গ্রাহক হিসেবে জানি। ২০২২ সাল-পরবর্তী ডলারের বিনিময় হারজনিত ক্ষতি ও প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমানের মৃত্যুর কারণে গ্রুপটি বিপদে পড়েছে। আর পারিপার্শ্বিক অন্যান্য সংকটও ছিল। আমরা গ্রুপটির ঋণের বিষয়ে পর্যালোচনা করছি।’

দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি গ্রুপে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে সিটি ব্যাংক পিএলসির। গত এপ্রিল শেষে এ ঋণের স্থিতি ছিল ১ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। এছাড়া ইউসিবির ১ হাজার ৫৭৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ৪০৭ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার ৭০ কোটি ও প্রাইম ব্যাংকের ১ হাজার ৩০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এ ব্যাংকগুলো দেশের সেরা ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। আর ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরাও ভালো ব্যাংকার হিসেবে সমাদৃত।

RAKIB

প্রায় সাত বছরের বেশি সময় ধরে সিটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাসরুর আরেফিন। তিনি ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান পদেও রয়েছেন। সিটি গ্রুপের ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘সিটি গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি একক প্রতিষ্ঠানের সংকট হিসেবে না দেখে বৃহত্তর করপোরেট ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা উচিত। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে সিটি গ্রুপের সঙ্গে ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভার ও ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এর সঙ্গে জড়িত। তাই বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’

এতগুলো ব্যাংক একযোগে সিটি গ্রুপকে অর্থায়নের বিষয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং মডেল বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা নয়। বরং বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বাস্তবতায় ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে এমন অনেক দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগে অর্থায়ন করে আসছে, যেগুলোর অর্থায়নের একটি বড় অংশ আদর্শভাবে শক্তিশালী পুঁজিবাজার থেকে আসার কথা। কিন্তু দেশে দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট অর্থায়নের জন্য পর্যাপ্ত ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার এখনো গড়ে না ওঠায় ব্যাংকগুলোকেই সেই ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। এখন ৩৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সমন্বিতভাবে গ্রুপটির ব্যবসা পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সংরক্ষণ এবং দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে গ্রুপ এক্সপোজার, নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং আন্তঃব্যাংক সমন্বয় আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতায় এ সংকটের সফল সমাধান এবং ব্যবসা পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে আমি আশাবাদী।’

সিটি গ্রুপ যে বিপদে পড়তে যাচ্ছে, সেটি আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলে জানান এ শীর্ষ নির্বাহী। তিনি বলেন, ‘আমি বিপদ টের পাচ্ছিলাম। বড় বড় প্রজেক্ট হচ্ছে কিন্তু সেগুলো থেকে রেভিনিউ আসছে না, এটা যে বিপদের তা বোঝা যাচ্ছিল।’

অবশ্য ব্র্যাক ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলছেন, ‘ব্যাংকগুলোকে তাদের অনুমোদিত ঋণনীতি ও বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিটি ঋণ প্রস্তাবের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো গ্রাহকের অতীত সম্পর্ক, সুনাম বা দীর্ঘদিনের পরিচিতির ভিত্তিতে নয়; বরং ঋণগ্রহীতার বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা, নগদ অর্থ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) তৈরি করার সামর্থ্য, সুশাসনের মান, সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করে তার ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোরও নিজ নিজ আর্থিক অবস্থান, ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ফলাফল, সম্ভাব্য দায় (কনটিনজেন্ট লায়াবিলিটি) এবং উদীয়মান ঝুঁকি সম্পর্কে সম্পূর্ণ, সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রদানে সততা বজায় রাখা যথাযথ ঋণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং একটি টেকসই ব্যাংকিং সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য।’

সিটি গ্রুপের কাছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৯৬৪ কোটি টাকা। এছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ৯৪৬ কোটি, পূবালী ব্যাংকের ৯১৩ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ৯০৮ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮১৮ কোটি, ওয়ান ব্যাংকের ৭৪৩ কোটি, এনসিসি ব্যাংকের ৭৩৩ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ৭০৪ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৬৯৬ কোটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৬৪৯ কোটি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ৬২২ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫৯০ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৪৮৩ কোটি, মেঘনা ব্যাংকের ২৩২ কোটি, উত্তরা ব্যাংকের ২০৬ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে গ্রুপটিতে। এর বাইরে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১৮৬ কোটি, মিডল্যান্ড ব্যাংকের ১৬৭ কোটি, সোনালী ব্যাংকের ১০০ কোটি, কমিউনিটি ব্যাংকের ৯৬ কোটি, এনআরবি ব্যাংকের ৭৫ কোটি, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৭৩ কোটি, সীমান্ত ব্যাংকের ৬৮ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৫১ কোটি, সিটিজেন্স ব্যাংকের ৪৭ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৪৫ কোটি ও এক্সিম ব্যাংকের ৩২ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইডিএলসির ৪৯৪ কোটি, ইডকলের ২৬৮ কোটি, বিআইএফএফএলের ২১০ কোটি, আইপিডিসির ১৫০ কোটি, লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের ১১৯ কোটি, সাবিনকোর ৮০ কোটি, অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের ৪৫ কোটি ও ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের ৩৪ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে সিটি গ্রুপে।

গ্যাসের সংকটের মধ্যেও সিটি গ্রুপের একসঙ্গে ছয়টি বৃহৎ কারখানা স্থাপন ও ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংকার হিসাবে আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানায় অর্থায়নে গুরুত্ব দেই। আমরা মনে করি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ আগে এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দেয়া হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য বিগত সরকার কেবল নামেই অর্থনৈতিক অঞ্চলের লাইসেন্স দিয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ দেবে বলে টাকা নিয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করেনি। এটি উদ্যোক্তা ও ব্যাংকারদের ব্যর্থতার চেয়েও বিগত সরকারের বড় ব্যর্থতা।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরো বলেন, ‘এটি স্বীকার করতে বাধা নেই যে সিটি গ্রুপকে আমরা হয়তো বেশি ঋণ দিয়েছি। এতগুলো ব্যাংক একসঙ্গে ঋণ না দিলেও হতো। আবার গ্রুপটিও একসঙ্গে এতগুলো কারখানা নির্মাণ না করলে পারত। আবার এটিও দেখতে হবে, দেশে ঋণ দেয়ার মতো ভালো কোম্পানি খুব বেশি নেই। ছোট একটি অর্থনীতির দেশে ৬২টি ব্যাংক ও ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করছে।’

সিটি গ্রুপ দেশের ভোগ্যপণ্য বাজারের শীর্ষস্থানীয় কনগ্লোমারেট হিসেবে পরিচিত। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রয়াত হন। কর্মস্পৃহা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য এ শিল্প উদ্যোক্তা দেশের ব্যাংকিং ও করপোরেট জগতের চোখে এক সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দেশের শিল্পায়নে তার অবদানকে স্মরণ করেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাধীনতা-পরবর্তী পাঁচ দশকে সিটি গ্রুপের অংশ হিসেবে ৪০টিরও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ভোজ্যতেল ও চিনি পরিশোধন, চাল-ডাল, আটা-ময়দা, প্রক্রিয়াজাত খাবার, পোলট্রি খাদ্য, জাহাজ নির্মাণ, চা বাগান, ব্যাংক ও বীমা, হাসপাতালসহ বিভিন্ন খাতে এ গ্রুপের ব্যবসা বিস্তৃত। এ গ্রুপের তিনটি অর্থনৈতিক জোন ও একটি হাই-টেক পার্কও রয়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় এ শিল্প গ্রুপটি নিয়ে গত ৬ মে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘‍আর্থিক চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা চাইল ‘‍সিটি গ্রুপ’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করা সিটি গ্রুপ আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ও স্থানীয় নানা সংকটের কারণে গ্রুপের কোম্পানিগুলোর ব্যাংক ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চেয়ে লিখিত আবেদন করেছে গ্রুপটি। আবেদনে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণ (খেলাপি) না করাসহ সাত ধরনের নীতিসহায়তা চাওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বরাবর লেখা আবেদনে সিটি গ্রুপ উল্লেখ করে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে টানা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো খেলাপি হয়নি। এমনকি ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধেও কোনো বিলম্ব ছিল না। কিন্তু চার বছর ধরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের প্রভাবে গ্রুপটি তীব্র আর্থিক ও পরিচালনাগত চাপের মুখে পড়েছে। এটি সিটি গ্রুপের নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। এ কারণে গ্রুপটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চাইতে বাধ্য হয়েছে।

ওই চিঠিতে সিটি গ্রুপ জানায়, ‘তীর’, ‘সান’ ও ‘ন্যাচারাল’সহ পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর মাধ্যমে সিটি গ্রুপ জাতীয় চাহিদার একটি বড় অংশ সরবরাহ করে। প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোজ্যতেল, ৪০ শতাংশ চিনি, ২৫ শতাংশ আটা সরবরাহ এবং বিস্তৃত সরবরাহকারী ও পরিবেশক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা বার্ষিক টার্নওভারের সিটি গ্রুপ সরাসরি প্রায় ২৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি কৃষক, সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি বৃহৎ ইকোসিস্টেমকে টিকিয়ে রাখছে। দেশব্যাপী ১ হাজার ৫০০ সরবরাহকারী, ৩ হাজার ৫০০ পরিবেশক এবং ১০ লক্ষাধিক খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী এ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত।

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বলেন, গত ১৮ জুন ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে আমরা বৈঠক করেছি। ওই বৈঠকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বৈঠকের পর্যালোচনা ও সুপারিশের ভিত্তিতে আমরা কিছু কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।

হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা ও এতগুলো ব্যাংক থেকে একসঙ্গে ঋণ নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে মো. হাসান বলেন, ‘এদেশে ব্যাংক ছাড়া অর্থায়নের জন্য বিকল্প তেমন কোনো উৎস নেই। বিশ্বের প্রায় সব দেশে উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজার থেকে তহবিল সংগ্রহ করে বিনিয়োগ করে। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারে এ সুযোগ একেবারেই সীমিত। ব্যাংকগুলোর একক গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আছে। এ কারণে চাইলেও এক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়া যায়নি। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে গেছে। ডলারের বিনিময় হারে অস্থিরতা, সুদহার বেড়ে যাওয়া ও হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাসের সংযোগ না পাওয়ার কারণে সিটি গ্রুপ আজকের পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে।’

তথ্য সূত্র : বণিক বার্তা

দাম আরো কমে যত টাকায় বিক্রি হচ্ছে সোনা

অনলাইন ডেস্ক
দাম আরো কমে যত টাকায় বিক্রি হচ্ছে সোনা
সংগৃহীত ছবি

সবশেষ সমন্বয়ে দেশের বাজারে আরো কমানো হয়েছে সোনার দাম। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) নতুন দামেই বিক্রি হচ্ছে সোনা। ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনা ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এর আগে গতকাল বুধবার সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন দাম নির্ধারণের বিষয়ে জানায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। যা ওই দিন সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবী সোনার দাম কমায় নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন দাম অনুযায়ী, ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা, ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ৫ হাজার ২৪৯ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ১৫ হাজার ১৪২ টাকা ও ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ৪ হাজার ৪৯০ টাকা কমিয়ে  ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

এর আগে সোমবার (২২ জুন) সর্বশেষ স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। সেদিন ভরিতে ৪ হাজার ৪৩২ টাকা বাড়িয়ে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা নির্ধারণ করেছিল সংগঠনটি। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২০ হাজার ৩৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৯ হাজার ২৪৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে ৮০ বার সমন্বয় করা হয়েছে স্বর্ণের দাম। যেখানে দাম ৪০ দফা বাড়ানো হয়েছে, কমানো হয়েছে ৩৯ দফা ও ১ দফা ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে। আর গত ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল; যেখানে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল, আর কমানো হয়েছিল ২৯ বার।

অলস ২৩ হাজার কোটির বিনিয়োগ

গ্যাসের অভাব, সংযোগ না পেয়ে সুদের বোঝায় বিপর্যস্ত উদ্যোক্তারা, ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান

অনলাইন ডেস্ক
অলস ২৩ হাজার কোটির বিনিয়োগ

হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কারখানা নির্মাণ শেষ হলেও গ্যাসসংযোগ না পাওয়ায় দেশের শিল্প খাতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারের আশ্বাসে বিনিয়োগ করলেও সময়মতো গ্যাস না পাওয়ায় একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ অলস পড়ে আছে, অন্যদিকে ঋণের সুদের চাপ বহন করতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলের দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রায় ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা বিনিয়োগে নির্মিত কাচ ও রড তৈরির দুটি কারখানার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে যথাক্রমে আড়াই বছর ও দেড় বছর আগে। তবে এখনো গ্যাসসংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদনে যেতে পারেনি প্রতিষ্ঠান দুটি। এমজিআই সূত্র জানায়, সরকারের আশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্যাসলাইনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। কিন্তু এখনো গ্যাস না পাওয়ায় কারখানাগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, বিদেশি ঋণের অর্থে কারখানা দুটি নির্মাণ করা হয়েছে। মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা সুদ দিতে হচ্ছে। বিদেশি ঋণ পুনঃতফসিল বা সুদ মওকুফের সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট সাতটি কারখানায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্যাসের অভাবে পুরো প্রকল্প কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

প্রতিশ্রুত সংযোগের অপেক্ষায় ৫৫০ প্রতিষ্ঠান : পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, তিতাস গ্যাসসহ দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে শিল্প সংযোগের জন্য বর্তমানে ১ হাজার ৮০০টির বেশি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংযোগ পাওয়ার অপেক্ষায়। এসব প্রতিষ্ঠান সংযোগ ফিও জমা দিয়েছে, কিন্তু গ্যাস পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাসসংযোগ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গ্যাসসংযোগ দিতে না পারলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় অবস্থিত এমজিআইয়ের ৩৬১ একর আয়তনের অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাচ ও রড কারখানার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করা হলেও এখনো সংযোগ দেওয়া হয়নি। কারখানার পাশাপাশি শ্রমিকদের আবাসন নির্মাণও শেষ হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশের সড়কটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও জলাবদ্ধতার কারণে চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এমজিআইয়ের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) সুমন চন্দ্র ভৌমিক গণমাধ্যমকে বলেন, সড়ক উন্নয়নের জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা এখনো অনুমোদন পায়নি। ফলে শিল্পকারখানা এবং সাধারণ মানুষ উভয়েই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

শুধু এমজিআই নয়, দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপও গ্যাস সংযোগ সংকটে বড় ধরনের আর্থিক চাপে রয়েছে। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দি অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে স্থাপিত পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান-সিমেন্ট, চিনি, কাগজ, জাহাজ ও এলপিজি কারখানা গ্যাসের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না।

সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকা সুদ গুনতে হচ্ছে। কবে গ্যাস পাওয়া যাবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। একইভাবে হা-মীম গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বছরের পর বছর ধরে গ্যাসসংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি কারখানা স্থাপন করেছে। তবে গ্যাসসংযোগ না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদনে যেতে পারছে না।

দেড় দশকের গ্যাস সংকট : দেশে গ্যাসের ঘাটতি নতুন নয়। ২০০৯ সালে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে এবং ২০১০ সালে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে সরকার। পরবর্তীতে সীমিত আকারে কিছু সংযোগ দেওয়া হলেও চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান ক্রমেই বেড়েছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যেখানে মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিশ্রুত শিল্প সংযোগগুলো দিতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুত রয়েছে, তা বর্তমান হারে উৎপাদন অব্যাহত থাকলে মাত্র সাত থেকে আট বছর চলবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে সংকট নিরসনের সহজ কোনো পথ নেই। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিত এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার পরিবর্তে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানকে আগে থেকেই গ্যাসসংযোগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তাদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত। তবে নতুন করে শিল্পে গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। আগামী চার থেকে পাঁচ বছর গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকতে পারে। তাই দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর এখনই জোর দেওয়া প্রয়োজন।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

যে পদক্ষেপে ঘুরে দাঁড়াবে আবাসন খাত

অনলাইন ডেস্ক
যে পদক্ষেপে ঘুরে দাঁড়াবে আবাসন খাত

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতি ফেরাতে আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাতের সংকট দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। রড, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং চড়া নিবন্ধন ব্যয়ের কারণে বর্তমানে এ খাতে মারাত্মক স্থবিরতা বিরাজ করছে। আবাসন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে আবাসন খাতের সঙ্গে দেশের ২৬৯টির বেশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা সহযোগী শিল্প সরাসরি জড়িত। ফলে এ খাতের মন্দা পুরো দেশের শিল্পোৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিতে আবাসন খাতের ইতিবাচক অবদান নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে বিশেষ কিছু নীতিগত ও আর্থিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আবাসন খাতকে কেবল রাজস্ব আদায়ের যন্ত্র না বানিয়ে একে ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে বলেও মত দেন তাঁরা।

নগর বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী এবং আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠনগুলোর মতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে চড়া নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন ব্যয়। বর্তমানে ফ্ল্যাট ও প্লট কেনাবেচার ক্ষেত্রে গেইন ট্যাক্স, স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি ও ভ্যাট মিলিয়ে ক্রেতাদের বিপুল অঙ্কের টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে। এ উচ্চ নিবন্ধন ফি সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। নিবন্ধন ব্যয় কমিয়ে একটি যৌক্তিক ও সহনীয় পর্যায়ে আনা হলে বাজারে ফ্ল্যাট বিক্রি বাড়বে। এতে সাময়িকভাবে করের হার কমলেও বেচাকেনা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের মোট রাজস্ব আদায় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি যৌথ বিনিয়োগ বা জয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট চুক্তির ওপর আরোপিত অতিরিক্ত মূলধনি কর পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। জমির মালিক ও ডেভেলপারদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানোর ফলে নতুন নতুন আবাসন প্রকল্প গ্রহণ থমকে গেছে। এটি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহ করছে, যার প্রভাব পড়ছে রড, সিমেন্ট, ইট ও বালুর বাজারে।

আবাসন খাত চাঙা করার আরেকটি অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো সহজ শর্তে ও সাশ্রয়ী মূল্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা। মধ্যম ও স্বল্প আয়ের মানুষের গৃহায়নের স্বপ্ন পূরণ করতে একক ডিজিট বা সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণ চালু করা আবশ্যক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি বিশেষ ‘পুনঃ অর্থায়ন তহবিল’ বা রি-ফাইন্যান্সিং ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। এ তহবিল থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণ ক্রেতাদের কম সুদে ঋণ দিলে মধ্যবিত্তরা ফ্ল্যাট কিনতে উৎসাহিত হবে। আবাসন ঋণের কিস্তি সাধারণ মানুষের মাসিক আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে বাজারে তারল্যসংকট কাটবে এবং আবাসন খাত দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। একই সঙ্গে লাগামহীন নির্মাণসামগ্রীর বাজার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সিন্ডিকেট দমনের পাশাপাশি রড ও সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড় দিলে উৎপাদন ব্যয় ৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। কাঁচামালের দাম কমলে ফ্ল্যাটের দামও সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে চলে আসবে। সেই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্সের টাকা আবাসন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ বন্ডসুবিধা বা করছাড় দিলে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। আবাসন খাতকে কেবল রাজস্ব আদায়ের উৎস না ভেবে একে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, ‘আবাসন খাত অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু সরকার কিছু ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে আবাসন খাত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াতে এবং অর্থনীতির বিরাট ভূমিকা রাখতে এখন সরকারের উচিত রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো। সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে রেজিস্ট্রেশন ফি ৪-৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে ১৫ শতাংশ। এ দেশে ৫-৭ শতাংশ নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া সিঙ্গেল ডিজিটে লোনের ব্যবস্থা করা এবং দুই বছর মেয়াদি লোন দেওয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডেভেলপাররা ১৫% সাইনিং মানি দিয়ে কাজ শুরু করে। সরকার আবার ফ্ল্যাটের দামের ওপর ১৫% কর বসিয়েছে। যেটার প্রভাব আল্টিমেটলি গ্রাহকের ওপর পড়বে। এ ছাড়া লিংকেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য ইতোমধ্যে ৩১ শতাংশ বেড়েছে। বাজেটের কারণে ৪১ শতাংশ দাম বাড়বে। সুতরাং একজন ডেভেলপারের খরচ ৪৬ শতাংশ বাড়বে। একই সঙ্গে অর্ধকোটি মানুষ আবাসনের সঙ্গে জড়িত। জিডিপিতে ১৬% ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারের কর এবং বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স কমে যাবে; যার প্রভাব পড়বে সরকারের ওপর। পাশাপাশি অর্থনীতির ওপর।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলডিএ) মহাসচিব মোস্তফা কামাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘আবাসন খাতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ আবাসন খাত জিডিপিতে প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখছে। একই সঙ্গে ৫০ লাখ মানুষ এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে এবং দেড় কোটি মানুষ পরোক্ষভাবে জড়িত। এ খাতে ৪ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। একই সঙ্গে ১২ হাজার শিল্পকারখানার এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বলা যায়, এ সেক্টর অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। আবাসন ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতি বিরাট ধাক্কা খাবে। এজন্য আবাসন খাতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন করে ফ্ল্যাটের ওপর ১৫% কর আরোপ করা হয়েছে। ফলে ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেড়ে যাবে। এতে ফ্ল্যাট মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে না। সরকারের কর সহনশীল পর্যায়ে না এলে এ খাতের বিনিয়োগ অন্য দেশে চলে যাবে। সরকারের ভুল নীতির কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিনিয়োগ ও বৈদাশিক রেমিট্যান্স কমে যাবে। সরকার যদি আবাসন খাত ঠিক না করে তাহলে অর্থনীতির জন্য এটা সুইসাইডাল কেস হবে।’

জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘আবাসন মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। কিন্তু সরকার আবাসন খাত নিয়ে কোনো পলিসি নির্ধারণ করেনি। সরকার নিজেও নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য আবাসন করছে না। আবার প্রাইভেট সেক্টরে যারা আবাসন করছে তাদেরও ট্যাক্সসহ বিভিন্ন আইনের মধ্যে আটকে দিচ্ছে। সরকারের উচিত আবাসন খাতসংশ্লিষ্ট সব পণ্যের ওপর কর কমানো; যাতে সব মানুষই আবাসনের আওতায় আসতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার এবার নতুন করে রেজিস্ট্রেশন ফি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ফ্লাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করেছে। এটা আবাসন খাতকে বিপর্যস্ত করবে। এটা সরকারের প্রয়োজন ছিল না। সরকারের উচিত ছিল নতুন কর না বসিয়ে রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো। তাহলে আবাসন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসত। কিন্তু সরকার তা না করে উল্টো বাধা তৈরি করছে। সুতরাং সরকারের উচিত আবাসন খাতে মনোযোগ দেওয়া।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে আবাসন খাতের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু কাঁচামাল বা র-মেটেরিয়ালসের ওপর উচ্চ কর, মাত্রাতিরিক্ত নিবন্ধন ফি ও গেইন ট্যাক্সের কারণে এই সম্ভাবনাময় খাতটি এখন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এবারের বাজেটেও আবাসন খাতের জন্য তেমন কোনো ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত দেখা যায়নি। এ খাত পুনরুজ্জীবিত করতে হলে মূলত তিনটি বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। এজন্য র-মেটেরিয়ালসের ওপর কর সহনীয় পর্যায়ে আনা। ক্রেতাদের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি লোনের ব্যবস্থা করা এবং ফ্ল্যাট বা প্লট নিবন্ধনের জটিল প্রক্রিয়া এবং অতিরিক্ত পেপারওয়ার্ক সহজ করা। সাধারণ ক্রেতাদের জন্য আবাসন প্রক্রিয়া যত সহজ ও সাশ্রয়ী হবে, এ শিল্প তত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।’

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন