• ই-পেপার

ইসলামে শাস্তি আইন

  • মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

হাদিসের বর্ণনায় দেশের সীমান্ত পাহারার মর্যাদা ও ফজিলত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হাদিসের বর্ণনায় দেশের সীমান্ত পাহারার মর্যাদা ও ফজিলত
সংগৃহীত ছবি

দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু একটি নাগরিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি মহান ইবাদতও বটে। মানুষের জীবন, সম্পদ, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত থাকেন, ইসলাম তাদের জন্য ঘোষণা করেছে বিশেষ মর্যাদা ও বিরাট সওয়াবের সুসংবাদ। ইসলামি পরিভাষায় সীমান্ত ও জনপদ রক্ষার উদ্দেশ্যে শত্রুর অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে থাকাকে বলা হয় ‘রিবাত’। কুরআন ও হাদিসে এই আমলের এমনসব ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, যা অনেক নফল ইবাদতের চেয়েও অধিক মর্যাদাপূর্ণ।

কোরআনে সীমান্ত পাহারায় সতর্ক থাকার নির্দেশ
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে অটল থাকো, সীমান্তে ও প্রহরায় নিয়োজিত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ২০০)

মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, এ আয়াতে মুসলিম সমাজ, রাষ্ট্র ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘রাবিতু’ শব্দটি সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে।

একদিনের সীমান্ত পাহারা দুনিয়ার সবকিছুর চেয়েও উত্তম
সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর ওপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৯২)
দুনিয়ার বিপুল সম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগ-বিলাসের সঙ্গে তুলনা করেও সীমান্ত পাহারার প্রকৃত মর্যাদা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হাদিসটি এই মহান আমলের অসাধারণ ফজিলত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

একদিন-একরাতের প্রহরা এক মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে একদিন ও একরাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোজা রাখা এবং এক মাস রাতভর ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আত্মনিবেদিত দায়িত্ব পালন অনেক সময় দীর্ঘ নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াবের কারণ হতে পারে।

মৃত্যুর পরও বন্ধ হয় না সওয়াব
একই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে তার আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকবে, তার জন্য রিজিক প্রবাহিত হতে থাকবে এবং সে কবরের পরীক্ষার ভয় থেকে নিরাপদ থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
সাধারণত মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার মতো জনকল্যাণমূলক দায়িত্বের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর পরও অব্যাহত রাখেন।

যে রাত কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন এক রাতের কথা বলব না, যা কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ? সে হলো ওই প্রহরীর রাত, যে ভয়সংকুল স্থানে পাহারা দেয় এবং আশঙ্কা করে যে হয়তো সে তার পরিবারের কাছে জীবিত ফিরে যেতে পারবে না।’ (আল মুসতাদরাক আলা আসসহিহাইন, হাদিস : ২৪২৪, তারগিব ওয়াত তারহিব : ১২৩২)

এ হাদিস সীমান্তরক্ষীদের আত্মত্যাগ, ঝুঁকি ও আন্তরিকতার উচ্চ মর্যাদা তুলে ধরে।

যে চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—এক. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়; দুই. যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৯)
এ হাদিসে সীমান্ত ও জনপদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।


একটি রাতের প্রহরায় জান্নাতের সুসংবাদ
হুনাইনের যুদ্ধের রাতে সাহাবি আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি (রা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ পাহারার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সারা রাত ঘোড়ার পিঠে থেকে প্রহরা দেন এবং নামাজ ও প্রয়োজন ছাড়া একবারও দায়িত্বস্থল ত্যাগ করেননি। পরদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুমি নিজের জন্য জান্নাত অবধারিত করে নিয়েছ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫০১)
এ সুসংবাদ তার নিষ্ঠা, সতর্কতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দায়িত্ব পালনের ফলস্বরূপ প্রদান করা হয়েছিল।

জান্নাতের সুসংবাদ যাদের জন্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুসংবাদ ওই বান্দার জন্য, যে আল্লাহর পথে সদা প্রস্তুত থাকে। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে সে পাহারায় থাকে, আর পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে।’ (বুখারি ২৮৮৭)

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষা
বর্তমান সময়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। যদি তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি, দেশ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়তে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারা কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত এসব ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করতে পারেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে সীমান্ত পাহারা ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি মহান ইবাদত। একদিনের প্রহরা দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান, একদিন-একরাতের প্রহরা এক মাসের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, এমনকি এর সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। যারা দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে দায়িত্ব পালন করেন, তারা নিঃসন্দেহে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।

ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরের ইবাদতকে নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা, সমাজের স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য নিবেদিত দায়িত্বশীল কাজকেও মহান সওয়াবের উৎস হিসেবে গণ্য করেছে। সীমান্ত পাহারা তারই একটি উজ্জ্বল ও অনন্য উদাহরণ। আল্লাহ তাআলা আমাদের দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী সব সদস্যের খেদমত কবুল করুন, তাদের হেফাজত করুন এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।

হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কাসিম অ্যাওয়ার্ড জিতল সৌদির এসডিএআইএ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কাসিম অ্যাওয়ার্ড জিতল সৌদির এসডিএআইএ
সংগৃহীত ছবি

হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জনসমাগম ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে সৌদি ডেটা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অথরিটি  (SDAIA) মর্যাদাপূর্ণ ‘কাসিম অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স অ্যান্ড ক্রিয়েটিভিটি’ অর্জন করেছে। ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণায় শ্রেষ্ঠত্ব’ বিভাগে পাওয়া এই সম্মাননা সৌদি আরবের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে সৌদি আরবকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে যেতে এসডিএআইএ দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জাতীয় প্রতিভা বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় জনসমাগম ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি শনাক্তকরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে পরিচালিত একটি ফলিত গবেষণা প্রকল্প এবার তাদের জন্য এনে দিয়েছে এই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।

কাসিম গভর্নরেটের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কাসিম অঞ্চলের গভর্নর ও যুবরাজ ড. ফয়সাল বিন মিশাল বিন সৌদ বিন আব্দুল আজিজ এসডিএআইএ-এর ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (NCAI) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সাত্তাম আল-সুবাইয়ের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন।

পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল জনসমাগমের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা। বিশেষ করে হজ ও ওমরাহ মৌসুমে লাখো হাজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসডিএআইএর গবেষকরা এ প্রকল্পে ‘ভেলোসিটিনেট’  (VelocityNet) এবং ‘অ্যাটেনশন ইনভার্স’ (Attention Inverse)-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এসব প্রযুক্তি ভিড়ের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিক আচরণ বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির ইঙ্গিত অত্যন্ত নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, জননিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং জরুরি সেবার কার্যকারিতা উন্নত করা সহজ হয়েছে।

গবেষণাটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও উল্লেখযোগ্য। এ প্রকল্পের ফলাফল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক সম্মেলন  ICCV, ICML I ArabicNLP-এ উপস্থাপিত ও প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি গবেষকরা নতুন মানসম্পন্ন ডেটা বেইসও তৈরি করেছেন, যা ভবিষ্যতে ক্রাউড অ্যানালিটিকস বা জনসমাগম বিশ্লেষণভিত্তিক গবেষণার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে সৌদি আরব যে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, এসডিএআইএর এই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও সম্মাননা তারই আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

ভ্রমণের ভিডিও ইন্টারনেটে আপলোড করার হুকুম : ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
ভ্রমণের ভিডিও ইন্টারনেটে আপলোড করার হুকুম : ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

মানুষ সাধারণত ভ্রমণপ্রিয়। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, বনভূমি কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা—প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য ও বিভিন্ন স্থানের বৈচিত্র্য মানুষকে মুগ্ধ করে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন সেই স্মৃতিগুলো ভিডিওর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা খুবই সহজ। অনেকেই ভ্রমণে গিয়ে ভিডিও ধারণ করেন এবং পরে তা ইউটিউব, ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। প্রশ্ন হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে এমন ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা কি বৈধ? নাকি তা অপ্রয়োজনীয় কাজের অন্তর্ভুক্ত?

ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো— কোনো কাজের মধ্যে যদি বৈধ উপকারিতা থাকে, তাহলে তা অনুমোদিত হতে পারে; আর যদি নিছক সময় নষ্ট, আত্মপ্রদর্শন বা অর্থহীন বিনোদনের উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা পরিহার করাই উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের কল্যাণ, উপকার ও বৈধ উদ্দেশ্যসম্পন্ন কাজ ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো, সে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিত্যাগ করবে।’ (তিরমিজি) 
এই হাদিস মুসলমানকে অর্থহীন কাজ ও সময়ের অপচয় থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়।

ভিডিও ধারণের বৈধতা সম্পর্কে সমকালীন ফকিহদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফিকে প্রচলিত হাতে আঁকা ছবির হুকুমের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন, আবার অনেক আলেম এটিকে আলোক-প্রতিফলনের মাধ্যমে বাস্তব দৃশ্য সংরক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করেন। যারা ভিডিও ধারণকে বৈধ বলেছেন, তারাও সাধারণত এটিকে প্রয়োজন, উপকারিতা ও শরিয়তসম্মত উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলেছেন। প্রখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী (দা.বা.) লিখেছেন, ‘যে ছবির স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতা নেই এবং যা কোনো স্থায়ী বস্তুর ওপর খোদিত হয় না, তা অনেকটা ছায়ার মতো। কারণ ছবিটি পর্দায় স্থির থাকে না; বরং প্রকাশিত হয়ে আবার মিলিয়ে যায়।’ (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, ৪/১৬৪)

তবে তিনি এবং অন্যান্য অনেক আলেম এও উল্লেখ করেছেন যে, এ ধরনের বিষয়কে প্রয়োজন ও উপকারিতার গণ্ডির মধ্যে রাখা উচিত। আলেমে দ্বীন মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনি (রহ.) বলেন, ‘ফটোগ্রাফির ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবাধ বৈধতার কথা বলা এবং একে নিছক ছায়া ধারণ বলে দাবি করা উচিত নয়। বরং প্রয়োজনীয়তা ও মানুষের বৈধ উপকারিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।’ (রাওয়াইউল বায়ান ফি তাফসিরি আয়াতিল আহকাম, ২/৩০০)

সুতরাং কেউ যদি ভ্রমণের ভিডিও ধারণ করে মানুষের সামনে কোনো এলাকার সৌন্দর্য তুলে ধরতে চান, ভ্রমণ-সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করতে চান, ঐতিহাসিক বা প্রাকৃতিক নিদর্শন পরিচিত করাতে চান, শিক্ষা ও সচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেন অথবা ভবিষ্যতের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করেন, তাহলে অনেক আলেমের মতে তা বৈধতার আওতায় আসতে পারে। বিশেষত যখন ভিডিওতে গান, অশ্লীলতা, পর্দাহীনতা, হারাম দৃশ্য, অহংকার বা আত্মপ্রচার না থাকে।

কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় শুধুই অর্থহীন বিনোদন, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ, খ্যাতি অর্জন, লাইক-ভিউ সংগ্রহ কিংবা সময় নষ্ট করা, তাহলে তা ইসলামের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন মুমিনের উচিত প্রতিটি কাজের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা—‘এ কাজটি কি আল্লাহর সন্তুষ্টি, মানুষের উপকার বা অন্তত কোনো বৈধ প্রয়োজন পূরণ করছে?’

অতএব, ভ্রমণের ভিডিও ধারণ ও ইন্টারনেটে প্রকাশ করার বিষয়টি এমন কোনো কাজ নয়, যাকে সর্বাবস্থায় হারাম বা সর্বাবস্থায় বৈধ বলা যায়। বরং এর হুকুম অনেকাংশে উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। ভিডিওতে যদি হারাম কিছু না থাকে এবং তা মানুষের বৈধ উপকার, শিক্ষা, তথ্য প্রদান বা স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে অনেক আলেমের মতে তা জায়েজ হতে পারে। তবে নিছক মজা, খ্যাতি অর্জন বা অনর্থক সময় ব্যয়ের উদ্দেশ্যে ভিডিও তৈরি ও প্রচার করা একজন সচেতন মুসলমানের জন্য শোভনীয় নয়। কারণ মুমিনের জীবন মূল্যবান, আর তার সময় আরো মূল্যবান। তাই প্রযুক্তির ব্যবহারও হওয়া উচিত দায়িত্বশীলতা, উপকারিতা এবং আল্লাহভীতির আলোকে।

ওআইসির কার্যক্রম গতিশীল করতে আরব-ইরাক বৈঠক

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ওআইসির কার্যক্রম গতিশীল করতে আরব-ইরাক বৈঠক
সংগৃহীত ছবি

ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে সৌদি আরব ও ইরাকের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সংস্থার আওতায় যৌথ ইসলামী কার্যক্রমের উন্নয়ন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ওআইসির ভূমিকা আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

ওআইসিতে সৌদি আরবের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. সালেহ বিন হামাদ আল-সুহাইবানি জেদ্দায় অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে ওআইসিতে ইরাকের নবনিযুক্ত স্থায়ী প্রতিনিধি ও জেদ্দায় নিযুক্ত কনসাল জেনারেল রাষ্ট্রদূত মাওলুদ আহমেদ আল-মাশহাদানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্প্রতি রাষ্ট্রদূত আল-মাশহাদানি ওআইসিতে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর পরিচয়পত্র পেশ করেছেন।

সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উভয় পক্ষ ওআইসির কাঠামোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও পরামর্শ প্রক্রিয়া আরো জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং সংস্থার বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।

বৈঠকে আলোচকরা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ওআইসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্ব্বিত উদ্যোগ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা আরো শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। তারা যৌথ ইসলামী কার্যক্রমের বিকাশ, সংস্থার সেবার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওআইসির নেতৃত্বপূর্ণ অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের ৫২তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছে ইরাক। এ প্রেক্ষাপটে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত সৌদি আরব-ইরাকের এই বৈঠককে সংস্থার কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।